আমাদের দেশে মব আর নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং দিনকে দিন কিছুটা স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠছে যেন। কখনও বাড়ে, কখনও একটু কমে- কিন্তু মব বিদায় হচ্ছে না কোনোভাবেই। উল্টো যেন মব রপ্তানির দেশে পরিণত হচ্ছে আমাদের এই বাংলাদেশ!
কীভাবে? চলুন, আলোচনার ভেতরে ঢোকা যাক।
শুরুতেই বর্তমানে দেশের ভেতরে মব কি অবস্থায় আছে, তার সুলুক সন্ধান করে নেওয়া ভালো। চলতি বছরের জুলাইয়ের তুলনায় আগস্ট মাসে সারা দেশে মব উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংস্থাটি তাদের জুলাই-আগস্ট ২০২৬ সময়কালের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে জুলাইয়ের ৩১ জনের তুলনায় আগস্টে মব সহিংসতায় ৩৫ জন নিহত এবং আহতের সংখ্যা ৫৮ থেকে বেড়ে ৭৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
এখন যদি ২০২৬ সালের সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে হয়, তাহলে দেখা যাবে মব সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যু বাড়ছেই। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে ১৩৪ জন মানুষ মবের মারে মরে গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় মারা গেছে সবচেয়ে বেশি, ৫০ জন। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে মবের কারণে।
২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই দেশের শাসনভার নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এরপরই মবের মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মব এই দেশটায় আগেও ছিল। তবে ইন্টেরিমের সময় একপর্যায়ে সেই মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে এ-সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যানও সামনে আসে। জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পূর্ব সহিংসতার প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। তাতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি ১৫টি জাতীয় দৈনিক, দেড় শতাধিক স্থানীয় পত্রিকা এবং জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করে।
সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৭ মাসে দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় মাসওয়ারি মৃত্যুর গড় দেখা যাবে ১৬ এর কাছাকাছি। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রবণতাকে ওই সময় জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বলে মন্তব্য করেছিল এইচআরএসএস।
এরপর নতুন রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসে নির্বাচনের মাধ্যমে। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা শুনতে পাই যে, ‘মব কালচার’ আর থাকবে না, সহ্যও করা হবে না। কিন্তু সেই মব সহিংসতা যে বহাল তবিয়তে টিকে আছে, তা তো সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যাচ্ছে।
সমস্যা হলো, মব সহিংসতাকে মাঝে মাঝেই ক্ষমতা কাঠামো থেকে এক ধরনের ‘ক্লিন চিট’ দেওয়া হয়। এই প্রবণতাই মববাজদের কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ঘি, তেল ঢালে। কারণ পক্ষভেদে মব কখনো হয়ে যায় ‘প্রেশার গ্রুপ’, কখনো হয়ে যায় ‘সংশ্লিষ্টদের ক্ষোভ প্রকাশ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, নিজেদের পক্ষে গেলে ‘মব’ হয়ে যায় ‘গুড জব’। আর বিপক্ষে গেলেই ‘মব মব’ রব ওঠে। তাই শুধু অন্যায় আচরণ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য মেনে সব মবকে চিহ্নিত করা হয় না। ফলে মব আর কখনো থামে না।
এভাবে বছরের পর বছর নিজেদের দেশের মাটিতেই পক্ষ, আদর্শ নির্বিশেষে মবের বিচার করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আর তাতে এখন দেশের বাইরে, বিদেশের মাটিতেও বাংলাদেশিদের মব আমাদের দেখতে হচ্ছে। ইতালির ভেনিসে হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। স্থানীয় সময় গতকাল সোমবার রাতে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে তিনি স্থানীয় একটি পার্কে গেলে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বিস্তারিত জানান বাঁধন। পরে হামলা ও হেনস্তার কয়েকটি ভিডিও প্রকাশ করেন তিনি।
