ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য পর্দাঘেরা স্থান চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন মেনুও উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু নতুন মেনুকার্ড পড়ে গেছে পর্দার আড়ালে। সেই কার্ডে কী আছে–তাও এমনকি অজানা। শুধু ডাকসু কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেছেন, ‘স্বাভাবিক মেনু’। কিন্তু ওই ‘স্বাভাবিক’ মেনু কার্ড কি তার সহযাত্রীদের মুখ লুকানোর ‘অস্বাভাবিক’ কাজেও লাগছে?
টিএসসির ক্যাফেটেরিয়ায় টাঙানো পর্দা অনেকেরই চোখের পর্দা সরিয়ে দিয়েছে। এটিকে অনেকেই দেখছেন ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের ডাকসু জয়ের অবধারিত ফল হিসেবে। না দেখার কোনো কারণ কী আছে?
একটু খোলাসা করা যাক। এই তো কিছুদিন আগে বিশ্বকাপ চলার সময় শিক্ষার্থীদের জন্য খেলা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে সময় সাবেক ও বর্তমান নারী শিক্ষার্থীদের খেলা দেখতে পারা-না পারা নিয়ে বেশ একটা হুজ্জত হলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছেলে শিক্ষার্থীরা তাদের মেয়ে সহপাঠীদের খেলা দেখা রুখতে শুধু জাঙ্গিয়া পরে খেলা দেখার ইচ্ছা প্রকাশ পর্যন্ত করল।
ছেলে শিক্ষার্থী বলাটা একটু ভুল হলো। বলা উচিত–কতিপয় ছেলে শিক্ষার্থী। সে সময় থেকেই নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আর নিরাপদ নেই বলে শিক্ষার্থীদের একাংশ বলে আসছিল। এখন ক্যাফেটেরিয়ায় পর্দা ঝুলিয়ে পৃথক বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, এটা কি অনিরাপদ পরিবেশ গড়ে নারী শিক্ষার্থীদের খোঁয়াড়ে ঢোকানোর একটি প্রক্রিয়া?
মেয়েদের জন্য পর্দায় ঘেরা স্থানটি উদ্বোধনের পর এ নিয়ে তীব্র আলোচনা, সমালোচনার মুখে ডাকসু নেত্রী উম্মে সালমা অবশ্য বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে অহেতুক রাজনীতি করা হচ্ছে। তার মতে, এখানে মেয়েদের বসতেই হবে–এমন নয়। এটা কোনো বাধ্যতামূলক স্থান নয়। যার ইচ্ছা, তিনি বসবেন। যার ইচ্ছা নয়, বসবেন না। কিন্তু এই পর্দায় ঘেরা স্থানটি কি এক ধরনের নির্দেশনাও তৈরি করে না? এটা কি ক্যাম্পাসকে নারীদের জন্য আরও অনিরাপদ করে তুলে তাদের এই পর্দাঘেরা স্থানের দিকে ঠেলে দেওয়ার একটা পূর্বপ্রকল্প?

