Advertisement Banner

পর্ব-২

যুক্তরাষ্ট্রের ভালো বিকল্প কি চীন-রাশিয়া?

হ্যাল ব্র্যান্ডস
হ্যাল ব্র্যান্ডস
যুক্তরাষ্ট্রের ভালো বিকল্প কি চীন-রাশিয়া?
প্রতীকী ছবি। এআই দিয়ে নির্মিত

গত দশকের বেশির ভাগ সময় ধরে মনে হচ্ছিল যে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এক বিশ্বের পর তৈরি হবে একটি ‘দুই বিশ্ব’–অর্থাৎ একটি সমন্বিত বৈশ্বিক ব্যবস্থার স্বপ্ন রূপান্তরিত হবে ব্লকের মধ্যকার এক তুমুল লড়াইয়ে। এই দৃশ্যপটে, চীনের নেতৃত্বাধীন ব্লকে অন্তর্ভুক্ত থাকবে আক্রমণাত্মক ইউরেশীয় স্বৈরাচারী রাষ্ট্রগুলো এবং সেই সাথে কিউবা থেকে পাকিস্তান এবং গ্লোবাল সাউথের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নানা সহযাত্রী দেশ।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্লকে থাকবে ইউরেশিয়ার পেরিফেরিতে থাকা গণতান্ত্রিক মিত্র দেশগুলো। আর ভারত থেকে সৌদি আরব, ব্রাজিল থেকে ইন্দোনেশিয়ার মতো একঝাঁক ‘সুইং স্টেট’ বা দোদুল্যমান রাষ্ট্র এই দুই ব্লকের সাথে নিজেদের সুবিধামতো সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং সুযোগসন্ধানীভাবে তাদের মাঝখানে নিজেদের অবস্থান তৈরি করবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ মূলত আমাদের আবার স্নায়ুযুদ্ধের অতীতের দিকেই ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। অবশ্য এটি পুরোপুরি অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি হবে না। কারণ বিশ্বব্যাপী চীনের কাছে অর্থনৈতিক আকর্ষণ এবং জোরজুলুম করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়ে অনেক ভালো বিকল্প রয়েছে। তবে এই দৃশ্যপটে নিষেধাজ্ঞা এবং সাপ্লাই চেইনের অস্ত্রায়নের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে খণ্ডিত হয়ে পড়বে। বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা ডিকাপলিংয়ের বিষয়টি তখন আর ‘হবে কি হবে না’ সেই প্রশ্ন থাকবে না। বরং তা হবে ‘কখন এবং কার শর্তে হবে’ সেই বিষয়।

স্নায়ুযুদ্ধের মতোই এই দ্বিপাক্ষিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিটি অঞ্চলকে গ্রাস করবে। সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানগুলো– যেমন ইউক্রেন, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর– ভূরাজনৈতিক বিভাজনের ঠিক সীমানার ওপর অবস্থান করবে। আমরা পছন্দ করি বা না করি, শক্তিশালী কাঠামোগত শক্তিগুলো এই ভবিষ্যৎকে উৎসাহিত করছে। মার্কিন-চীন উত্তেজনা কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা সাময়িক সংকটের কারণে ওঠানামা করতে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও সমীহ করতে পারেন। কিন্তু মূল দ্বন্দ্বটি কেবল তীব্রতর হচ্ছে। কারণ প্রযুক্তিতে, বিশ্ব বাণিজ্যে এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে আধিপত্য বিস্তারের জন্য চীনের যে মরিয়া চেষ্টা, তা সরাসরি মার্কিন ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার গায়ে গিয়ে আঘাত করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

পরাশক্তিদের লড়াই আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে মেরুকরণ করার প্রবণতা রাখে। এই ধরনের তীব্র বিবাদের মধ্যে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা তখন দুর্বলতার উৎসে পরিণত হয়। অনেক ক্ষেত্রেই এই ভবিষ্যতের দিকে যাত্রার গতি এখন ত্বরান্বিত হচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ ইউরেশীয় স্বৈরাচারী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং সামরিক জোটকে আরও শক্তিশালী করেছে। সি এবং রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভালো করেই জানেন যে, তারা কেবল গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পিঠাপিঠি লড়াই করেই জয়ী হতে পারবেন। আসল প্রশ্ন হলো, ওয়াশিংটন এখনো মুক্ত বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারবে কি না।

