রাজধানী ঢাকায় একটি বাসায় গৃহস্থালির কাজ করেন আসমা বেগম। দুই সন্তানের মা আসমা এক বাসায় কাজ করে মাসে বেতন পান প্রায় ৫ হাজার টাকা। আরও কয়েকটি বাসায় কাজ করে তিনি একটু বেশি টাকা আয় করতে চান। কিন্তু তা হচ্ছে না, কারণ গৃহস্থালির কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে।
অবাক করার বিষয় হলো আসমার কাজ না পাওয়ার জন্য দায়ী ইরানে চলমান যুদ্ধ। তার মতো ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের সাধারণ মানুষের জীবনেও ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলেছে ইরান যুদ্ধ।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথভাবে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা জবাব দিতে শুরু করে ইরানও। শুরু হয় যুদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান এই যুদ্ধের প্রভাব উপসাগরীয় দেশ ছাড়িয়ে এশিয়ার বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, যার সবচেয়ে বড় চাপ সামলাতে হচ্ছে নিম্নআয়ের মানুষকে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে বলেছে, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও নেপাল— এই চার দেশে অন্তত ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশের বাস এই অঞ্চলে। ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানির জন্য অনেকটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর বড় একটি অংশ আসত উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে।
তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালির ওপর দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নির্ভরতা এক রকম ছিল না। এখন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও বিস্তৃত হওয়ায় এবং একের পর এক জ্বালানি সরবরাহের পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সব দেশই এর প্রভাব অনুভব করছে।
দক্ষিণ এশিয়ার উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর নির্ভরতা
বাংলাদেশ: বাংলাদেশে নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হয়। তবে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের চাহিদা মেটাতে দিন দিন আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বেশি নির্ভর করছে।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী কাতার। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেলও আমদানি করে।
ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানির জন্য অনেকটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
ভারত: ভারত তার মোট ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। অপরিশোধিত তেল আমদানির দিক থেকে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ।
যুদ্ধ শুরুর আগে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো ছিল ভারতের অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী। আর এলএনজির অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী ছিল কাতার।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় ভারতের জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বেশি বৈচিত্র্য রয়েছে। রাশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকেও ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
পাকিস্তান: পাকিস্তানও আমদানি করা জ্বালানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও এলএনজির জন্য দেশটি আমদানির ওপর নির্ভর করে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত আগে থেকেই পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী। আর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজির প্রধান সরবরাহকারী হলো কাতার।
নেপাল: নেপাল সরাসরি উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল বা এলএনজি আমদানি করে না। স্থলবেষ্টিত দেশটি প্রায় সব ধরনের জ্বালানি পণ্য (পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন ও এলপিজি) ভারতের কাছ থেকে নেয়।
