যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনীতির ভবিষ্যৎ যখন অনিশ্চিত, তখন যুদ্ধপরবর্তী ভবিষ্যৎ বিবেচনা করা অকালবোধন মনে হতে পারে। গত ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের পর দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ আবারও তীব্রতর হয়। আর সই করা নথিটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। উভয় পক্ষই বড় ধরনের হামলা শুরু করে। ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন যে, ইরান আবারও একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে।
২৭ জুলাই টানা দুই সপ্তাহের বোমাবর্ষণের পর ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয়। ইরানও একইভাবে সাড়া দেয়। তবে সামরিক শত্রুতা পুনরায় শুরু হওয়ার ঝুঁকি উচ্চমাত্রায় থেকে যায়। তারপরেও যুদ্ধ যে দিকেই যাক না কেন, এর চূড়ান্ত পরিণতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক হামলার ফলে ইরান কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব অনুভব করবে না বা তাদের আলোচনার অবস্থান শিথিল করবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে–তারা ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উৎখাত করতে পারবে না।
এই যুদ্ধ সত্ত্বেও ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল। তাই জরুরি প্রশ্নটি হলো– সংঘাতের সমাপ্তির জন্য একটি মহাপরিকল্পনা ইরানি রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য কী অর্থ বহন করবে। প্রচলিত ধারণা হলো যে, একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছানো কেবল বিদ্যমান কট্টরপন্থী নেতৃত্বকেই আরও ক্ষমতাবান করবে। তবে এটি ইরানের অভ্যন্তরে সক্রিয় গুরুত্বপূর্ণ গতিশীলতাকে উপেক্ষা করে।
প্রকৃতপক্ষে, একটি কূটনৈতিক চুক্তি ইরানে গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। এই প্রভাবগুলো অবিলম্বে দেখা যাবে না বা স্বল্পমেয়াদে অনুভূত হবে না। তবে সঠিক পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে এগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। অতএব, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো যুদ্ধপরবর্তী পরিস্থিতি কীভাবে সেরা উপায়ে তৈরি করা যায় যেখানে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর বিকাশের সম্ভাবনা হ্রাস পাওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধি পাবে।
ইরানের সাথে যুদ্ধের একটি কূটনৈতিক সমাপ্তি যদি ঘটে, তবে তাতে কোনো না কোনো ধরনের মহাপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। যার মূল রূপরেখা জুন মাসের স্মারকে বর্ণিত শর্তাবলির কাছাকাছি হতে পারে। অবশ্য একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ হবে না এবং এর গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য স্থগিত করা হতে পারে। তবে একবার যুদ্ধবিরতি অর্জিত হলে আরও উত্তেজনা প্রতিরোধে ও যুদ্ধে ফিরে যাওয়া বন্ধ করতে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত নিরসন পদ্ধতি চালু করা অপরিহার্য।অবিলম্বে কার্যকর হওয়া চুক্তিগুলোর কিছু বিধান ইরানি রাজনীতিকে ইতিবাচক দিকে প্রভাবিত করবে। সাধারণ অর্থে, ইরানে গণতন্ত্রায়ন পঙ্গু করে দেওয়া নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের সাথে সম্পূর্ণ মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের সময় নাগরিক অবকাঠামোয় বোমাবর্ষণের ফলে সৃষ্ট দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক দুর্দশার সম্প্রসারণ রাষ্ট্রকে শক্তিশালী আর সমাজকে দুর্বল করেছে।
সহজ কথায়, যখন মানুষ অনাহারে থাকে এবং ওপর থেকে বোমা পড়ে, তখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন সংগঠিত করা অসম্ভব। ইরানকে সামাজিকভাবে দরিদ্র এবং সামরিকভাবে শাস্তি দিলে গণঅভ্যুত্থান ঘটবে–এই ধারণাটি একটি কাল্পনিক চিন্তা ছাড়া কিছুই ছিল না। এবং যুদ্ধ সেই বিষয়টিকেই প্রমাণ করেছে।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি বৈধতার সংকটের মুখোমুখি। যুদ্ধ জাতীয়তাবাদের জোয়ার তৈরি করেছে এবং সাময়িকভাবে নেতৃত্বের বৈধতা নিশ্চিত করেছে ঠিকই। কিন্তু যে মূল অসন্তোষের কারণে জানুয়ারি মাসে ব্যাপক গণপ্রতিবাদ গড়ে উঠেছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে। এটি বিশেষ করে ইরানের বিশাল নগরভিত্তিক তরুণ জনসংখ্যার ক্ষেত্রে সত্য। ভবিষ্যতে যে ইরান আর যুদ্ধ বা যুদ্ধের হুমকির সম্মুখীন হবে না এবং যেখানে অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য আর বিদেশি নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করা যাবে না, সেখানে দেশের দুর্দশার জন্য সরকারের জবাবদিহি, জনগণের ইচ্ছার সাথে এর চরম বিচ্ছিন্নতা এবং এর ব্যাপক দুর্নীতি অনিবার্যভাবে সামনে চলে আসবে।
মার্কিন নীতি নির্ধারকদের জন্য বিস্ময়কর হতে পারে, যারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে সামরিক চাপের সাথে অর্থনৈতিক অবরোধ গণতান্ত্রিক সুযোগ তৈরি করবে। এই ভুল বোঝার অনেকটাই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত যুদ্ধের দাপ্তরিক যৌক্তিকতাকে প্রতিফলিত করে। উভয় সরকারই মুখে বলেছে যে, সামরিক হস্তক্ষেপ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানি জনগণকে বলেছিলেন যে, ইসরায়েল তাদের স্বাধীনতার পথ পরিষ্কার করছে। জানুয়ারিতে যখন দেশটি বিক্ষোভে উত্তাল ছিল, তখন ট্রাম্প ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করার আহ্বান জানিয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সাহায্য আসছে। ২০২৬ সালের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নেতানিয়াহু লেখেন যে, তারা স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ পরিচালনা করছেন। বোমাবর্ষণ শুরু হলে ট্রাম্প ইরানিদের বলেছিলেন যে তাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে।