আমেরিকার বর্তমান বৈদেশিক নীতির ইতিবাচক দিকগুলো ওয়াশিংটন এবং তার মিত্রদের একটি নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করতে পারে। কিন্তু এর নেতিবাচক বা অন্ধকার দিকগুলো ভিন্ন এক গল্প বলে। ট্রাম্প প্রশাসনের কৃতিত্ব এটাই যে তারা আন্তঃসংযুক্ত হুমকি মোকাবিলার জন্য উচ্চ সামরিক ব্যয়ের দাবি জানিয়ে একটি সশস্ত্র গণতান্ত্রিক সম্প্রদায় গড়ে তুলছে। আমেরিকার উদ্ভাবন ক্ষেত্রে মিত্রদের বিনিয়োগ নিয়ে আসা বাণিজ্য চুক্তিগুলো চীনের অর্থনৈতিক স্কেলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ও উৎপাদনের মেলবন্ধন ঘটাতে পারে। বিরল খনিজ অংশীদারিত্ব বা ক্রিটিক্যাল মিনারেলস পার্টনারশিপ চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে বাঁচার একটি দীর্ঘমেয়াদি পথ তৈরি করছে।

তা ছাড়া আমেরিকা স্বৈরাচারী অক্ষের অপেক্ষাকৃত দুর্বল সদস্যদের– যেমন ইরান ও ভেনেজুয়েলাকে– আঘাত করে কিছুটা দুর্বল করে রেখেছে। হয়তো কিউবা হবে এর পরবর্তী লক্ষ্য। এবং ইতিহাস যদি কোনো দিকনির্দেশনা দেয়, তবে এই গোলার্ধে আমেরিকার নিজস্ব আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার যে নীতি বা ‘ডনরো ডকট্রিন’, তা বৃহত্তর বিশ্বে ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি পূর্বশর্ত। তবে এই নীতির অন্ধকার দিকও রয়েছে। ট্রাম্পের যে চিন্তাভাবনা– যেখানে বড় রাষ্ট্রগুলো সব সিদ্ধান্ত নেবে এবং ছোট দেশগুলো তাদের ভাগ্য মেনে নেবে– তা তাকে মার্কিন মিত্রদের চেয়ে সি এবং পুতিনের মতো নেতাদের সাথে আলোচনার জন্য বেশি উপযুক্ত করে তোলে।

তার জোরপূর্বক এবং অসম চুক্তি করার মানসিকতা এই ধারণাই দেয় যে তিনি গণতান্ত্রিক সম্প্রদায়কে শক্তিশালী করার চেয়ে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায় করতেই বেশি আগ্রহী। গ্রিনল্যান্ড ও কানাডার ওপর অধিকার দাবির মতো বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকে ভূমিগ্রাসী সংশোধনবাদীদের কাতারে দাঁড় করানোর ঝুঁকি তৈরি করে এবং মুক্ত বিশ্বের ট্রান্স-অ্যাটলান্টিক কোর বা মূল ভিত্তিকে ভেঙে ফেলার হুমকি দেয়। ইউরোপীয় মিত্ররা দিন দিন আরও বেশি আশঙ্কা করছে যে তারা তিনটি লোভী শক্তির মধ্যে আটকা পড়ে যাচ্ছে– চীন, রাশিয়া এবং স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র। যদি তা-ই হয়, তবে কোনো নতুন স্নায়ুযুদ্ধ হবে না। কারণ স্বৈরাচারী ব্লককে প্রতিহত করার মতো কোনো গণতান্ত্রিক ব্লকই তখন আর অবশিষ্ট থাকবে না।

