সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের কেন্দ্রস্থলের কাছেই শান্ত ও মনোরম একটি দ্বীপ স্টোরা এসিঙ্গেন। সবুজ গাছপালা আর সুন্দর বাড়িঘরে ঘেরা এই এলাকায় বহু বছর ধরে মানুষ মূলধারার রক্ষণশীল দল মডারেট পার্টিকে ভোট দিয়ে আসছিল।
তবে ২০২২ সালে মডারেট পার্টি কট্টর ডানপন্থী ও অভিবাসীবিরোধী দল সুইডেন ডেমোক্র্যাটস (এসডি)-এর সঙ্গে সরকার গঠনের চুক্তি করার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। একসময় মূলধারার রাজনীতি থেকে দূরে রাখা দলটির সঙ্গে হাত মেলানোয় চরম অসন্তুষ্ট হন স্থানীয় ভোটারদের একাংশ।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অসন্তুষ্ট ভোটারদের অনেকেই এখন মধ্য-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস-এর দিকে ঝুঁকছেন। আগামী ১৩ সেপ্টেম্বরের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটির কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাদের মূল লক্ষ্য, পরবর্তী সরকারে যেন এসডি আর জায়গা না পায়।
স্টোরা এসিঙ্গেনের বাসিন্দাদের মতে, সুইডেন একটি উদার, গণতান্ত্রিক ও বিশ্বমুখী রাষ্ট্র। তাই আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে, দেশটিতে উদার রাজনৈতিক চর্চা বজায় থাকবে, নাকি অভিবাসীবিরোধী কট্টরপন্থী রাজনীতি নতুন করে গতি পাবে।
এসডির দাবি, তারা দলের চরমপন্থী সদস্যদের হয় শোধরাতে বাধ্য করেছে, নয়তো দল থেকে বের করে দিয়েছে। নিজেদের কট্টর রূপ ঢাকতে একসময় যে জ্বলন্ত মশাল তাদের প্রতীক ছিল, তার জায়গায় এখন স্থান পেয়েছে নীল-হলুদ রঙের ফুল।
দ্য ইকোনমিস্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের নির্বাচনে ব্যাপক অভিবাসনের কারণে তৈরি হওয়া জনক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বড় জয় পেয়েছিল এসডি। ফলে তারা পার্লামেন্টে ডানপন্থীদের সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং উলফ ক্রিস্টারসনের নেতৃত্বাধীন সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দেয়। তখন নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখলেও তারা মন্ত্রিসভায় কোনো পদ পায়নি।
তবে প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার জোট পুনরায় ক্ষমতায় এলে এবার সুইডেন ডেমোক্র্যাটসকেও মন্ত্রিসভায় রাখা হবে। তাই এবারের নির্বাচনই প্রমাণ করবে, অভিবাসন সমস্যা কমে যাওয়ার পরও এসডি তাদের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারে কি না।
কঠোর নীতির ফলে সুইডেনে অভিবাসীদের আগমন ব্যাপক হারে কমেছে। ২০১৬ সালে যেখানে নিট অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার, গত বছর তা নেমে এসেছে মাত্র ১২ হাজারে।২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় শরণার্থী সংকটের সময় ক্ষমতায় ছিল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস। পরিস্থিতি সামলাতে তখনই আশ্রয়ের নিয়ম কড়াকড়ি করা হয়।
সুইডিশ রিফিউজি ল সেন্টারের কর্মকর্তা লুইস ডেন জানান, শুরুতে নীতিগুলোর উদ্দেশ্য ছিল সুইডেনকে অভিবাসীদের কাছে কম আকর্ষণীয় করে তোলা, যাতে আগমন কমে। তবে এখন উলফ ক্রিস্টারসনের সরকারের লক্ষ্য কিছুটা ভিন্ন। বর্তমানে তাদের মূল নজর—ইতিমধ্যে সুইডেনে বসবাসকারী কিন্তু ঠিকমতো সমাজের সাথে খাপ খাওয়াতে পারেননি বা কর্মহীন অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো।
সরকারের দাবি, ইরাক ও সোমালিয়ার মতো দেশগুলো থেকে নতুন অভিবাসী আসার চেয়ে এখন বহু মানুষ সেসব দেশে ফিরে যাচ্ছেন। নিজ দেশে পুনর্বাসন (রিপ্যাট্রিয়েশন) নিশ্চিত করাই এখন এসডির অন্যতম রাজনৈতিক কৌশল। দলটির অভিবাসনবিষয়ক মুখপাত্র লুডভিগ আসপলিং সরাসরিই বলেন, ‘‘আমরা চাই অকার্যকর অভিবাসীরা সুইডেন ছেড়ে চলে যাক। দেশের অর্থনীতি বা সমাজে অবদান না রাখলে তাদের থাকার কোনো ভিত্তি নেই।’’