ভিডিওতে দেখা যায়, একদল মানুষ তার ওপর হামলা করছে এবং তাকে লক্ষ্য করে ডিম, পানি ও কোমল পানীয় ছুঁড়ে মারছে। ভিডিওতে আরও দেখা যায় যে, কয়েকজন বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলছে এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা এ হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বাঁধন।
শুধু বাঁধনের দেওয়া ভিডিও নয়। আরও বেশ কিছু এমন ভিডিওতে এখন সোশ্যাল মিডিয়া সয়লাব। সেসবে বেশ কিছু বাংলাদেশিকেই ওই হামলা, হেনস্তার ঘটনার ভিডিও করতে দেখা গেছে। সেসবই ছড়াচ্ছে। আর তা নিয়ে কোনো পক্ষ মবের পক্ষ নিয়েছে, আবার কোনো পক্ষ মবের বিপক্ষে প্রতিবাদ করছে। বিতর্ক চলছে। হ্যাঁ, এসব পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক পক্ষ অনেক। ভিন্ন ভিন্ন আদর্শ। তবে এদের অনেকের মধ্যেই একটা জায়গায় মিল আছে। সেটি হলো, সবাই নিজেদের বিপক্ষে হওয়া মবকেই মনে করেন সত্যিকারের মব। আমাদের দেশের কিছু কিছু মানুষের এ ধরনের ‘সিলেক্টিভ’ প্রতিবাদ আসলে সার্বিকভাবে চিরতরে মব বন্ধ করার কাজটিকে গতি পেতে দেয় না।
কিন্তু, আসল কথা হলো, অভিনেত্রী বাঁধনের ওপর ইতালিতে যে হামলা হয়েছে, হেনস্তা হয়েছে, তা একটি বিশুদ্ধ মব সহিংসতা। এখানে কোনো যদি, কিন্তুর অবকাশ নেই। বাঁধনের রাজনৈতিক আদর্শ বা ভাবনা এখানে পুরোপুরি একটা অপ্রাসঙ্গিক বিষয়। বাঁধন এখানে ভিকটিম এবং তার আদর্শের সাথে ওই অপরাধের ‘হালকা’ হয়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। ঠিক যেভাবে দেশের ভেতরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মব একজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল, যেভাবে মব করে শিক্ষকদের জোর করে চাকরি ছাড়ানো হয়েছিল, যেভাবে ‘সমকামী’ অভিযোগ তুলে মানুষ পেটানোর অভিযোগ মেলে, যেভাবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে মানুষকে পিটিয়ে বা পুড়িয়ে মেরে ফেলে মব, ঠিক সেভাবেই অভিনেত্রী বাঁধনের উপর হামলা চালিয়েছে মব। ঠিক এভাবেই আগে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদেরও বিদেশের মাটিতে হেনস্তা করার ঘটনা ঘটেছে। এই সবগুলোই মব সহিংসতার উদাহরণ। পার্থক্য হলো, সিংহভাগ ঘটনা দেশের ভেতরে ঘটলেও, কিছু কিছু ঘটছে বিদেশের মাটিতেও। এবারেরটা সাম্প্রতিকতম। যেন নিজেদের ‘মবনৈপুণ্য’ বিদেশিদের না দেখালে আর চলছিল না!
এভাবে ধারাবাহিকভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে পাশাপাশি সাজালে দেখা যায়, বাংলাদেশ দিন দিন একটি পরিকল্পিত ‘মব’-এর দেশে পরিণত হচ্ছে যেন। বাংলাদেশিরা যেন এই অপরাধে ক্রমশই দক্ষ হয়ে উঠছে। এ দেশের বাস্তবতা মানলে মবের সর্বস্বীকৃত সংজ্ঞা নির্ধারণ করা একটু কঠিনই। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে প্রকৃতিগতভাবে মব সাধারণত একটি বিশৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড। তবে বাংলাদেশে মব কেবলই অনিয়ন্ত্রিত রূপে থাকে না। এ দেশের মব প্রায় সময়ই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত ও উদ্দেশ্যমূলক হয়ে থাকে। এই উদ্দেশ্যমূলক বা পুরোপুরি ‘পরিকল্পিত মব’-এর বাজারই এখন রমরমা। আর এখন তো মনে হয়, মব ‘রপ্তানি’ করার পথেই এগোচ্ছে বাংলাদেশিরা!
মব রপ্তানি করার ইচ্ছা যদি নাই থাকত, তবে কে বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের মান-মর্যাদা ধুলায় মেশানোর মতো এমন কাজ করে? এতে কার সম্মান বাড়ল? বাংলাদেশের? এসব কাজ করে কেউ কি নিজেকে সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হিসেবে দাবি করতে পারে? সুস্থ মানসিকতার কেউ কি সমর্থন করবে এমন অপরাধের পক্ষাবলম্বন?
একটি বিষয় এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। সেটি হলো, কোনো অপরাধ কর্মের যৌক্তিকতা ও ন্যায্যতা উৎপাদনের মাধ্যমে কখনো কোনো অপরাধকে লঘু করা যায় না। এই দেশের ভেতরেও মবের যৌক্তিকতা ও ন্যায্যতা উৎপাদনের চেষ্টা বহুবার হয়েছে। এখন বিদেশের মাটিতে হওয়া বিশুদ্ধ দেশি মবের ক্ষেত্রেও একই কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু কোনোটাই আসলে সঠিক কাজ নয় এবং এই দেশের মানুষের মধ্য থেকে মববাজ মানসিকতা নির্মূলের পথে প্রধান অন্তরায়।
অথচ, তেমন আচরণই আমরা দিনের পর দিন দেখে যাচ্ছি। এখন শুধু ‘মবের দেশের মানুষ’ হিসেবে বাংলাদেশিদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিই বাকি। তাতে অবশ্য দুর্নাম কামানো ছাড়া আর কোনো প্রাপ্তি যে হবে না, সেটি নিশ্চিত!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা