অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে জিম্বাবুয়ে সফরের ওয়ানডে স্কোয়াডে নাহিদ রানাকে দেখে অনেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়ে তরুণ এই পেসার গতির ঝড় তুলতে পারবেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে– তখন এমনই মনে হয়েছিল। শুরুতে বিসিবির চিন্তাও তা-ই ছিল। কিন্তু ভুলে ভরা এক জিম্বাবুয়ে সফরে হারের বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার মাঝে নাহিদকে টানা খেলিয়ে শেষ পর্যন্ত চোটের মুখেই ঠেলে দেয় বাংলাদেশ দল, যার খেসারত হিসেবে নাহিদ মিস করবেন অস্ট্রেলিয়ার সফর।
চোট-আঘাত পেসারদের নিত্যসঙ্গী। পেস বোলিং শিল্পটাই প্রতিনিয়ত শরীরের সঙ্গে যুদ্ধের। তবে বিপদের শঙ্কা থাকার পরও যখন নাহিদকে যত্রতত্র খেলিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাতে সামনে চলে আসে অনেক প্রশ্নই। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, জিম্বাবুয়েকে হারাতে মরিয়া হয়েই কি নাহিদকে অতিরিক্ত ব্যবহার করেছে বিসিবি?
বাংলাদেশ দলের বর্তমান পেস বোলিং কোচ তালহা জুবায়েরের ক্যারিয়ার বড় হয়নি চোটের কারণেই। তারও গতি ছিল বেশ। নাহিদকে বয়সভিত্তিক দল থেকেই তিনি কোচিং করিয়েছেন। তার সময়ে ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট তেমন জোরাল ছিল না দেশের ক্রিকেটে। তবে সময় বদলেছে এখন। ডেটা ব্যবহার করে প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনা সাজানো হয়। তাই কে বেশি ম্যাচ খেলছে, কে চোটের ঝুঁকিতে আছে– সবই দল আগে থেকে জানতে পারে। এরপরও নাহিদ যেভাবে চোটের শিকার হলেন, সেটা বিস্ময়করই।
যদিও নাহিদের বেলায় শুরু থেকেই বিসিবি ‘বেছে খেলানো’র নীতিতেই ছিল। কোনো সিরিজের টানা তিন ম্যাচ বা সব মিলিয়ে টানা চার ম্যাচ এখনো খেলেননি তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজের ঠিক এক মাস আগে জিম্বাবুয়ে সফর ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল, নাহিদকে ওয়ানডে সিরিজ ছাড়া আর খেলানোর ঝুঁকি নিতে চাইবে না বাংলাদেশ।
তবে একমাত্র টেস্টে মাত্র আড়াই দিনে ইনিংস ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পরই নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে থাকে দলের পরিকল্পনা। ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলা নিশ্চিত করতে এই সিরিজ জিততেই হতো। প্রথম ম্যাচে নাহিদ ৬ উইকেট নিলেও হেরে যায় বাংলাদেশ। ১৪২ রানও করতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা। দ্বিতীয় ম্যাচ হেরে সিরিজও হেরে যায়। তৃতীয় ম্যাচ নাহিদ খেলেননি, তবে জয় পায় মেহেদি হাসান মিরাজের দল।
ঠিক এই পর্যন্ত নাহিদের ব্যাপারে সব ঠিকঠাকই ছিল। এরপর কি হয়েছিল? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র চরচাকে বলেছেন পেছনের ঘটনা, “টেস্টে ম্যাচটা বাজেভাবে হেরে যাওয়ার পর ওয়ানডেতেও যখন হারল, সবাই চাচ্ছিল টি-টোয়েন্টি সিরিজটা যেভাবেই হোক জিততে। বোর্ডের থেকেও চাপ ছিল। মুস্তাফিজ চোট পেল, এরপর শরীফুলও। ব্যাটসম্যানরাও রানে নেই। নাহিদকে তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই টি-টোয়েন্টিতে খেলাতে হয়েছে আমাদের। যদিও ফিজিও থেকে মেডিকেল বিভাগ– সবার সবুজ সংকেত ছিল।”
দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে নাহিদ বোলিংয়ে সময় চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। শুরুতে গুরুতর না মনে হলেও পরে জানা যায়, সাইড স্ট্রেইনের চোটে দুই মাস মাঠের বাইরে থাকতে হবে তাকে। প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারকে এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নাহিদের চোট দুর্ভাগ্যজনক। এ-ও বলেন, জিম্বাবুয়ে সফরে কম ম্যাচ খেললে নাহিদ ফিটনেসের দিক থেকে ‘রেড জোনে’ চলে যেতে পারতেন।
সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক হাবিবুলের এই যুক্তি ক্রিকেটীয় দিক থেকে মেনে নেওয়া একটু কঠিনই। জাসপ্রীত বুমরাহ, মিচেল স্টার্ক, প্যাট কামিন্সদের মতো পেসারদের নিয়মিতই লম্বা বিরতি দিয়ে খেলানো হয় বড় সিরিজের আগে, যাতে তারা শতভাগ সতেজ থেকে খেলতে পারেন। সেখানে নাহিদকে দুটি টি-টোয়েন্টি না খেলালে তিনি ম্যাচ ফিটনেস হারিয়ে ফেলতেন!
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে থাকছেন না নাহিদ রানা। ছবি: বিসিবি
মূল খবর হলো, বিসিবির শীর্ষ কর্তাদের চাপে পড়েই নাহিদকে নিয়ে বাজি খেলেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানকে মাত্রই টেস্ট সিরিজে হারিয়ে জিম্বাবুয়েতে তিন ফরম্যাটেই হেরে গেলে সেটা দেশের ক্রিকেটের জন্য অশনিসংকেত হতো বলেই মত ছিল কয়েকজন পরিচালকের। হাবিবুল সরাসরি তাই স্বীকার না করলেও এটাই সত্যি যে, জেনেবুঝেই তারা নাহিদকে বাড়তি ম্যাচ খেলিয়েছেন।
চিন্তা-ভাবনার এই দীনতার কারণেই টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ২৬ বছরেও বাংলাদেশের ক্রিকেট এতটা পিছিয়ে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে একটা ম্যাচ জেতার সুযোগ না নিয়ে বোর্ড, টিম ম্যানেজম্যান্ট, নির্বাচক সবাই মিলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটা অগুরুত্বপূর্ণ সিরিজ জেতাকেই প্রধান্য দিয়েছেন।
অথচ টেস্টের পর ওয়ানডে সিরিজে দলের হারের মূল কারণ ছিলেন ব্যাটসম্যানরা। তাদের ব্যর্থতা আড়াল করতে টেস্টে দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্রকে বিসর্জন দিতে দ্বিধাবোধ করেনি বাংলাদেশ দল। হয়তো তারা ধরেই নিয়েছিল, নাহিদ খেললেও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজের তাদের সুযোগ নেই। তাই জিম্বাবুয়েকে টি-টোয়েন্টি সিরিজে হারিয়ে মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
পেস বিপ্লবের সেরা সময়ে তাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশ খেলবে নাহিদকে ছাড়া, যিনি এই মুহূর্তে বিশ্বের অন্যতম গতিময় পেসার। এমন রত্নের যত্ন যদি খোদ বিসিবিই না নিতে পারে, এর চেয়ে বড় আক্ষেপ আর কি হতে পারে?