ইরানি এয়ারলাইনগুলো আজ বুধবার থেকে আন্তর্জাতিক রুটে নিজেদের ফ্লাইট পরিচালনা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানি এয়ারলাইনগুলোকে সহায়তা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার হুমকি দিয়েছেন তিনি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্কট বেসেন্ট বলেন, “২৩ সেপ্টেম্বর সব ইরানি এয়ারলাইনসের কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে বন্ধ হয়ে যাবে।”
এ সতর্কবার্তা শুধু ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য নয়, বিদেশে কার্যক্রম চালাতে এসব এয়ারলাইন যেসব বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী, টিকিট বিক্রি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে, তাদের লক্ষ্য করেও দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই বিশ্বজুড়ে ইরানি বিমান চলাচল বন্ধ করতে পারবে? আর এই নিষেধাজ্ঞার প্রভাবই বা কতটা পড়বে সাধারণ যাত্রীদের ওপর?
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর বর্তমান অবস্থা
আল জাজিরা জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল খাত আগে থেকেই সংকটে রয়েছে। পুরনো উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশের সংকট ও আন্তর্জাতিক সেবা পাওয়ার সীমাবদ্ধতায় দেশটির বিমান সংস্থাগুলো ইতোমধ্যেই পিছিয়ে পড়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, ইরান সরকার এসব সংস্থা ব্যবহার করে অস্ত্র, জনবল ও অবৈধ পণ্য পরিবহন করে।
ইরানের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে মাহান এয়ার, রাষ্ট্রীয় ইরান এয়ার ও কেশম এয়ার।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে গত সপ্তাহের শেষ দিকে ইস্তান্বুল, আঙ্কারা ও মাস্কাটের সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিত করেছে মাহান এয়ার। এর আগে ইরানের বিমান চলাচল খাতকে সহায়তার অভিযোগে ৩৬টি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন।
মাহান এয়ারের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে চীন, ভারত, ইরাক, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও সংযুক্ত আরব আমিরাত রয়েছে।
অন্যদিকে ইরান এয়ারের ইউরোপীয় রুটগুলো নিষেধাজ্ঞা, উড়োজাহাজের সংকট ও যুদ্ধের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে সংস্থাটির আন্তর্জাতিক গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে ইরাকের নাজাফ ও বাগদাদ এবং তুরস্কের ইস্তান্বুল।
ইরান এয়ারের প্রধান নির্বাহী তাহের আবদোলহাই আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধের সময় মার্কিন হামলায় বিভিন্ন বিমান সংস্থার অন্তত ৩০টি উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কেশম এয়ারও ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিমান সংস্থা। তুরস্ক, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে তাদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল করে।
কোন কোন দেশের বিমানবন্দর প্রভাবিত হবে?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানে যৌথভাবে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তারপর থেকেই দেশটিতে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে কমতে শুরু করে।
ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৪ কোটি ৬২ লাখ যাত্রী বিমান ভ্রমণ করেছেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক যাত্রী ছিলেন ১ কোটি ১২ লাখ। তাদের প্রায় ৭২ লাখ ইরানি বিমান সংস্থাগুলোতে ভ্রমণ করেছেন।
বিমান চলাচলবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের হিসাবে, চলতি সেপ্টেম্বরে ইরান থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৭০ হাজার আসন নির্ধারিত ছিল। গত বছরের তুলনায় আগস্টে দেশটির আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সক্ষমতা ৪৯ শতাংশ কমেছে।
নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে ইস্তাম্বুল, নাজাফ, বাগদাদ, দুবাই, নয়াদিল্লি, লাহোর, বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু, শেনজেন ও ফুকেটের মতো বিমানবন্দরে, যেখানে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ফ্লাইট চলাচল করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অন্য দেশের আকাশসীমা ইরানি উড়োজাহাজের জন্য বন্ধ করতে পারে না। এর পরিবর্তে বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানের বিমান চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কি সব দেশ মানবে?
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সব দেশ সমানভাবে কার্যকর করবে না।
কৌশলগত বিশ্লেষণ ও পরামর্শক প্ল্যাটফর্ম স্ট্র্যাটেজিকঅ্যারো রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক সাজ আহমদ বলেন, ইরান থেকে ইরাকে ধর্মীয় পর্যটন ও ভ্রমণ দুই দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইরাক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশেষ ছাড় চাইতে পারে।
তার মতে, ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কারণে পাকিস্তানও সহজে এই নিষেধাজ্ঞা নাও মানতে পারে। একইভাবে চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের দাবি উপেক্ষা করতে পারে।
ইতোমধ্যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অবৈধ বলে অভিহিত করেছে বেইজিং। গতকাল মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন।
বিশ্লেষক সাজ আহমদ বলেন, তুরস্কও অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্পর্কের কারণে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে আপত্তি জানাতে পারে। তবে তার মতে, সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করার কথা জানিয়েছে। তাই দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পথ অনুসরণ করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানও চুপ করে বসে থাকবে না। শুরুতেই তেহরান বিদেশি বিমান সংস্থাগুলোর জন্য তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দিতে পারে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বেশিরভাগ বিদেশি বিমান সংস্থা ইরানের আকাশসীমা এড়িয়ে চলছে। তবে ফ্লাইদুবাইয়ের মতো কয়েকটি বিমান সংস্থা যাত্রার সময় কমাতে ইরানের পূর্বাঞ্চলের আকাশসীমার কিছু অংশ ব্যবহার শুরু করেছে।
ইরানের যাত্রীদের ওপর কী প্রভাব পড়বে?
আল জাজিরা বলছে, নতুন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ইরানি যাত্রীদের ওপর। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট কমে গেলে বিমান ভাড়া আরও বাড়বে এবং বিদেশে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়বে।
ইরানি-মার্কিন অর্থনীতিবিদ নাদের হাবিবি আল জাজিরাকে জানিয়েছেন, নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা খুবই ব্যাপক। কারণ ইরান থেকে আসা বা ইরানে যাওয়া ফ্লাইটকে সেবা দেওয়া যেকোনো বিমানবন্দরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে পড়বে। এর প্রভাব সারা বিশ্বের বেশিরভাগ বিমান চলাচল ও কার্যক্রমে পড়তে পারে। তবে তার ধারণা, চীন ও রাশিয়া ছাড়া অন্য দেশগুলো হয়তো এই নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করবে না। তিনি বলেন, বিমান টিকিটের দাম এরই মধ্যে বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহে কিছু ক্ষেত্রে দাম ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
নাদের হাবিবি আরও বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং দেশটির মুদ্রার মূল্য কমে যাওয়ার মধ্যে এই দ্রুত ব্যয় বৃদ্ধি যাত্রীদের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। এর ফলে গত কয়েক মাসে অনেক পরিবারের আয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
তার মতে, ইরানের অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিবারের আয় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে বিমান ভাড়া বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে।
স্ট্র্যাটেজিক অ্যারো রিসার্চের সাজ আহমাদ বলেন, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে খরচ বাড়লে টিকিটের দামও বাড়তে পারে। তবে তা নির্ভর করবে তেল ও জ্বালানির দামের ওপর এবং বিমান সংস্থাগুলো বাড়তি খরচ নিজেরা বহন করতে পারবে কি না।
লেবাননভিত্তিক বিমান চলাচল পরামর্শক মাজেন সাম্মাক বলেন, ইরানি যাত্রীরা বিকল্প হিসেবে বিদেশি বিমান সংস্থা ব্যবহার করতে পারেন। তবে এসব সংস্থার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিদেশি বিমান সংস্থাগুলো ইরানে ফ্লাইট চালু রাখতে পারলে যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে চাহিদা বাড়লে সেসব সংস্থার টিকিটের দামও বাড়বে।
মাজেন সাম্মাক বলেন, বিমান চলাচল আরও সীমিত হলে অনেক ইরানি যাত্রী তুরস্ক, ইরাক, আর্মেনিয়া কিংবা পাকিস্তান হয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে যাতায়াতের বিকল্প খুঁজতে পারেন। এতে ভ্রমণের সময়, খরচ ও ভোগান্তি বাড়বে।
অন্যদিকে ইস্তাম্বুল, দোহা, মাস্কাট ও দুবাইয়ের মতো আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগকেন্দ্রগুলোতে যাত্রীদের চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর পুরনো উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এতে দেশটির বর্তমানে সচল উড়োজাহাজের এক-তৃতীয়াংশ দ্রুত চলাচলের অযোগ্য হয়ে যেতে পারে।
ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার মানে কী?
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে সহায়তা করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে। সহজভাবে বললে, কোনো বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, জ্বালানি সরবরাহকারী, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান কিংবা টিকিট বিক্রয়কারী সংস্থা ইরানি বিমান সংস্থাকে সেবা দিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও ডলারে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে এমন নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আল জাজিরা বলছে, দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই চাপে রয়েছে। দেশটির মুদ্রার অবমূল্যায়ন, খাদ্য ও ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেনে সীমাবদ্ধতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন ডিজিটাল সম্পদ, স্বর্ণ, জাহাজ চলাচল, প্রযুক্তি ও বিমান চলাচলসহ আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন এই পদক্ষেপ কার্যকর হলে ইরানের বিমান চলাচল খাতের পাশাপাশি দেশটির সাধারণ মানুষের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ভ্রমণব্যবস্থাও আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।