এই তীব্র বোমাবর্ষণ উল্টো প্রভাব ফেলেছে। শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং অন্যান্য অনেক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ডের পরও শাসনব্যবস্থা টিকে গেছে। এটি অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতা সুসংহত করেছে। বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে অচলাবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে ইরান। ট্রাম্প আহ্বান জানানো সত্ত্বেও ইরানিরা রাস্তায় নেমে আসেনি। যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাবের বালিকা বিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানে হামলার ঘটনা দ্রুত ইরানিদের দেশপ্রেমকে উজ্জীবিত করে তোলে।
তেহরানে হামলায় নিহত ইরানি সামরিক কমান্ডারদের জানাজা অনুষ্ঠানে মোজতবা খামেনি ও প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি হাতে এক নারী। ছবি:রয়টার্স।
জুলাইয়ের শুরুতে খামেনির ছয় দিনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে এই প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এই বিশাল জনসমাগমে সরকারের মূল সমর্থকদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল বলে সেখানে উপস্থিত বিদেশি সাংবাদিকরা জানিয়েছেন। যুদ্ধের ফলে অনেক সংশয়ী ইরানি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেপের এই তত্ত্বকেই নিশ্চিত করে যে বহিরাগত বোমাবর্ষণের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ক্রিয়াকলাপ খুব কমই সফল হয়।
ইরানে গণতন্ত্রায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছয়টি উপাদানের মধ্যে গত ২৫ বছরে পাঁচটি শর্তই পূরণ হয়েছে। যেমন–উচ্চ সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রায় ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক স্বাক্ষরতার হার, ৭৮ শতাংশ নগরায়ণ এবং একটি কার্যকরী প্রশাসনিক রাষ্ট্র। পাশাপাশি দেশটির রয়েছে ১৯০৫ সালের সাংবিধানিক বিপ্লবের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাস এবং কোনো বিভেদকারী জাতিগত সমস্যা ছাড়াই এক সুদৃঢ় জাতীয় সংহতি। ইরানের একমাত্র খামতি ছিল একটি বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি। কারণ তেলের ওপর দীর্ঘ নির্ভরশীলতা এক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতার জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান এখন ধাতু, পেট্রোকেমিক্যাল এবং কৃষি পণ্য রপ্তানি করতে শুরু করেছে, যা এর অর্থনীতিকে কেবল তেলনির্ভরতা থেকে কিছুটা বের করে এনে নতুন রাজনৈতিক সুযোগের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
২০১৫ সালের পরমাণু সমঝোতা বা জেসিপিওএ ইরানে গণতন্ত্রের জন্য একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় ধ্বংসাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ইরানি গণতন্ত্রীরা হতাশ হয়ে পড়েন এবং কট্টরপন্থীরা তাদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পায়। ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৮ মাসের মধ্যে দুইবার ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। যুদ্ধের ফলে কট্টরপন্থীরা ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির কাছে সুচারুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি হয়েছে।
একই সাথে সামরিক বাহিনী ও ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। অভ্যন্তরীণভাবে বিরোধী দলগুলো এখনো বিভক্ত ও অসংগঠিত। সরকার গত ২০২৫ সালে ১৫০০ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩৭০ জনকে ফাঁসি দিয়ে দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে, যা যুদ্ধের কারণে আরও সহজ হয়েছে। এর ওপর বিরোধী নেতা রেজা শাহ পাহলভির গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে বর্তমান বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন দুই নীতি নির্ধারিত হয়েছে–তারা সরকারের সাথে নীতিগত সমঝোতা করবে না এবং বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর বিরোধিতা করবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমারা যুদ্ধসংক্রান্ত মনোভাব পরিবর্তন করে এবং অকার্যকর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে যদি কেবল মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ওপর টার্গেটেড নিষেধাজ্ঞা জারি করে, তবে তা ইরানি সুশীল সমাজকে শক্তিশালী করবে। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ফিরে এলে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা কেটে গেলে ইরানের ৭০ শতাংশ তরুণ জনসংখ্যা আবারও সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও প্রতিনিধিত্বের দাবিতে সোচ্চার হবে। যদিও এই যুদ্ধ বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আয়ু কিছুটা বাড়িয়েছে, তবে তা সাময়িক। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটলে ইরানিদের নিজস্ব রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের সংগ্রাম আবারও নতুন শক্তিতে জেগে উঠবে।
নাদের হাশেমি: আল-ওয়ালিদ সেন্টার ফর মুসলিম-ক্রিশ্চিয়ান আন্ডারস্ট্যান্ডিং-এর পরিচালক এবং জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামী রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক।
(এই লেখাটি ওয়াশিংটন ভিত্তিক জনপ্রিয় সাময়িকী ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)