ads

এআই ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: বদলাও, নয়তো বিপদ সামনে

এআই ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা: বদলাও, নয়তো বিপদ সামনে
এআই-এর যুগে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কীভাবে শিখবে, তা ভেবে শিক্ষাব্যবস্থা বদলানো খুব প্রয়োজন। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

কয়েক বছর আগেও কোনো শিক্ষার্থী যদি একটি প্রবন্ধ, গবেষণার সারাংশ বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম লিখতে চাইত, তবে তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হতো। আজ চ্যাটজিপিটি, জেমিনি কিংবা কোপাইলট-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি কয়েক সেকেন্ডেই সেই কাজ করে দিতে পারে। ফলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—তথ্য যখন মুহূর্তেই পাওয়া যায়, তখন শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কি এই নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে এআই-এর প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডাব্লিউইএফ) ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে কোটি কোটি কর্মক্ষেত্র বদলে যাবে; একই সঙ্গে বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং এআই-স্বাক্ষরতা ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হয়ে উঠবে। অর্থাৎ শুধু তথ্য জানলেই চলবে না; তথ্যকে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার করার ক্ষমতাই হবে মূল যোগ্যতা।

Advertisement

বাংলাদেশে এই পরিবর্তন আরও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীই আগামী কয়েক দশকের শ্রমবাজার নির্ধারণ করবে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মূলত পরীক্ষা, মুখস্থবিদ্যা এবং সনদকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা কীভাবে চিন্তা করবে, প্রশ্ন করবে বা নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করবে—এই দক্ষতার চেয়ে কীভাবে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাবে, সেটিই বেশি গুরুত্ব পায়।

নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শিক্ষা কখনোই শুধু পাঠ্যবই শেখার বিষয় নয়; এটি একটি সমাজ কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায়, তারও প্রতিফলন। প্রতিটি সমাজ শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজের মূল্যবোধ, জ্ঞান এবং ভবিষ্যতের কল্পনাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সেই কল্পনাই বদলে যাচ্ছে। যদি একটি যন্ত্র কয়েক সেকেন্ডে রচনা লিখতে পারে, তবে শিক্ষার্থীর প্রকৃত মূল্যায়ন হবে তার মুখস্থ জ্ঞানে নয়, বরং তার প্রশ্ন করার ক্ষমতা, নৈতিক বিচারবোধ, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার দক্ষতায়।

এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের অধিকাংশ শ্রেণিকক্ষে এখনো শিক্ষক কথা বলেন, শিক্ষার্থীরা শোনে। পরীক্ষায় বইয়ের ভাষা যত নিখুঁতভাবে পুনরুৎপাদন করা যায়, তত বেশি নম্বর পাওয়া যায়। ফলে শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে তথ্য পুনরাবৃত্তির প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। অথচ এআই তথ্য পুনরাবৃত্তিতে মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং দক্ষ। তাই যে শিক্ষা মুখস্থবিদ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই শিক্ষা সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

নৃবিজ্ঞানী টিম ইঙ্গোল্ড শিক্ষা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন—শিক্ষা হলো পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া। অর্থাৎ শিক্ষা শুধু উত্তর শেখায় না; শেখায় কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রায়ই পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও গবেষণা, উদ্ভাবন কিংবা স্বাধীন চিন্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো, এটি বিদ্যমান শিক্ষাগত বৈষম্যকে আরও গভীর করতে পারে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬০ কোটি মানুষ এখনো ইন্টারনেটের বাইরে। বাংলাদেশে বিটিআরসির হিসাবে ইন্টারনেট গ্রাহক ১৩ কোটির বেশি হলেও, উচ্চগতির সংযোগ, ব্যক্তিগত কম্পিউটার এবং এআই-নির্ভর শিক্ষাসেবা ব্যবহারের সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যও দেখায়, শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল ডিভাইসের এবং ইন্টারনেট ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে।

নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রযুক্তি কখনোই নিরপেক্ষ নয়; এটি সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতা ও সম্পদের অসম বণ্টনকে অনেক সময় আরও দৃশ্যমান করে। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়তো চ্যাটজিপিটি, ক্লদ বা জেমিনি ব্যবহার করে গবেষণা, প্রোগ্রামিং কিংবা ভাষা শেখার সুবিধা পাচ্ছে। অন্যদিকে চরাঞ্চল বা পাহাড়ি অঞ্চলের একজন শিক্ষার্থী দুর্বল ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইসের অভাব কিংবা ডিজিটাল দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করলেও তাদের শেখার বাস্তবতা এক নয়। যদি রাষ্ট্র এখনই ডিজিটাল অবকাঠামো, এআই-স্বাক্ষরতা এবং প্রযুক্তিতে সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষায় সমতা আনার পরিবর্তে বিদ্যমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকেই নতুন প্রযুক্তিগত বৈষম্যে রূপান্তরিত করবে।

তবে এই পরিবর্তনকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই। ইতিহাস বলে, প্রতিটি নতুন প্রযুক্তিই শিক্ষা ব্যবস্থাকে বদলেছে। ছাপাখানার আবিষ্কার যেমন বইকে সবার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, ইন্টারনেট যেমন জ্ঞানকে বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত করেছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও শিক্ষাকে আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক, দ্রুত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী নিজের গতিতে শিখতে পারবে, দুর্বল বিষয়গুলো নিয়ে আলাদা অনুশীলন করতে পারবে এবং মাতৃভাষায়ও জটিল বিষয় সহজে বুঝতে পারবে।

তাই বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো এআই-কে নিষিদ্ধ করা নয়; বরং দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার শেখানো। বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই-স্বাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কোন কাজ এআই করতে পারে, কোন কাজ মানুষেরই করতে হবে এবং এআই-নির্ভর তথ্য কীভাবে যাচাই করতে হয়। একই সঙ্গে পরীক্ষা পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। মুখস্থনির্ভর প্রশ্নের পরিবর্তে বিশ্লেষণ, যুক্তি, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানভিত্তিক মূল্যায়ন বাড়াতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে শিক্ষার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন প্রযুক্তি নয়; মানুষ। আমরা কি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারব, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের বিকল্প হবে না, বরং তার সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে? যদি পারি, তবে এআই বাংলাদেশের জন্য হুমকি নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। কিন্তু যদি আমরা এখনো শুধু মুখস্থবিদ্যা আর সনদকেন্দ্রিক শিক্ষায় আটকে থাকি, তাহলে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে আমাদের তরুণরাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই সময়ের দাবি একটাই—শিক্ষাকে তথ্যনির্ভর নয়, চিন্তানির্ভর করতে হবে। কারণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তথ্য নয়; মানুষের সৃজনশীল চিন্তা।

সম্পর্কিত