আগামী নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই দীর্ঘদিনের সংঘাতের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্রকে এক নতুন চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে তেহরান। ট্রাম্প বলেছিলেন, চুক্তি পিছিয়ে দিতে ইরান ইচ্ছা করে মার্কিন নির্বাচনের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করছে।
রুশ গণমাধ্যম আরটির প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া এক ভাষণে ট্রাম্প অভিযোগ করেন, আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কেমন ফলাফল করে তা দেখার জন্যই ইরান আলোচনা বিলম্বিত করছে। তিনি আরও দাবি করেন, নির্বাচনের ঠিক পরপরই তেহরান একটি চুক্তিতে আসবে। সেই সঙ্গে হুমকি দেন যে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া বা ধ্বংস করা হবে।
অন্যদিকে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, তারা বিষয়টিকে মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে যেতে চান না। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকে আমেরিকানরা যেন এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ফিরে আসে, তেহরান ঠিক এমনটাই প্রত্যাশা করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বক্তব্য দেন। ছবি: রয়টার্স
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান বলেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু সমস্যা হলো আমেরিকা আলোচনার পথে না হেঁটে প্রথমে বোমাবর্ষণ করে এবং সমস্ত পথ বন্ধ করে দিয়ে লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ইরান নিজেদের রক্ষায় দৃঢ়তার সঙ্গে রুখে দাঁড়াবে। তারা কখনোই যুদ্ধ চায়নি, তাই এটি থামানো বা না থামানোর মূল সিদ্ধান্তটি এখন আমেরিকার ওপরই নির্ভর করছে।
আরটির ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন যে তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্কে আয়োজিত বৈঠকের সময় একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। এই প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তু হলো, আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি প্রায় এক সপ্তাহের মধ্যে পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা যেতে পারে এবং এর পাশাপাশি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনাও দ্রুততম সময়ে শুরু করা সম্ভব। এই পরিকল্পনার অধীনে তেহরান এই তেল পরিবহন পথটি স্বাভাবিক করে দেবে।
তবে এর বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে তাদের আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে, ইরানি তেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করতে হবে এবং আটকে থাকা কিছু ইরানি সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে। এর পাশাপাশি ইরান অন্যান্য ফ্রন্টেও সংঘাতের অবসান চেয়েছে, যার মধ্যে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে ইরানি, আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, মার্কিন ও ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা বর্তমানে একটি ধাপভিত্তিক ব্যবস্থা বা কৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন, যেখানে প্রথমে অবরোধ ও হরমুজ প্রণালির বিধিনিষেধ সংক্রান্ত জটিলতাগুলোর সমাধান করা হবে। তবে এর মধ্যেও তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার দাবি করা থেকে পিছু হটেনি। ইরানি কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলে আসছেন যে, এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কেবল ইরান এবং ওমানের মাধ্যেমেই পরিচালিত হওয়া উচিত এবং এর মধ্য দিয়ে অতিক্রমকারী সব জাহাজ থেকে সেবামূল্য বা নির্দিষ্ট ফি নেওয়া উচিত।
প্রকাশিত তথ্যানুসারে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি জানিয়েছেন যে তাদের প্রস্তাবিত এই নতুন খসড়াটি নতুন কোনো শর্ত আরোপ না করে মূলত গত জুনের সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা মার্কিন তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তরের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
একই সঙ্গে নিউইয়র্কে অবস্থানকালে আরাঘচি রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভসহ একাধিক আন্তর্জাতিক পরাশক্তির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একের পর এক কূটনৈতিক বৈঠক করেছেন।
এই বৈঠকের পর মস্কো প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অন্যায় এবং অবৈধ পদক্ষেপের কারণে সৃষ্টি হওয়া এই চরম সংকট নিরসনে একটি কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান বা রাজনৈতিক আলোচনা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। পুরো ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটছে যখন উভয় দেশের ওপরই আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক চাপ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
একদিকে মার্কিন কঠোর অবরোধের ফলে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে সংকুচিত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের ফলে বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তি ও জ্বালানি করিডর কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক বাজারে, যেখানে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়েছে।
জাতিসংঘের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বক্তব্য দিয়েছেন, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চলাকালে তিনি প্রথম কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান যিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য রাখলেন।
বুধবার পূর্ণাঙ্গ সভায় বক্তব্যে তিনি বলেন, তেহরান সবসময়ই অর্থবহ আলোচনা ও শান্তিপূর্ণ কূটনীতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তবে শক্তির ভয় দেখিয়ে বা হুমকির মুখে তারা কখনোই কোনো আলোচনা করবে না এবং বিশ্বের সামনে কোনো অবস্থাতেই নিজেদের মাথা নত করবে না।