নীতিমালা সংস্কারের নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পরিকল্পনাও। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আশানুপাতে বাড়ছে না। একাধিকবার বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সফর করেছেন। তারা সরকারের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেননি।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ইউএনসিটিএডি) বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে পৃথক পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের কিছু অগ্রগতির কথা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি নীতি জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া, জ্বালানি সংকট, দুর্বল অবকাঠামো, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মতো সমস্যার কথাও উঠে এসেছে।
জিডিপির তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ কম
ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) বেড়ে ১৭৭ কোটি ডলার হয়েছে। কয়েক বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তার পর এই বৃদ্ধিকে কিছুটা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে সংস্থাটি। তবে ২০১৯ সালে ১৮০ কোটি ডলারের বেশি এফডিআই এসেছিল। অর্থাৎ, ২০১৯ সালের তুলনায় গত বছর আসা এফডিআই কম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এফডিআই বাড়লেও এর বড় অংশ এসেছে আগে থেকে দেশে থাকা বিদেশি কোম্পানির পুনর্বিনিয়োগকৃত আয় এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ থেকে। অর্থাৎ নতুন কোনো বিদেশি কোম্পানি এসে বাংলাদেশে বড় কারখানা বা নতুন প্রকল্প করছে, এমন বিনিয়োগ বেশি বাড়েনি। অথচ নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এলে শুধু বৈদেশিক মুদ্রাই আসে না। এর সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা, কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ এবং স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি হয়।
এডিবি ও ইউএনসিটিএডির যৌথ বিনিয়োগ সংস্কার বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের এফডিআইয়ের চিত্র খুব ভালো নয়। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বছরে গড়ে প্রায় ১৫২ কোটি ডলার এফডিআই এসেছে। এই সময়ে জিডিপির তুলনায় এফডিআই ছিল প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
এশিয়ার অন্যান্য প্রতিযোগীদের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও পরিষ্কার হয়। ইউএনসিটিএডির হিসাবে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে মাথাপিছু গড়ে এফডিআই এসেছে মাত্র ৯ ডলার। একই সময়ে ভিয়েতনামে ১৭৫ ডলার, ইন্দোনেশিয়ায় ৮২ ডলার এবং কম্বোডিয়ায় ২২৭ ডলার এফডিআই এসেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়েনি।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম চরচাকে বলেন, “আন্তঃকোম্পানি ঋণ বাড়লেও এর বড় অংশই বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্থায়ন। এটিকে নতুন বিনিয়োগ বলা ঠিক হবে না। নতুন কারখানা বা নতুন প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি অধিগ্রহণ এবং বিভিন্ন বিষয় অনুমোদনের জটিলতা এখনো বড় বাধা হয়ে আছে। সরকার এই খাতে উদ্যোগ নিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবায়ন এখনা আগের ধারায় রয়ে গেছে।”
বিনিয়োগের শুরুতেই ২৩ সংস্থার লাইসেন্স নিতে হয়
এডিবি ও ইউএনসিটিএডির যৌথ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, একটি ব্যবসা শুরু করতে বিনিয়োগকারীকে ২৩টি সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে ১৫০টি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক সেবা ও অনুমোদন।
বাংলাদেশে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সব সরকারি সংস্থার সেবা এখনো পুরোপুরি এক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়নি। ফলে একটি কারখানা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও বিনিয়োগকারীকে নিবন্ধন, লাইসেন্স, পরিবেশগত অনুমোদন, জমি, কর, আমদানি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগসহ নানা বিষয়ে আলাদা আলাদা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এছাড়া সমস্যা শুধু সময় বেশি লাগা নয়। একই তথ্য ও কাগজপত্র বিভিন্ন দপ্তরে দিতে হয়। একটি দপ্তরের অনুমোদন না হলে অন্য দপ্তরের কাজও আটকে যায়। ফলে পুরো প্রকল্পের সময়সূচি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এডিবি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়ান স্টপ সার্ভিসে অগ্রগতি হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবাগুলো এখনো পুরোপুরি সমন্বিত নয়। ইউএনসিটিএডিও বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও ডিজিটাল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
