ads

‘পেস বিপ্লব’ এল যে বলে, সেটা থেকে হঠাৎ কেন সরে যাচ্ছে বিসিবি?

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
‘পেস বিপ্লব’ এল যে বলে, সেটা থেকে হঠাৎ কেন সরে যাচ্ছে বিসিবি?
ছবি : এআই জেনারেটেড

চার বছর আগে বেশ ঘটা করেই ঘরোয়া ক্রিকেটে ডিউকস বলের ব্যবহার শুরু করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এই সময়ে টেস্টে বাংলাদেশ পেয়েছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য, দেখা মিলেছে 'পেস বিপ্লবে'রও। তবুও এই বছর থেকেই ইংল্যান্ডের ডিউকস বলের পরিবর্তে আবার ভারতের তৈরি এসজি বলে ফেরার পরিকল্পনা করছে বিসিবি। এতে উঠছে প্রশ্ন - হঠাৎ এই পরিবর্তনের কারণ কী? ব্যাটসম্যানদের সুবিধা করে দিতেই কি হঠাৎ বল পরিবর্তন করা হচ্ছে?

২০২২ সাল পর্যন্ত এসজি বলেই জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) ম্যাচ আয়োজন করত বিসিবি। তখন পেসারদের চেয়ে স্পিনারদের আধিপত্যই ছিল বেশি। তবে ২০২২-২৩ মৌসুম থেকে এনসিএল-এ ডিউকস বল চালু করার পর ধীরে ধীরে বদলে যায় এই চিত্র। দেশের মাটিতেও এখন পেসাররা সমান কার্যকর হয়ে উঠেছেন।

Advertisement

ডিউকস বল ব্যবহারের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বাইরে, বিশেষ করে ‘সেনা’ দেশগুলোতে (সাউথ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া) কন্ডিশনের সঙ্গে ব্যাটারদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও নিউজিল্যান্ড সফরে ব্যাটসম্যানরা টানা সমস্যার মুখে পড়েছেন, সেটাই বিসিবির এসজি বল থেকে সরে আসার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুই দেশে বাংলাদেশ তুলনামূলক বেশি সফরে গেছে, সেখানকার সুইং ও সিম বোলিংয়ের সামনে স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারাটাই ছিল বড় এক চ্যালেঞ্জ।

তবে গত চার বছরে ডিউকস বলের ব্যবহার কি দেশের ক্রিকেটে খুব বড় পরিবর্তন এনেছে? সাফল্য-ব্যর্থতার বিচারে অন্তত তা বলা যাচ্ছে না। বিদেশের মাটিতে এই সময়ে সেরা সাফল্য পাকিস্তানে গিয়ে টেস্ট সিরিজ জয়। দেশের মাটিতেও বড় জয় মিলেছে, তবে বাজে কিছু হারও জুটেছে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায়।

ডিউকস বলের মূল চ্যালেঞ্জ, নতুন বল পার করে দেওয়ার পরও রানের জন্য ব্যাটসম্যানদের কঠিন সময় পার করতে হয়। টেকনিকের দিক থেকে দুর্বল হওয়ায় বিশ্বমানের বোলিংয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানরা ধারাবাহিকভাবে অধারাবাহিকতা দেখিয়েছেন।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ ওপেনিং পজিশন। দেশে বা দেশের বাইরে অনেক ম্যাচেই তিন ও চার নম্বর ব্যাটসম্যানকে নেমে যেতে হচ্ছে দশ ওভারের মধ্যেই। আর এখানেই হচ্ছে আসল সমস্যা। ডিউকস বলে প্রথম ২০ থেকে ৩০ ওভার ব্যাটসম্যানদের কঠিন হয়, কারণ ন্যাচারাল সুইংটা পান বোলাররা।

এই সময়টা পার করে দিলেই যে বিপদমুক্ত, তা-ও নয়। ডিউকস বলের হাতে সেলাই করা উঁচু সিম লম্বা সময় ধরে সুইং ও মুভমেন্ট তৈরি করতে সহায়তা করে। ফলে প্রায়ই ৪০, এমনকি ৫০ ওভার পর্যন্তও বোলাররা সুইং পান। তাছাড়া বলে লেট সুইং হয় বলে টেকনিক্যাল জায়গা থেকে সামান্যতম ভুলেও ব্যাটের কানায় লেগে ক্যাচ উঠে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

ফলে টপ অর্ডারের জন্য ডিউকস বলে লম্বা সময় টিকে থাকাটা বেশ কঠিন। টেস্টে গত দুই-তিন বছরে বাংলাদেশের সেরা দুই ব্যাটার টেকনিকের দিক থেকে তর্কসাপেক্ষে সবচেয়ে দক্ষ দুজন - মুশফিকুর রহিম ও লিটন দাস, যারা ব্যাট করেন যথাক্রমে পাঁচ ও ছয়ে। কিন্তু শুরুর দিকের ব্যাটসম্যানরা ব্যর্থ হলে বাড়তি চাপে পড়ে যান তারাও, যা প্রতিদিন সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না।

তিন ও চারে নাজমুল হোসেন এবং মুমিনুল হক থাকলেও ডিউকস বলে বাংলাদেশের টপ অর্ডার পার করেছে চ্যালেঞ্জিং সময়। একের পর এক ওপেনিং জুটি বদল করেও খুব একটা কাজ হয়নি। কারণ লম্বা সময় ধরে সুইং বোলিংয়ের বিপক্ষে টিকে থাকা এবং রান বের করার টেকনিকেই রয়েছে ঘাটতি। আর এটা বিপদে ফেলেছে পরের ব্যাটসম্যানদেরও।

একটা ছোট পরিসংখ্যানই ডিউকস বলে ওপেনারদের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরে। ২০২২ সাল থেকে টেস্টে সবাই মিলে মাত্র ৩২.৪০ গড়ে করেছেন ১ হাজার ৫৫৭ রান। তিন মূল ওপেনার সাদমান ইসলাম, মাহমুদুল হাসান এবং জাকির হাসানের গড় যথাক্রমে ২৮, ২৬ এবং ২৩!

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইনিংসের ১০ থেকে ১৫ ওভারের মধ্যেই তারা আউট হচ্ছেন নিয়মিত। যেহেতু টেকনিকে দক্ষ ওপেনার রাতারাতি পাওয়া যাবে না, তাই এসজি বলে ফিরে যাওয়াটাই আদর্শ বলে ভাবছে বিসিবি। প্রথম ঘণ্টাটা পার করতে পারলে বড় ইনিংস খেলা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে, যা টেকনিকের দিক থেকে দুর্বল ব্যাটসম্যানদের জন্য সহায়ক হতে পারে।

আর সেই কারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের আগেই এসজি বলের যুগে ফেরার প্রাথমিক পরিকল্পনা করছে বিসিবি, এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে ইংলিশ দৈনিক দ্য ডেইলি সান। জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকেও এতে রয়েছে সবুজ সংকেত, চরচা-কে নিশ্চিত করেছে বিসিবির একটি সূত্র।

এরই মধ্যে কয়েকজন ক্রিকেটার অনুশীলনের জন্য ভারত থেকে পরিচিতদের দিয়ে এসজি বল আনানোর চেষ্টাও করছেন। চার বছর ডিউকস বলে খেলে আবার এসজিতে ধাতস্থ হতে তাদেরও যে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন!

এসজি বলে মানিয়ে নিতে বোলারদেরও দিতে হবে নতুন স্কিলের পরীক্ষা। বাংলাদেশের পেস বিপ্লবের শুরুটা হয়েছে ডিউকস বলের জমানাতেই। তবে নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ, হাসান মাহমুদ, শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান, খালেদ আহমেদদের ভালো করার কারণ শুধু ডিউকস বলই নয়। প্রায় একই সময়ে বিসিবি দেশের সব ভেন্যুতে উইকেটেও বড় পরিবর্তন এনেছে। বাড়তি ঘাস রেখে, বাউন্সি পিচে খেলানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল পেসারদের। শুধু তা-ই নয়, দলগুলোতে একাদশে নির্দিষ্ট সংখ্যক পেসার রাখা এবং তাদের দিয়ে বোলিং করানোর নির্দেশনাও ছিল বিসিবির। এসবের সুফল পেয়েছেন বোলাররা।

ডিউকস বল ছেড়ে আবার এসজি-তে ফেরার যুক্তিতে ভারতের উদাহরণও সামনে আসছে। ভারত তাদের রঞ্জি ক্রিকেটে এসজি বল ব্যবহার করে, দেশের মাটিতে টেস্টেও এসজি বল ব্যবহার করেই সাফল্য পাচ্ছে। দেশের বাইরেও ভারতের পেসাররা যেমন দাপট দেখান, তেমনি ব্যাটসম্যানরাও রান পান। শুধু তা-ই নয়, ইংল্যান্ডে ডিউকস বল বা অস্ট্রেলিয়ায় কোকাবুরা বলেও ভারত ৭-৮ বছর ধরেই ভালো করছে।

তাই এসজি বলে ফিরে গেলেই খেই হারাবেন পেসাররা, এমন শঙ্কায় জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের অবশ্য খুব বেশি নেই। নিজেদের বর্তমান স্কিলের সঙ্গে পুরনো বলেও ভালো করার জন্য পেসারদের আলাদা কাজ করতে হবে, এটা ঠিক। তবে তাসকিন-নাহিদরা সেটা পারবেন জানিয়েই জাতীয় দলের পক্ষ থেকে বোর্ডকে এসজি বল ব্যবহারে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।

তাছাড়া বিসিবির টেকনিক্যাল কমিটি মনে করছে, ডিউকস বল ব্যবহার করার মূল উদ্দেশ্য অনেকটাই পূরণ হয়েছে। তাদের চোখে, এসজি বলে ফিরে যাওয়ার আদর্শ সময় এটাই। বিষয়টি তাই প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশিই।

সে ক্ষেত্রে আবারও জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) এবং দেশের মাটিতে টেস্টে আবারও হয়তো স্পিনারদের ছড়ি ঘোরাতে দেখতে পাবেন। এসজি বলে সবসময়ই স্পিনাররা বাড়তি সুবিধা পান কিনা! বল পুরনো হলে গ্রিপ ভালো পাওয়া যায়, সঙ্গে উইকেটে ‘রাফ’ তৈরি হলে টার্নও পাওয়া যায় বেশি। ভারতীয় স্পিনাররাই তার প্রমাণ।

এ যুক্তিগুলোই অন্তত এই আশাও জাগায় যে, ডিউকস থেকে এসজি বলে শেষ পর্যন্ত যদি বিসিবি ফিরে যায়, তাহলে সেটা হয়তো খুব একটা ক্ষতিকর হবে না। ব্যাটসম্যানদের স্বার্থে বল পরিবর্তন করা হলেও সামগ্রিকভাবে তা দেশের ক্রিকেটের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে।

সম্পর্কিত