প্রশ্নগুলো আসছে কারণ, বর্তমান ডাকসু নেতৃত্ব দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্যাম্পাসকে নিরাপদ করে তোলার নামে নানা ধরনের বিতর্কিত ‘অভিযান’ পরিচালনা এবং ক্যাম্পাসকে এক ধরনের ‘বদ্ধ’ স্পেসে পরিণত করার চেষ্টা দৃশ্যমান হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বর থেকে শুরু করে নানা পরিসরে সন্ধ্যার পর নারীদের চলাফেরা নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। অভিযানের নামে সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের মুক্ত পরিসরে ঘুরতে যাওয়া সাধারণ মানুষকে হেনস্তা করা হয়েছে। জিমনেশিয়ামের মাঠে সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে খোদ ডাকসুরই আরেক নেতা হেমা চাকমার উদ্যোগে অভিনব বারবিকিউ পার্টির আয়োজন আমরা দেখেছি।
এই পরিসরে নারীর চলাফেরা ও উপস্থিতিকে নানা প্রক্রিয়ায় এমনভাবে অনিরাপদ করে তোলা হয়েছে বা এ বিষয়ে নাগরিক পরিসরে এমন ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এর প্রতিক্রিয়া এখন পাওয়া যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তরফে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০ কর্মকর্তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত প্রশিক্ষণে মনোনীত হয়েছেন, যার সবাই ছিলেন পুরুষ। সেখানে আবেদন করা সত্ত্বেও কোনো নারী কর্মকর্তা প্রশিক্ষণের সুযোগ না পাওয়ার কারণ হিসেবে প্রথমে বলা হয়েছিল–যেহেতু কোর্সটি সান্ধ্যকালীন এবং ক্লাস শেষ হবে রাত সাড়ে ৮টায়, তাই নিরাপত্তা বিবেচনায় নারীদের মনোনীত করা হয়নি। এ নিয়ে সমালোচনার পর অবশ্য আবেদনকারী নারীদের সংখ্যানুপাতে ৪ নারী কর্মকর্তাকে পুনঃমনোনয়ন দিয়ে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। তাও অবশ্য চার পুরুষ কর্মকর্তা জায়গাটি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়ার পরই মিলেছে এই সুযোগ। এবং এই সুযোগের জন্য এই যুগে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন হতে হয়েছে, সেই প্রতিবেদনকে শেয়ার করে বহু মানুষকে প্রশ্ন তুলতে হয়েছে, করতে হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা। তারপরই কেবল পুরুষশাসিত ব্যবস্থাটি নড়েছে। আর সে ব্যবস্থার ক্ষতটি ঢাকতে চার পুরুষ কর্মকর্তাকে কৃপা করে নিজের জায়গাটি ছাড়তে হয়েছে!
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে তো ঢের সমালোচনা হলো। কিন্তু রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠান যে কারণ দেখাল, তা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই বড় প্রশ্ন তোলে না? মজার বিষয় হলো–প্রশ্নটি উঠলেও তা কেউ সেভাবে সামনে আনল না। কেউ বলল না যে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাত সাড়ে ৮টার পর নারীদের জন্য কেন অনিরাপদ বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো একটি প্রতিষ্ঠান?
সে যাক। ফেরা যাক পর্দা প্রসঙ্গে। তা এই পর্দা কিন্তু শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়াতেই তোলা হয়নি। একই ধরনের পর্দার ব্যবস্থা আরও আগেই করা হয়েছে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গেল বছরে সেখানে ব্যবস্থাটি করেছে ছাত্রদল। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগের তির ছাত্রশিবিরের দিকে গেলেও এবং সেই তিরে ছাত্রদলকে বেশ ধার দিতে দেখা গেলেও, অন্য শিক্ষাঙ্গনটি নিয়ে কিন্তু তেমন কোনো আলোচনাই নেই।
অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু একটি প্রাঙ্গনে করা হচ্ছে না। অনেকগুলো ক্ষেত্রেই বিষয়গুলো ঘটে চলেছে। বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মানসুরা আলম নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, “আমার কোনভাবেই বুঝে আসলোনা যে একটা কো-এড প্রতিষ্ঠানের ক্যাফেটেরিয়ায় কেন ফিমেইল জোন থাকবে? আজকে এইটা নিয়ে না বললে কালকে দেখবো ক্লাসরুমের মাঝখানে ফিমেইল জোন, স্বপন মামার দোকানেও ফিমেইল জোন তুলছে।”
মুশকিল হলো–এই যে ঘটে চলা, এসব নিয়ে কারও কোনো হেলদোল নেই। নারী শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুললে তাদের আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা বাক্যবাণে হেনস্তার শিকার হতে হয়, যা অনেক সময়ই যৌন হেনস্তার পর্যায়ে পড়ে। ফলে অনেকে এ নিয়ে কথা বলেন না প্রকাশ্যে।
আর এই শেষোক্ত প্রবণতাটিই সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্কর। কারণ, এই হেনস্তা, সেটা শারীরিক, মানসিক, মৌখিক, বাস্তব জগৎ বা ভার্চুয়াল– যেখানেই হোক না কেন, একটু একটু করে দেয়াল বা সীমাটি দেখিয়ে দিতে শুরু করে। প্রথমে অদৃশ্য থেকে ক্রমে দৃশ্যমান হতে থাকে সেই সীমা বা দেয়াল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ায় সেই দেয়ালটিই কি এখন পর্দা হয়ে ঝুলছে? যার আড়ালে আপাতত আসন সংখ্যা সীমিত যদিও।
প্রবণতা বলছে, ঝুলন্ত সেই পর্দা ওঠার প্রেক্ষাপট তৈরিতে যেমন, তেমনি এর প্রভাবে পর্দার বাইরে থাকা অঞ্চলটি ক্রমেই আরও অনিরাপদ করে তোলার কৌশলটি চালু থাকবে। ফলে উম্মে সালমার কথায় ঠিক আস্থা রাখা মুশকিল। কারণ, কাউকে বাধ্য করা হচ্ছে না বা যার ইচ্ছা তিনি পর্দার ভেতরে বসবেন–কথাটি তখনই খাটে, যখন পর্দার বাইরের জগৎটি নিরাপদ করে তোলা হয়। এখন এই নিশ্চয়তা কি দেওয়া সম্ভব যে, পর্দার বাইরে থাকা নারী শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে মৌখিকসহ নানাভাবে হেনস্তা করা হবে না, যাতে তারা ওই পর্দার আড়ালে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন?
একটা কো–এড প্রতিষ্ঠানে ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থী একসঙ্গে পাঠ গ্রহণ করবে বলেই ভর্তি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাউকে বাড়ি বয়ে গিয়ে ডেকে এনে ভর্তি করায়নি। ফলে স্বেচ্ছায় এসে একটা তীব্র প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারপর তার শিক্ষা পরিসর, এর সংস্কৃতি ইত্যাদি বদলে দেওয়া আসলে উচ্চশিক্ষা স্তরটিকে বুঝতে না পারারই শামিল। ক্যাফেটেরিয়ায় ঝুলন্ত ওই ‘নিরীহ’ পর্দাটি তাই আর নিরীহ থাকে না কোনোমতেই। কারণ, এটি একটি সাংস্কৃতিক বদল এবং সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। সতর্কবার্তাটি যেন বলছে–পর্দার বাইরের জগৎটি তোমার জন্য নিরাপদ নয়। নিরাপদ থাকতে চাইলে পর্দার ভেতরে এসো। বাকিটা তোমার চয়েস।
এমন সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সূচনার পর এটা কি আর চয়েস থাকে? সোজা উত্তর–না। চয়েস থাকে না। বরং নারী শিক্ষার্থীদের এই পর্দা প্রতিনিয়ত জানান দেয়–তুমি অনাহুত। এই অনাহুত করে রাখাটা এমন এক রাজনীতি, যা এ যুগে কোনো শিক্ষাঙ্গনে কল্পনাতীত। সাদিক কায়েম ও এস এম ফরহাদের নেতৃত্বাধীন ডাকসু এই কল্পনাতীত রাজনীতিটাই করছে।
অথচ এই ডাকসুর ভিতে দাঁড়িয়ে আছে রোকেয়া, শামসুন্নাহারসহ বিভিন্ন ছাত্রী হল থেকে তালা ভেঙে বেরিয়ে আসা মেয়েদের প্রতিরোধ। মাত্র এক জুলাই আগেই, বেশি নয়। কিন্তু এই মেয়েদেরই এখন পিঠ দেখানো হচ্ছে। এটা এমনভাবে যে, শঙ্কামূলক প্রশ্ন উঠে যায়—পর্দা যখন উঠলই, সূর্যাস্ত আইন কত দূর? এভাবে চলতে থাকলে সম্ভবত আর বেশি দিন লাগবে না, যখন সন্ধ্যা নামার পরপরই চারদিকে বাঁশি ফুঁকে ছাত্রীদের হলে ফেরার তাগাদা দেওয়া হবে!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা