বাংলাদেশের বাজারে মূল্যস্ফীতি আগের তুলনায় কিছুটা কমার ইঙ্গিত থাকলেও সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এবং ক্রয়ক্ষমতা।
জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর জুন-২০২৬ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বাজারে বর্তমানে কয়েকটি ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে- মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় মূল্যস্ফীতির উচ্চ হার, প্রধান খাদ্যপণ্যের দামে অস্থিরতা, সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতি, আমদানি নির্ভরতা, রপ্তানি আয়ে ধীরগতি এবং কিছু অঞ্চলে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় বৃদ্ধি।
ক্রয়ক্ষমতার ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- তাদের আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত গতিতে বাড়ছে।
জুন মাসে মুদ্রাস্ফীতি কমলেও টানা ৫৩ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে। ডব্লিউএফপি বলছে, এর ফলে বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এর প্রভাব খাদ্য ব্যয়েও দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে পুষ্টিকর খাদ্যের মাসিক গড় খরচ ২ হাজার ৮৬৮ টাকা, যা জাতীয় খাদ্য দারিদ্র্যসীমা ১ হাজার ৮৫১ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর অর্থ হলো দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাদ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শ্রমজীবী মানুষের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একজন পোশাক শ্রমিকের একদিনের আয় দিয়ে ৯ দশমিক ৭ কেজি চাল কেনা সম্ভব। অন্যদিকে একজন কৃষি শ্রমিক একই আয় দিয়ে ১২ কেজি মোটা চাল কিনতে পারেন।
চাল ও আলুর বাজার
সাধারণত ধান কাটার মৌসুমে চালের দাম কমে। তবে জুন মাসে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম হওয়া সত্ত্বেও জাতীয়ভাবে চালের দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে উৎপাদন ও কল-কারখানার খরচ বৃদ্ধি, বাজার কারসাজি (মার্কেট ম্যানিপুলেশন) এবং উচ্চ আমদানি ব্যয়কে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে আলুর বাজারেও বড় ধরনের মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সারা দেশে আলুর দাম গড়ে ২৬.৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলছে।
উৎপাদন ঘাটতির আশঙ্কা
বর্তমান বাজার পরিস্থিতির পাশাপাশি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে ডব্লিউএফপি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হতে পারে।
আউশ ধানের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা ৩.২২ মিলিয়ন মেট্রিক টন হলেও সম্ভাব্য উৎপাদন ২ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অন্যদিকে, আমন ধানের লক্ষ্যমাত্রা ১৮ দশমিক ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন নির্ধারণ হলেও সম্ভাব্য উৎপাদন ১৬ দশমিক ০৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। শুধু তাই নয়, গমের উৎপাদনও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আমদানির ওপর নির্ভরতা
ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তার বার্ষিক গমের চাহিদার ৮৫ শতাংশেরও বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। এ কারণে বিশ্ব বাজারে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রপ্তানি আয়
বাংলাদেশ মার্কেট মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত জুন মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে (মে মাসের তুলনায় ৯ শতাংশ বৃদ্ধি), যা দিয়ে ৫-৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এই সময়ে ডলারের বিনিময় হার ১২২ দশমিক ৭৬ টাকায় স্থিতিশীল ছিল।
আবার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। কিন্তু জুন মাসে রপ্তানি আয় কমেছে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের আয় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
আঞ্চলিক বৈষম্য
প্রতিবেদনটি ভাসান চর ও কক্সবাজার অঞ্চলের সরবরাহ ব্যবস্থার দিকেও আলোকপাত করেছে। ভাসান চরে চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন করতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবহন ব্যয়ের কারণেই সেখানে পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে।
এছাড়া, বর্ষা মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা আরো ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হলেও বাজারে কয়েকটি ঝুঁকি একই সঙ্গে বিদ্যমান। প্রতিবেদনে বিশেষভাবে চাল ও আলুর উচ্চমূল্য, সম্ভাব্য উৎপাদন ঘাটতি এবং মজুরি বৃদ্ধির তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।