এই গ্রীষ্মে তিউনিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত মোরনাগিয়া কারাগারের ভেতরের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। গত ১৭ জুলাই ৮৫ বছর বয়সী রাশেদ ঘানৌচি তার সেলে জ্ঞান হারান।
রাশেদ মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে অনুপ্রাণিত তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক দল এন্নাহদার প্রতিষ্ঠাতা। তার পরিণতিও মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মোরসির মতো হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৯ সালে কারাগারেই মারা যান মুরসি।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘানৌচির এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শের অনুসারীদের প্রভাব কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে।
প্রায় দেড় দশক আগে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে যুক্ত দলগুলো মিশরের প্রেসিডেন্ট পদে জয় পেয়েছিল এবং তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল। কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে তাদের বক্তব্য আরব বিশ্বের মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছে যেত। ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়ায় শুরু হয়ে ২০১১ সালের শুরুতে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে আরব বসন্তে। এই বিপ্লবে মুসলিম ব্রাদারহুডকে প্রথম দিকের বিজয়ী শক্তি মনে হচ্ছিল।
কিন্তু খুব দ্রুতই আবার ক্ষমতা শক্ত করে নেয় স্বৈরশাসন। এরপরে মুসলিম ব্রাদারহুডের অনেক নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়। অনেকে আবার দেশ ছেড়ে পালিয়ে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন।
গত এক বছর সংগঠনটির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনকে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ১৩ জানুয়ারি মিশর ও জর্ডানের শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। অভিযোগ করা হয়, তারা হামাসকে সহায়তা করছে। হামাসও মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিনি শাখা থেকে গঠিত হয়েছিল। একই সময়ে লেবাননের শাখাকেও আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সন্ত্রাসবিরোধী কৌশলে মুসলিম ব্রাদারহুডকে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের পাশাপাশি আধুনিক যুগে জিহাদের অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে, গত বছরের এপ্রিলে মুসলিম ব্রাদারহুডকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে জর্ডান। এরপর দেশটি সংগঠনটির রাজনৈতিক শাখা ইসলামিক অ্যাকশন ফ্রন্টের কার্যক্রমও সীমিত করে।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম ব্রাদারহুডের ঠিক কোন অংশকে লক্ষ্য করছে, তা স্পষ্ট নয়। ২০২১ সাল থেকে সংগঠনটি মূলত দুটি বড় অংশে বিভক্ত। ওই বছর লন্ডনে নির্বাসনে থাকা ইব্রাহিম মুনির তুরস্কে থাকা মুসলিম ব্রাদারহুডের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেন। তবে সংগঠনটির তৎকালীন মহাসচিব মাহমুদ হুসেইন দাবি করেন, মুনিরকে এর আগেই নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এখন দুই পক্ষেরই আলাদা নেতা, আলাদা শুরা কাউন্সিল এবং আলাদা ওয়েবসাইট রয়েছে। দুই পক্ষই দাবি করে, তারাই আসল মুসলিম ব্রাদারহুড।
ইসরায়েল। হামাসের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালে ইব্রাহিম মুনির মারা যাওয়ার পর তার পক্ষের নেতৃত্ব নেন সালাহ আবদেল হক। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে তিনি আইনি লড়াই করবেন।
তবে ইস্তাম্বুলভিত্তিক শাখাটি জানিয়েছে, তাদের মূল সংগঠন অন্য কোনো পক্ষের হয়ে কথা বলার অধিকার রাখে বলে মনে করে না তারা। অর্থাৎ, সংগঠনটি যখন অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে, তখনো এর দুই পক্ষ একসঙ্গে কোনো বক্তব্য দিতে পারছে না।
তুরস্কভিত্তিক শাখার নেতা মাহমুদ হুসেইনের হাতে তুরস্কের সম্পদ, বিনিয়োগ কোম্পানি ও অর্থের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে সালাহ আবদেল হক আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনটির নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করেন। কিন্তু তার হাতে দেখানোর মতো তেমন কিছু নেই।
মুসলিম ব্রাদারহুডের সাবেক সদস্যরা দুই নেতাকেই রাজনীতি ছেড়ে আবার ধর্মীয় প্রচারে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, মুসলিম ব্রাদারহুডের ঐতিহাসিক ঘাঁটি মিশরেও সংগঠনটির ক্ষমতায় থাকার সময়ের ইতিহাস সরকারি পর্যায় থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। মিশরে সংগঠনটির ‘সুপ্রিম গাইড’ বা সর্বোচ্চ নেতা মোহাম্মদ বাদি কারাগারে রয়েছেন। প্রতি ধর্মীয় উৎসবে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি অনেক বন্দিকে ক্ষমা করে মুক্তি দেন। তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যদের খুব কমই এই সুবিধা দেওয়া হয়।
এছাড়া, সংগঠনটির বড় সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম চালাতে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অর্থ জোগান দিত, সেগুলোও বন্ধ করে দিয়েছেন মিশরের প্রেসিডেন্ট।
তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদও সিসির পথ অনুসরণ করছেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শে অনুপ্রাণিত এন্নাহদা দলের নেতা রাশেদ ঘানৌচি কারাগারে রেখেছেন।
গাজায় হামাসকে প্রায় পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেছে ইসরায়েল। হামাসের সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ আদর্শিক সম্পর্ক রয়েছে। গাজার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর ইসরায়েল পুরো অঞ্চলজুড়ে হামাসের নেতাদের খুঁজে হত্যা করছে। হামাস এখনো টিকে আছে, কিন্তু তাদের শক্তি অনেক কমে গেছে। গাজার অনেক মানুষও এখন হামাসের বিরুদ্ধে চলে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়াও মুসলিম ব্রাদারহুডের জন্য বড় ধরনের ব্যর্থতার জায়গা। ২০২৪ সালে আসাদ সরকার পতনের পর দামেস্কের ক্ষমতা নেয় সুন্নি জিহাদিরা, মুসলিম ব্রাদারহুড নয়। যুদ্ধের সময় ব্রাদারহুড সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে। ফলে যারা সত্যিকার অর্থে যুদ্ধ করেছে, তারাই তাদের পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। সিরিয়ার নতুন সংসদেও ব্রাদারহুডের উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে।
প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার উপদেষ্টা আহমেদ জেইদান, যার সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, বলেছেন সিরিয়ার শাখাটির নিজেদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
সিরিয়ার ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিশেষজ্ঞ আবদুলরহমান আল-হাজও লিখেছেন, নতুন সিরিয়ায় রাজনৈতিক ইসলামের গুরুত্ব আর আগের মতো নেই।
দ্য ইকোনমিস্টও বলছে, হয়তো সেটাই সত্যি। কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুড শেষ হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া অতীতেও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে সংগঠনটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৪ সালে মিশরের তৎকালীন নেতা জামাল আবদেল নাসের তাদের কঠোরভাবে দমন করেন। সংগঠনের প্রধান চিন্তাবিদ সাইয়েদ কুতুবকে ১৯৬৬ সালে ফাঁসি দেওয়া হয়।
গত নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রশাসনকে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিভিন্ন শাখাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দেন। ছবি: রয়টার্স
এরপর প্রায় ৪০ বছর সংগঠনটি নিষিদ্ধ ছিল। তারপরও ২০০৫ সালে তাদের অনুসারীরা মিশরের সংসদে ৮৮টি আসন পায়। ২০১২ সালে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা মিসরের প্রেসিডেন্ট পদও জয় করে। মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা এক পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, “কঠিন সময় পার করে টিকে থাকার ক্ষেত্রে তারা খুবই দক্ষ।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের দমন-পীড়ন একটি সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুছে দিতে পারে। কিন্তু মানুষ যেসব কারণে সেই সংগঠনে যোগ দেয়, তা দূর করতে পারে না। মিশরে সেই কারণগুলো এখনো খুবই শক্তিশালী। দেশটির দুর্বল অর্থনীতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির তরুণ শিক্ষিতদের অনেকেই এখনো চাকরির অভাবে হতাশায় ভুগছে, যেমনটা ২০১০ সালেও ছিল। তিউনিসিয়ার অবস্থাও খুব একটা বদলায়নি। আরব বসন্তের সূচনা করা সেই দেশটিও এখনো অর্থনৈতিকভাবে সংকটে রয়েছে। আবার গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসনে আরব দেশগুলোর সরকারের দুর্বল বা ইসরায়েলের প্রতি নীরব সমর্থনকারী হিসেবে দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মুসলিম ব্রাদারহুড সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড এবং আরবদের মর্যাদা রক্ষার কথা বলার মাধ্যমে নিজেদের শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নেতৃত্বে এই দুই বিষয় অনেকটাই অনুপস্থিত। ২০২৮ সালের মার্চে মুসলিম ব্রাদারহুডের ১০০ বছর পূর্ণ হওয়ার সময়ও সংগঠনটিকে সক্রিয় দেখা যেতে পারে। নেতৃত্বে যতই বিভক্তি থাকুক, সংগঠনটি তখনো টিকে থাকবে এবং নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবে বলে আশা করছেন তারা।