তবুও, এই দুই-বিশ্বের দৃশ্যপটকে পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ট্রাম্পের যুগ ধ্বংসাবশেষের পাশাপাশি কিছু নতুন নির্মাণের পথও রেখে যাবে। স্বৈরাচারী হুমকি যত তীব্র হবে, গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মধ্যে কেবল লেনদেনের স্বার্থে হলেও সহযোগিতার তাগিদ তত বাড়বে। ট্রাম্পের উত্তরসূরিরা যদি কেবল নিজেদের পকেট ভারী করার পরিবর্তে একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের গল্প বলতে পারেন, তবে তারা হয়তো মুক্ত বিশ্বের জন্য একটি নতুন চুক্তি তৈরি করতে পারবেন, যেখানে সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং দায়িত্ব ভাগাভাগির নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। এই ভবিষ্যৎ অবশ্যই সংকট ও সংঘাত নিয়ে আসবে, বিপদের কোনো কমতি থাকবে না। কিন্তু সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটাই এখনো সবচেয়ে ভালো দৃশ্যপট। কারণ একটি চীন-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা বা আরও বেশি খণ্ডিত হয়ে পড়া ব্যবস্থার চেয়ে দুটি ব্লকে বিভক্ত বিশ্ব অনেক বেশি শ্রেয়।

দ্বিতীয় দৃশ্যপটটি হলো, মার্কিন-পরবর্তী বিশ্ব দুটি বৃহৎ ব্লকে বিভক্ত না হয়ে বরং কয়েকটি ছোট, আঞ্চলিক প্রভাব বলয়ে বা স্ফিয়ার্স অব ইনফ্লুয়েন্সে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র হনলুলু থেকে নুউক, আর্কটিক থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি গোলার্ধীয় সাম্রাজ্যের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা বা সুরক্ষার সন্ধান করবে। ওয়াশিংটন যখন সমুদ্রপারের বৈশ্বিক দায়দায়িত্বকে বিদায় জানাবে, তখন চীন দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব সুসংহত করবে। রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত অঞ্চল এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু অংশে হয়তো রক্তক্ষয়ী উপায়ে নিজের আধিপত্য নিশ্চিত করবে। কিন্তু এই প্রভাব বলয়ের বিভাজন কেবল পরাশক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

একটি খণ্ডিত বিশ্বে, ভারত দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের চেষ্টা করবে। তুরস্ক ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলে একটি পোস্ট-অটোমান বা নব্য-উসমানীয় সাম্রাজ্যের মতো প্রভাব বিস্তার করতে চাইবে। ইসরায়েল, সৌদি আরব এবং অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পারস্য উপসাগর এবং হর্ন অব আফ্রিকাকে সংযোগকারী লোহিত সাগর অঞ্চলে আধিপত্যের জন্য একে অপরের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। ‘প্যাক্স অ্যামেরিকানা’র অবসানের পর আসবে এক নতুন সাম্রাজ্যের যুগ।

এই সাম্রাজ্যগুলো যে নাৎসি শাসিত ইউরোপের মতো সামরিকভাবে অবরুদ্ধ বা পুরোপুরি সিলগালা করা থাকবে তা নয়– আধিপত্যের প্রকাশ নানা রূপে হতে পারে। তবে এই ধরনের ভবিষ্যতে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ক্ষমতার রাজনীতির পাথরে আঘাত খেয়ে ভেঙে পড়বে। আন্তর্জাতিক আইন বিলুপ্ত হয়ে যাবে যখন আঞ্চলিক প্রভাবশালীরা গ্রহণযোগ্য আচরণের নিজস্ব নিয়ম তৈরি করবে। তারা বাধ্য না হওয়া ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোকে চাপ দেবে বা তাদের ক্ষমতাচ্যুত করবে। আঞ্চলিক শাসকরা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সম্পদের প্রবাহ নিজেদের মতো করে ঘুরিয়ে দেবে; তারা অন্য শক্তির সাথে দুর্বল প্রতিবেশীদের সম্পর্কের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করবে। (চলবে)

কাল পড়বেন: যুক্তরাষ্ট্র একটি পথভ্রষ্ট রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে

লেখক: জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো।

(এই দীর্ঘ নিবন্ধ মূলত ফরেন পলিসি সাময়িকীর স্প্রিং ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

সম্পর্কিত