কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা শিক্ষক অধ্যাপক জেফ্রি ডি স্যাকশ মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের সদস্যদের কাছে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করার দাবি জানিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন।
এশিয়া টাইমস এই চিঠির শিরোনাম করেছে “স্টপ ম্যাড ডোনাল্ডস ইরান ওয়ার: ওপেন লেটার টু দ্য ইউএস কংগ্রেস”। চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক সংকট, সংবিধান লঙ্ঘন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের একক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইরান যুদ্ধ পরিচালনার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের উদ্দেশ্যে লেখা খোলা চিঠিতে অধ্যাপক স্যাকশ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘পাগল রাজা’ বা ‘ম্যাড কিং’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার অনিয়ন্ত্রিত ও স্বৈরাচারী আচরণ বন্ধ করতে কংগ্রেসকে নিজেদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেছেন যে, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশ্যে ট্রাম্প যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অনভিপ্রেত। ট্রাম্প সেখানে দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি করবেন নাকি দেশটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে ‘জাহান্নামে পাঠাবেন’, সেই বড় সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পূর্ণ অধিকার কেবল তার নিজের। আন্তর্জাতিক সংস্থায় দেওয়া এই বক্তব্যে ট্রাম্প আমেরিকার সাধারণ জনগণের মতামতকে সম্পূর্ণভাবে তোয়াক্কা না করার কথা স্পষ্ট করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে কী ফলাফল আসবে তা নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথা নেই এবং নির্বাচন তার পদক্ষেপকে চালিত করবে না। অধ্যাপক স্যাকশের মতে, ট্রাম্প আইন, সংবিধান, জাতিসংঘ সনদ কিংবা দেশ-বিদেশের জনমত—কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেন না। ট্রাম্পের বছরের শুরুতেই দেওয়া এক মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে তার ক্ষমতার কোনো সীমা নেই এবং কেবল তার নিজের নীতিবোধ ও নিজস্ব ভাবনাই তাকে থামাতে পারে।
এই চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর কথা ট্রাম্পের মুখে শোনার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। কারণ অধ্যাপক স্যাকশ মনে করেন যে, আমেরিকার ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসক রাজা তৃতীয় জর্জের যে একনায়কতন্ত্র ছিল, ট্রাম্পের বর্তমান স্বৈরাচারী শাসন তাকেও ছাপিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জনকরা রাজা তৃতীয় জর্জের বিরুদ্ধে মূল যে অভিযোগগুলো এনেছিলেন, তার মধ্যে একটি ছিল বেসামরিক ক্ষমতার ওপর সামরিক ক্ষমতাকে চাপিয়ে দেওয়া ও সার্বভৌম করে তোলা। অথচ ট্রাম্প একাই একটি আস্ত সভ্যতার ভাগ্য ও স্থায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কংগ্রেসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর মতো দুঃসাহস পাচ্ছেন প্রধানত রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের নতজানু ও দায়িত্বহীন ভূমিকার কারণে। রিপাবলিকান সদস্যরা নিজ দেশের প্রেসিডেন্টকে ভয় পাচ্ছেন এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থ ত্যাগ করে ইসরায়েলপন্থী লবিং গ্রুপ এআইপিএসি' ও সামরিক-শিল্প গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের নির্বাচনী চাঁদা গ্রহণ করছেন।
চিঠিতে মার্কিন সংবিধানের সুস্পষ্ট ধারা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১, ধারা ৮ অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসকেই যুদ্ধ ঘোষণার একক ও চূড়ান্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, এটি কোনো রূপক বা ঐচ্ছিক বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রচয়িতারা খুব ভেবেচিন্তেই এই বিধান রেখেছিলেন, যেন কোনো একচ্ছত্র রাজা বা একক ব্যক্তির ইচ্ছায় রাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা না যায়। চিঠিতে আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের ফেডারালিস্ট ৬৯-এর উদ্ধৃতি দিয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা কখনোই ব্রিটিশ রাজার মতো হবে না। একইভাবে ১৭৯৮ সালে থমাস জেফারসনকে লেখা জেআইএমএস ম্যাডিসনের একটি চিঠির উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছিল যে নির্বাহী বিভাগই যুদ্ধের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট ও সংবেদনশীল হয়, তাই যুদ্ধ ঘোষণার চরম দায়িত্ব আইনসভার হাতেই ন্যস্ত থাকা উচিত। কিন্তু অধ্যাপক স্যাকশ ক্ষোভের সাথে তুলে ধরেছেন যে, প্রতিষ্ঠাতা পিতাদের তৈরি এই সতর্ক নকশা আজ ধ্বংস হয়ে গেছে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যদের অসংবিধানিক আনুগত্য এবং সামরিক-শিল্প-ডিজিটাল কাঠামোর কাছে মার্কিন রাজনীতির আত্মসমর্পণের কারণে। তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, কেবল ট্রাম্পের সময়ই নয়, ডেমোক্র্যাটিক প্রেসিডেন্টদের শাসনামলেও এই দলের আইনপ্রণেতারা অন্য দেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার সময় নীরব ভূমিকা পালন করেছিলেন।
অধ্যাপক স্যাকশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধকে ট্রাম্পের এক চরম বোকামি এবং এটি থামাতে না পারাকে কংগ্রেসের জন্য এক ঐতিহাসিক লজ্জা বলে বর্ণনা করেছেন। কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছাড়া শুরু হওয়া এই যুদ্ধ ইরানে ব্যাপক মানবিক ট্র্যাজেডি ও গণদুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে। একই সাথে মার্কিন সরকারের কোটি কোটি ডলারের সরাসরি অপচয় ঘটেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অভাবনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এই যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী ও মার্কিন অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। তাছাড়া, আমেরিকান আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত ত্যাগ স্বীকার করে হলেও ইরান যেভাবে টিকে রয়েছে, তা বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
