গত মাসে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা প্রশান্ত মহাসাগরীয় নেতাদের ‘শান্তির মহাসাগর’ হিসেবে অঞ্চলটিকে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করে দিয়েছে। বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাল্টাপাল্টি সংঘাত থেকে মুক্ত রাখার লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা কঠিন হয়ে উঠছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
এতে বলা হয়, ফিজি ও অস্ট্রেলিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করার কয়েক ঘণ্টা পরই প্রশান্ত মহাসাগরে ক্ষেপণাস্ত্রটি পরীক্ষা করা হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক জোটে যুক্ত হয় ফিজি।
পরীক্ষার এক মাসেরও বেশি সময় পর প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বেইজিংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নিন্দা করে কোনো যৌথ বিবৃতিতে একমত হতে পারেননি। যদিও অঞ্চলটির সামরিকায়ন নিয়ে বিভিন্ন দেশের নেতারা প্রকাশ্যে ও ব্যক্তিগতভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত সপ্তাহে সুভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে রয়টার্সকে পাপুয়া নিউগিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাস্টিন টকাচেঙ্কো বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সম্পূর্ণ বেমানান ছিল। তিনি বলেন, “চীন পাপুয়া নিউগিনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও মিত্র। কিন্তু আমরা মনে করি, এটি কোনোভাবেই সহায়ক নয়।” তিনি আরও জানান, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের বিষয়ে বেইজিং পাপুয়া নিউগিনিকে আগাম জানিয়েছিল, তবে ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথায় গিয়ে পড়বে সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়নি।
উৎক্ষেপণের সময় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেছিলেন, পরীক্ষাটি নিরাপদভাবে পরিচালিত হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে দেখবে না।”প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এক বছর ধরে আরও দৃশ্যমান সামরিক তৎপরতার পর এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা হলো। প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে অঞ্চলটি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যে রয়েছে চীনা নৌবাহিনীর মোতায়েন ও তাসমান সাগরে গোলাবর্ষণ মহড়া, গুয়াম ও হাওয়াইয়ের আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সামরিক মহড়া এবং সম্প্রসারিত নিরাপত্তা অংশীদারত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যুদ্ধজাহাজের নিয়মিত সফর।
এদিকে হাওয়াই, গুয়াম ও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জসহ পুরো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এখনো উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
তুভালুর স্থায়ী পররাষ্ট্রসচিব পাসুনা তুয়াগা ব্যক্তিগত সক্ষমতায় কথা বলতে গিয়ে ক্রমবর্ধমান সামরিকায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার উদ্বেগের কারণ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নয়, অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা অংশীদারত্ব ‘অকাস’-এর মতো ব্যবস্থাও।
ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু বিভক্ত
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নেতারা ‘ওশান অব পিস ডিক্লারেশন’ বা ‘শান্তির মহাসাগর ঘোষণা’ অনুমোদন করেন। এতে অঞ্চলটির সুরক্ষা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার, শান্তিতে জনগণের অধিকার স্বীকার এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় অবদান রাখা ও তা শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্যাসিফিক সিকিউরিটি কলেজের ডেভিড পিবলস বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাইরের শক্তিগুলো এবং তাদের পরস্পরবিরোধী ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে শান্তি ও নিরাপত্তার সংজ্ঞা নির্ধারণের বিরোধিতা করে আসছে। তার মতে, ‘শান্তির মহাসাগর’ উদ্যোগটি ছিল সেই এজেন্ডার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টা।
এই আঞ্চলিক ঘোষণার অনুপ্রেরণায় গত মাসে অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির মধ্যে ‘ওশান অব পিস অ্যালায়েন্স’ নামে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তির সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রশান্ত মহাসাগরে সামরিকায়ন আরও বাড়তে পারে—এমন উদ্বেগ নিয়ে মন্তব্যের অনুরোধে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
অনেক সরকারের কাছে নিরাপত্তা অংশীদারত্বের সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ মাছ ধরা শনাক্তকরণে নজরদারি, দুর্যোগ মোকাবিলা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা এবং সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা চুক্তির বিস্তার ঘটলে নিজেদের ভূখণ্ড, জলসীমা ও অবকাঠামো কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মতামত দেওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে।
সুভার বৈঠকে সভাপতিত্ব করা সলোমন দ্বীপপুঞ্জের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিক হোয়েনিপুয়েলা বলেন, “এই অঞ্চলের এজেন্ডা অবশ্যই প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো কর্তৃক নির্ধারিত, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো কর্তৃক পরিচালিত এবং শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর মাধ্যমেই পরিচালিত হতে হবে।”
তবে এক দিনের বৈঠক শেষে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিষয়ে কোনো অভিন্ন বিবৃতি দেওয়া সম্ভব হয়নি।
২০১৯ ও ২০২৪ সালে যথাক্রমে তাইওয়ানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা কিরিবাতি ও নাউরু বিবৃতির ভাষায় সম্মতি দেয়নি বলে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থতার জন্য বিদেশি প্রভাবকে দায়ী করেছেন।
এই অচলাবস্থা ছোট দ্বীপদেশগুলোর সামনে থাকা মূল চ্যালেঞ্জটি তুলে ধরেছে—অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার স্বার্থে এসব দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, যেখানে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, কিছু সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও গভীর নিরাপত্তা সহযোগিতা চায়। অন্যরা আবার এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
ফিজির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাকিয়াসি দিতোকা বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলো একটি অনিবার্য টানাপোড়েনের মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, “দেশগুলো এসব যুদ্ধের সরঞ্জাম থেকে মুক্ত থাকতে চায়। তবে একই সঙ্গে তারা স্বীকার করে, কিছু নিরাপত্তা সক্ষমতা তাদের নিরাপদ রাখতে সহায়তা করে।”
গত মাসে প্রথমবারের মতো প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘রিমপ্যাক’ নামে পরিচিত সামরিক মহড়ায় অংশ নেয় ফিজি।
তিন সপ্তাহ পর পালাউতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফোরামের নেতাদের বৈঠক হবে। সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং আঞ্চলিক ঐক্যের বিষয়টি আবারও আলোচনার এজেন্ডায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।