মার্কিন সিনেটে রাশিয়ার ওপর নতুন ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি দ্বিপক্ষীয় বিল আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে। এই আইনটির মূল উদ্দেশ্য হলো, রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপ করা। এই বিলের কারণে সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হতে পারে চীন, ভারত, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজান।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, মার্কিন সিনেটের এই সিদ্ধান্তের ফলে সরাসরি প্রভাবিত হতে যাওয়া বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের তালিকায় অন্যতম প্রধান নাম হিসেবে উঠে এসেছে ভারতের নাম। রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় কমাতে ও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাকে সীমিত করাই এই বিলের প্রাথমিক কৌশলগত উদ্দেশ্য। এর পাশাপাশি, এই নিষেধাজ্ঞার পরিধি কেবল রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। এতে ইরানের ওপরও নতুন নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাতে ইরানের যুদ্ধকালীন অর্থনীতি দুর্বল করা যায় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহেরানের ওপর কৌশলগত চাপ বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়।
এক্সপ্রেসের নিবন্ধ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ ও দ্বিপক্ষীয় খসড়া আইনটির মূল স্থপতি ছিলেন প্রয়াত মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম। মার্কিন রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান গ্রহণকারী এই আইনপ্রণেতা গত ১১ জুলাই হঠাৎই মারা যান। উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনে যখন সিনেটর গ্রাহামের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হচ্ছিল, ঠিক সেই দিনেই মার্কিন সিনেটে সর্বসম্মতভাবে এই জটিল ও স্পর্শকাতর বিলটি অনুমোদন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সিনেটের গ্রাহামের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে এবং তার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন করতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সিনেটেররা অভূতপূর্ব এক রাজনৈতিক ঐক্য প্রদর্শন করেন, যা সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিভক্ত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ওয়াশিংটনে আয়োজিত লিন্ডসে গ্রাহামের এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় বিশ্ব রাজনীতির বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
এরমধ্যে ওয়াশিংটন সফরে থাকা ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি কেবল শেষকৃত্যানুষ্ঠানেই যোগ দেননি, বরং মার্কিন সিনেটের গ্যালারিতে সশরীরে উপস্থিত থেকে বিলটির ঐতিহাসিক ভোটাভুটি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেন।
ইউক্রেন যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই রাশিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব যেভাবে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল, এই বিলটির অনুমোদন তাদের সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই বিলের ব্যাপারে মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান সদস্যদের একটি যৌথ বিবৃতি তুলে ধরা হয়েছে। বিবৃতিতে আইনপ্রণেতারা স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রয় করে যারা প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রে অর্থের জোগান দিয়ে যাচ্ছে, তাদের পথরোধ করার লক্ষ্যে এই সমঝোতামূলক আইন ঘোষণা করতে পেরে তারা গর্বিত।
একই সাথে তারা উল্লেখ করেন যে, এই বিলের মাধ্যমে ইরান সরকারের সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রসারের সক্ষমতাকেও ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত করা সম্ভব হবে। সিনেটরদের বক্তব্য অনুযায়ী, লিন্ডসে গ্রাহামের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ভোটাভুটিতে জয়ী হওয়াই হলো তার ঐতিহাসিক অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সর্বোত্তম উপায়।
এ বিষয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে, কীভাবে এই আইন রাশিয়ার পাশাপাশি ইরানের ওপরও সমানভাবে চাপ সৃষ্টি করবে। মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপ– উভয় অঞ্চলেই মার্কিন যে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ ও নিরাপত্তার সমীকরণ রয়েছে, তা রক্ষায় এই জোড়া নিষেধাজ্ঞার কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিকে খর্ব করার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তারা যেন নতুন করে কোনো অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে কিংবা তাদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে কাজ করেছে।
একই সঙ্গে, রাশিয়ার বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাণিজ্যকে সংকুচিত করার এই মার্কিন প্রয়াস স্পষ্টতই বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতের মতো একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই মার্কিন আইন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল পরিস্থিতি তৈরি করতে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে কম দামে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে আসছিল। এই আমদানির ফলে ভারতের নিজস্ব বাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় রাখা সহজ হয়েছিল। কিন্তু এখন মার্কিন সিনেটে গৃহিত বিলে রাশিয়ার কাছ থেকে শীর্ষ তেল ও জ্বালানি পণ্য ক্রেতা দেশগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে ভারতের ওপর মারাত্মক আর্থিক চাপ সৃষ্টি হবে।
ভারতের মতো একটি দেশের জন্য এই শুল্কের হার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেবে।
মার্কিন নীতি নির্ধারকেরা রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে মূলত বিশ্বব্যাপী রুশ জ্বালানির ক্রেতাদের নিশানা বানিয়েছেন। মার্কিন সিনেটরদের মতে, ইউরোপে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক মূলে আঘাত হানা ব্যতিরেকে এই যুদ্ধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। রাশিয়ার জাতীয় আয়ের একটি প্রধান উৎস হলো তাদের অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি এই পণ্যের বড় ক্রেতারা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তারা বাধ্য হয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে কেনাকাটা কমিয়ে দেবে অথবা পুরোপুরি বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
এর ফলে রাশিয়ার কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এক ধাক্কায় বহুলাংশে কমে যাবে, যা তাদের সামরিক বাজেট পরিচালনা ও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে প্রত্যক্ষভাবে আঘাত করবে।
প্রয়াত সিনেটর গ্রাহাম বহু বছর ধরে রাশিয়ার আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে এবং ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে মার্কিন কংগ্রেসে সোচ্চার ছিলেন। তার জীবনাবসানের পর এই দীর্ঘদিনের স্থগিত বিলটি পাস হওয়া কেবল একটি কূটনৈতিক পদক্ষেপই নয়, বরং এটি মার্কিন আইনপ্রণেতাদের আবেগি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও বহিঃপ্রকাশ। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট– দুই বিপরীত মেরুর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যবর্তী বিভাজন ভুলে এই জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে একজোট হওয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুদৃঢ় ও কঠোর অবস্থানের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রে গৃহিত নতুন এই দ্বিপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা বিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্মিলিত কৌশল একদিকে যেমন মস্কোর অর্থনৈতিক ভিত্তি ও ইরানের শক্তি সামর্থ্য দুর্বল করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, অন্যদিকে ভারতের মতো বন্ধুপ্রতীম ও বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোকে রুশ জ্বালানি সম্পদ ক্রয় বন্ধের জন্য এক চূড়ান্ত অর্থনৈতিক হুমকির সম্মুখীন করছে। এই ১০০ শতাংশ শুল্কের ভয়াবহতা এবং মার্কিন সিনেটে গৃহীত বিলের সামগ্রিক প্রভাব কীভাবে উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলো সামলে নেবে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে এর প্রতিক্রিয়া কতটা তীব্র হবে, তা আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।