সুইডেন ডেমোক্র্যাট পার্টি নেতা জিমি একেসন। ছবি: রয়টার্স
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার শর্তে শরণার্থীদের সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজার সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন ডলার) পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এটি যুক্তরাজ্যের একই ধরনের সহায়তার চেয়ে প্রায় নয় গুণ বেশি। তবে বছরে মাত্র ৬০০ জন ব্যক্তি এই সুবিধা নিতে পারেন।
এসডি চায়, অভিবাসীদের সামাজিক ভাতা আরও কমিয়ে দেওয়া হোক, যাতে তারা বাধ্য হয়ে এই সুবিধায় নিজ দেশে ফিরে যায়। এমনকি যারা ইতোমধ্যে সুইডেনের নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদেরও যেন এই সুযোগে ফেরত পাঠানো যায়—এমন প্রস্তাবও রয়েছে দলটির।
পাশাপাশি, অভিবাসী ফেরত পাঠাতে সরকার বেশ কিছু কঠোর আইনি পদক্ষেপে হেঁটেছে। সম্প্রতি পাস হওয়া ‘ভালো আচরণ’ আইনের আওতায় বকেয়া ঋণ পরিশোধ না করার মতো সাধারণ কারণেও বহিষ্কারের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়াও, পরিবার পুনর্মিলনের নিয়ম কঠিন করা হয়েছে এবং নতুন শরণার্থীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এমনকি এসডির চূড়ান্ত দাবি—পূর্বে দেওয়া স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বাতিল করে সেগুলোকে অস্থায়ী করা হোক। যদিও অনেক ভোটার এসব কড়া নীতি পছন্দ করছেন, তবুও এসডির জনপ্রিয়তার গ্রাফ ২০ শতাংশের আসপাশেই স্থির হয়ে আছে। এর মূল কারণ, অভিবাসন এখন আর সুইডিশ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় নয়।
গথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের 'এসওএম ইনস্টিটিউট'-এর জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যেখানে ৫৪ শতাংশ নাগরিক অভিবাসনকে দেশের প্রধান সমস্যা ভাবতেন, গত বছর তা কমে মাত্র ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এই পরিবর্তন ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস’-কে সুবিধা দিতে পারে, যদিও অভিবাসন ইস্যুতে তারাও কঠোর এমন বিশ্বাস তৈরিতে তারা বেগ পাচ্ছে। অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের মধ্যেও তৈরি হয়েছে অস্বস্তি।
সম্প্রতি জনরোষের মুখে সরকার একটি নিয়ম শিথিল করতে বাধ্য হয়, যার কারণে সুইডেনে বেড়ে ওঠা কিছু কিশোরকে দেশ ছাড়তে হচ্ছিল। তাছাড়া, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো সতর্ক করে বলছে, এমন কড়াকড়ির কারণে দেশে বিদেশি দক্ষ কর্মীর আকাল তৈরি হচ্ছে। ক্রিস্টারসনের জোটে থাকা লিবারেল পার্টিও এসডির 'স্থায়ী বাসস্থান বাতিলের' ক্ষমতার প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, যখন সংকট বড় ছিল, তখন এসডির চরমপন্থী অনেক মন্তব্য সাধারণ ভোটাররা এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু বর্তমান শান্ত পরিস্থিতিতে তা ঢাকা কঠিন। যেমন, গত ৫ জুলাই এসডির জ্যেষ্ঠ নেতা রিচার্ড জোমসহফ মন্তব্য করেন, ‘‘ইসলামকে ঘৃণা করা যেমন অস্বাভাবিক নয়, জাতীয় সমাজতন্ত্রকে (নাৎসিবাদ) ঘৃণা করাও তেমনই স্বাভাবিক।’’ এ ধরনের বক্তব্য উগ্রবাদ উসকে দেয় বলে সমালোচনা হলেও এসডি তা অস্বীকার করেছে।
ইউরোপজুড়ে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এখন একই চ্যালেঞ্জের মুখে—অভিবাসন সংকট সামলে যাওয়ার পর তারা কীভাবে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখবে? সুইডেনের এই নির্বাচন থেকে তাই পুরো বিশ্বই হয়তো উত্তর খুঁজবে, নতুন অভিবাসী ঠেকানোর পুরোনো রাজনীতি যেখানে ব্যর্থ, সেখানে ‘বসবাসকারীদের ফেরত পাঠানোর’ নতুন রাজনৈতিক কৌশল এসডি-কে আদৌ নির্বাচনে টেনে তুলতে পারে কি না।