সেজন্য উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সমস্যা হলে নেপাল পরোক্ষভাবে এর প্রভাবের মুখে পড়ে। ভারতের জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি বা খরচ বেড়ে গেলে তার প্রভাব নেপালের জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপরও পড়তে পারে।
আল জাজিরা বলছে, পরিমাণের হিসাবে ভারতই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানির ক্ষেত্রে বিকল্প সরবরাহের সুযোগ কম। নেপালের ক্ষেত্রে নির্ভরতা কিছুটা পরোক্ষ। তবে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলে দ্রুতই এর প্রভাব নেপালের বাজারে পড়তে পারে।
আর এ ধরনের সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ সাধারণত দরিদ্র ও আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের ওপরই পড়ে।
এশিয়ানদের আর্থিক অসহায়ত্ব
পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর করাচির বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী সাজিদা জিবরান। তিনি একটি অভিজাত এলাকায় দীর্ঘ সময় গৃহস্থালীর কাজ করেন। তার স্বামী শারীরিক সমস্যার কারণে এখন আর কাজ করতে পারেন না। তাদের তিন সন্তান মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা করছে।
পাকিস্তানের করাচির বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী সাজিদা জিবরান। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
সাজিদা জানান, গত বছরের শেষ দিকে তার বাড়িভাড়া ছিল ১৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি। গত মাসে তা বেড়ে ২৫ হাজার রুপি হয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “যুদ্ধ শুরুর আগে সবাই খেতে পারত, ভালোভাবে চলতে পারত। আমি মাংস ও মুরগি কিনতে পারতাম। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সবজির দামও এত বেড়ে গেছে যে, সেগুলো কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
বিদ্যুতের দাম অনেক বেড়ে গেছে জানিয়ে সাজিদা জানান, আগে তাদের বিদ্যুৎ বিল প্রায় দেড় হাজার রুপি আসত। এখন বিল শুরুই হয় ৫ হাজার রুপি থেকে। গ্যাসের বিলও অনেক বেশি, সর্বনিম্ন ২ হাজার রুপি।
পাকিস্তানে আগে স্থানীয়ভাবে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হতো বলে গ্যাসের বিল তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু দেশটির গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় এখন পাকিস্তানকে বড় পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে হয়।
সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে শেষ পর্যন্ত তাদের স্কুলের বেতন দেওয়া বন্ধ করতে হয়েছে সাজিদাকে। কারণ স্কুলে পাঠালে আর খাবার জোটে না। সাজিদা বলেন, “আমি সব সময় চেয়েছি, আমার সন্তানরা পড়াশোনা করুক, ভালো শিক্ষা পাক। কিন্তু এখন খাবার জোগাড় করতেই আমার কষ্ট হয়। এর বাইরে সন্তানদের জন্য আর তেমন কিছু করার সামর্থ্য আমার নেই।”
“আমার সন্তানদের যখন ঘরে বসে থাকতে দেখি, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে না, তখন আর ঘুমাতে পারি না। আর্থিকভাবে আমি পুরোপুরি অসহায় বোধ করি।”
‘দাম বাড়ায় সবকিছুই নাগালের বাইরে’
বালেন্দ্র সিং, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ৬৭ বছর বয়সী বালেন্দ্র নয়াদিল্লির পাশের শহর নয়ডায় ছয় সদস্যের পরিবারের সঙ্গে একটি ছোট ঘরে থাকেন।
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর শহরে জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ায় তার পরিবারের কয়েকজনকে গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে হয়েছে।
বালেন্দ্র সিং ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
বালেন্দ্র সিং বলেন, “এখন বড় শহরে এত মানুষের খাবারের খরচ চালানো আমার পক্ষে সম্ভব না। জিনিসপত্রের দামবৃদ্ধি আমাদের খুব চাপে ফেলেছে। সবকিছুর দাম বাড়ছে, ফলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমাদের বেতন একই রয়ে গেছে।”
বালেন্দ্রর নিজের কোনো যানবাহন নেই। তাই কাজে যেতে রিকশা ব্যবহার করতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়ায় রিকশাভাড়াও বেড়েছে, যার বাড়তি খরচও তাকে বহন করতে হচ্ছে।
জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তিনি ও নয়ডায় থাকা তার পরিবারের সদস্যরা কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন, সে বিষয়ে বলেন, “আমরা সপ্তাহে তিনবার মাছ খাওয়ার বদলে হয়তো একবার খাব। তরকারিতেও কম পেঁয়াজ দেব।”
যুদ্ধের শুরুতে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে বালেন্দ্র ও তার প্রতিবেশীরা পুরোনো কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। তিনি জানেন, কাঠের ধোঁয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু তাদের আর কোনো উপায় ছিল না।
বালেন্দ্র আল জাজিরাকে বলেন, “আমার সন্তানরা ইরানে হামলা করেনি। আমার সন্তানরা এই যুদ্ধকে সমর্থনও করে না। কিন্তু দূরের দেশের রাজনীতির বোঝা আমাদের বহন করতে হচ্ছে। বাড়তে থাকা দাম থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
কাজ পাচ্ছে না নিম্নআয়ের মানুষরা
আসমা বেগমের জীবনের চ্যালেঞ্জ প্রতিবেদনের শুরুতেই রয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “ধনী মানুষরাও এখন আর্থিক চাপে আছেন। তারা গৃহপরিচারিকা না রেখে নিজেরাই ঘরের কাজ করার চেষ্টা করছেন।”
আসমার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার চাপ কীভাবে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
আসমার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, জীবনযাত্রার খরচ বাড়ার চাপ কীভাবে এক পরিবার থেকে আরেক পরিবারে ছড়িয়ে পড়ছে। বেশি খরচের কারণে অনেক পরিবার গৃহপরিচারিকার মতো প্রয়োজনের বাইরের খাতে খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। এতে আসমার মতো কম আয়ের মানুষের কাজের সুযোগও কমে যাচ্ছে।
আসমা বলেন, শুধু তার নিজের পরিবারই নয়, তার বাবার বাড়ির লোকজনও একই ধরনের আর্থিক চাপে আছে। তার বাবা-মা বরিশালে থাকেন। আসমার বাবা ও ভাই একই এলাকায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। মা ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও একটি মেসে রান্নার কাজ করেন।
বেড়েছে সব নিত্যপণ্যের দাম
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর গৌশালা এলাকায় মালামাল বহনের কাজ করেন ৫৮ বছর বয়সী জ্ঞানু বাসন্ত। তার ১৫ বছর বয়সী একটি সন্তান আছে। এ ছাড়া তার বৃদ্ধ বাবা ও ভাইবোনদেরও দেখাশোনা করতে হয়।
বাসন্ত কখনো স্কুলে পড়াশোনা করেননি। কাজের সন্ধানে তাকে কাঠমান্ডুতে আসতে হয়েছে। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “আগে আমরা কৃষিকাজ করতাম। কিন্তু বানরের কারণে এখন আর চাষাবাদ করা যায় না। এ ছাড়া গ্রামের একটি স্থানীয় সমবায় প্রতিষ্ঠান আমার বাবার সারা জীবনের জমানো টাকা আত্মসাৎ করেছে।”
বাসন্ত এখন মূলত মালামাল বহনের কাজ করেন। ইদানীং বেশির ভাগ সময় এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার বহন করেন। তবে তার নিয়মিত কাজ নেই।
বাসন্ত বলেন, “প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা আয় করি। তবে প্রতিদিন একই রকম আয় হয় না। কাজ কম থাকলে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি আয় করতে পারি না।”
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর গৌশালা এলাকায় মালামাল বহনের কাজ করেন ৫৮ বছর বয়সী জ্ঞানু বাসন্ত। ছবি: আল জাজিরার সৌজন্যে
গত কয়েক মাসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় তিনি নিজে রান্না না করে কম খরচের খাবারের দোকানে খাওয়া-দাওয়া করেন।
বাসন্ত বলেন, “পরিবারের জন্য খুব বেশি টাকা পাঠাতে পারি না। ভাগ্য ভালো যে, একটি বেসরকারি দাতব্য সংস্থা আমার মেয়ের পড়াশোনার খরচ দিচ্ছে। আমার বাবা বয়স্ক ভাতা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে চলেন।”
আর যা কিছু সঞ্চয় করতে পারেন, তা দিয়ে মেয়ের জন্য কাপড় ও উপহার কিনেন বাসন্ত এবং যতটা পারেন পরিবারকে সাহায্য করেন।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। হরমুজ প্রণালির সংকট ও জ্বালানি সরবরাহে বাধার প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের ঘরেও। আসমা, সাজিদা, বালেন্দ্র বা বাসন্ত— তাদের জীবন যেন দেখিয়ে দিচ্ছে, যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর নয়, এর বোঝা বহন করতে হচ্ছে হাজার মাইল দূরের সাধারণ মানুষকেও।