চিঠিতে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশে লেখক মার্কিন বাহিনীর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থার মারাত্মক ব্যর্থতা ও ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরেছেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে, যার ফলে দেড় শতাধিক মানুষ নিহত হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী খুদে শিক্ষার্থী। সামরিক বাহিনীর নিজস্ব তদন্তে উঠে এসেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই এই মর্মান্তিক ভুল টার্গেটিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।
এত বড় একটি মানবীয় বিপর্যয়ের পর ট্রাম্প দায় এড়িয়ে গিয়ে ‘ইরান বা অন্য কেউ এটি করেছে’ বলে মন্তব্য করেন এবং ঘটনার সাত মাস অতিক্রম হলেও ট্রাম্প প্রশাসন কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে কোনো ক্ষমা চায়নি বা কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের পোডিয়াম থেকে ট্রাম্প যেভাবে একটি সদস্য রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, তা গোটা বিশ্বের কাছে আমেরিকাকে লজ্জিত করেছে এবং এটি জাতিসংঘ সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪)-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ বা হুমকির সৃষ্টি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সারা বিশ্ব আজ আমেরিকার এই বেপরোয়া ও আগ্রাসী আচরণে হতবাক ও স্তম্ভিত। অধ্যাপক স্যাকশ কংগ্রেস সদস্যদের সরাসরি সম্বোধন করে বলেছেন যে, ট্রাম্পের এই চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড দেখে নীরব থেকে মাথা নাড়ানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং কংগ্রেসের নিজের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার এখনই উপযুক্ত সময়। রিপাবলিকান পার্টিকে কিছুটা হলেও সাহস সঞ্চয় করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে যে, ইরানের মতো একটি দেশকে ধ্বংস করার একক ক্ষমতা তার নেই এবং যেকোনো যুদ্ধের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন, যা সাধারণ জনগণ বা তারা কেউই সমর্থন করছেন না। ইতোমধ্যে জনমত জরিপগুলোতে দেখা গেছে যে আমেরিকানদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই যুদ্ধের তীব্র বিরোধী এবং দিনে দিনে এর হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি তিনজন রিপাবলিকান সদস্য নিজেদের দলীয় বলয় থেকে বেরিয়ে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যা একটি আশাব্যঞ্জক দিক।
চিঠিতে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে যে, কংগ্রেসের বহু সদস্য অস্ত্র প্রস্তুতকারক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দ্বারা প্রভাবিত ‘এআইপিএসি’-র মতো যুদ্ধবাজ গ্রুপের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ বা রাজনৈতিক সহায়তা গ্রহণ করেন। এই স্বার্থের সংঘাত ও অর্থ গ্রহণের সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন, কারণ এটি সংবিধানের শপথের সাথে সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা। তবে লেখক আশা দেখিয়েছেন যে, কংগ্রেসের হাতে একটি বড় অস্ত্র রয়েছে, যা হলো জাতীয় অর্থনীতির ‘পাওয়ার অব দ্য পার্স’ বা অর্থ বরাদ্দের রাজকীয় ক্ষমতা। ৩০ সেপ্টেম্বর বর্তমান অর্থবছর শেষ হতে যাচ্ছে এবং পেন্টাগনের জন্য নতুন অর্থায়নের প্রতিটি বিলই কংগ্রেসের কাছে ট্রাম্পের এই অননুমোদিত সামরিক অভিযান ও আগ্রাসনে অর্থ বরাদ্দ নিষিদ্ধ করার সুবর্ণ সুযোগ।
আমেরিকার সামনে সঠিক ও সহজ পথ একটাই তা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে: কংগ্রেসকে অবিলম্বে যুদ্ধের যাবতীয় অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করতে হবে, মার্কিন বাহিনীকে আক্রমণ স্থগিত করে দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দিতে হবে। এই যুদ্ধ থামাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো পক্ষ বা আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রয়োজন নেই, কারণ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজ উদ্যোগে এই অন্যায় যুদ্ধ শুরু করেছিল, তাই নিজেদের একক সিদ্ধান্তেই তা বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধ বন্ধ করা গেলে বিশ্ব শক্তি ও জ্বালানি বাজার, খাদ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচে তাৎক্ষণিক স্বস্তি ও ভারসাম্য ফিরে আসবে।
চিঠির শেষের দিকে অধ্যাপক স্যাকশ অতীতের এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাথে বর্তমানের তুলনা করে আমেরিকার রাজনৈতিক পতনের চিত্র তুলে ধরেছেন। ১৯৬৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের একই পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে পারমাণবিক পরীক্ষা সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন শেষে আর্কিমিডিসের বিখ্যাত উক্তি স্মরণ করে বলেছিলেন, ‘আমাকে দাঁড়ানোর একটি জায়গা দাও, আমি বিশ্বকে নাড়িয়ে দেব।’ কেনেডি বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন জাতিসংঘের সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে সবাই মিলে বিশ্বকে একটি ন্যায়সঙ্গত ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দিকে চালিত করতে পারে। সেই গৌরবময় অতীতের তুলনা টেনে জেফ্রি ডি স্যাকশ বর্তমান কংগ্রেস সদস্যদের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন যে, দেশের সম্মান রক্ষা করতে, সংবিধান রক্ষা করতে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অসংবিধানিক ও ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার ক্ষুধা থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে কংগ্রেসকে অবশ্যই পিছপা না হয়ে নিজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং অনতিবিলম্বে এই অহেতুক ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।