নীতির ধারাবাহিকতা চান বিনিয়োগকারীরা
একটি বিদেশি বিনিয়োগ সাধারণত কয়েক বছরের জন্য হয় না। একটি কারখানা স্থাপনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করার পর বিনিয়োগকারী দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা করতে চান। তাই বিনিয়োগের আগে তিনি শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখেন না, আগামী কয়েক বছরে নীতি কেমন থাকবে, সেটিও হিসাব করেন। কর, শুল্ক, আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রা, শ্রম আইন কিংবা শিল্পনীতিতে ঘন ঘন পরিবর্তন হলে বিনিয়োগের হিসাবও বদলে যেতে পারে। ফলে বিনিয়োগকারীরা এমন দেশকে বেশি গুরুত্ব দেন যেখানে নিয়মকানুন পরিষ্কার এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এডিবির বিনিয়োগ সংস্কার বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো, সরকারি সেবা, ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, করব্যবস্থা এবং অর্থায়ন ব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ইউএনসিটিএডিও জাতীয় বিনিয়োগ নীতি ও একটি সমন্বিত বিনিয়োগ আইন প্রণয়ন, বিডার সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশের কয়েকটি দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো, দক্ষ জনবলের ঘাটতি, উচ্চ সুদহার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। এগুলোর নীতি আছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। ”
মুনাফা নিজ দেশে নিতেও জটিলতা
বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে অর্থ আনবেন, ব্যবসা করবেন এবং লাভ হলে সেই অর্থ বৈধভাবে নিজ দেশে নিতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা চান। তাই মুনাফা ও মূলধন ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়াও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের আইনে বিদেশি বিনিয়োগের মূলধন ও মুনাফা ফেরত নেওয়ার সুযোগ আছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া অনুমোদনের বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীর জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি করে। অর্থ নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে।
এডিবি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কয়েক বছর ধরে চাপ থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারীকে তাই শুধু বাংলাদেশে কত টাকা লাভ হবে, তা হিসাব করলেই হয় না। সেই টাকা ডলারে রূপান্তর করা যাবে কি না, বিনিময় হার কেমন থাকবে এবং কত সহজে অর্থ দেশে ফেরত নেওয়া যাবে, সেটিও তাকে বিবেচনায় নিতে হয়।
ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অর্থনীতির অস্থিরতা
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং টাকার বিনিময় হারেও বড় পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও প্রকাশ্যে এসেছে। আইএমএফের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, বিনিময় হার সংস্কারের অসম্পূর্ণতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতিও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে।
এসব বিষয় বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সুদের হার বাড়লে স্থানীয় অর্থায়নের খরচ বাড়ে। টাকার দাম পরিবর্তন হলে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের খরচ বদলে যায়। মূল্যস্ফীতি বাড়লে শ্রম ও পরিচালন ব্যয় বাড়ে। আবার ব্যাংকিং খাত দুর্বল হলে প্রয়োজনের সময় স্থানীয় অর্থায়ন পাওয়াও কঠিন হতে পারে। ফলে একটি প্রকল্প কাগজে লাভজনক হলেও বাস্তবে তার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
জ্বালানি সংকট
আইএমএফ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কর সুবিধা, সস্তা শ্রম বা অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলেই হয় না। কারখানা চালানোর জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসও দরকার। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করেছে। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক, সিরামিক, স্টিল, রাসায়নিকসহ জ্বালানিনির্ভর শিল্পের জন্য এই সমস্যা আরও গুরুত্বপূর্ণ। ইউএনসিটিএডির আগের বিনিয়োগ পর্যালোচনাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতিকে বিদেশি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত করেছে। ছবি: চরচা
সম্প্রতি ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনও জ্বালানি সংকটের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “জ্বালানি সংকট স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত করা না গেলে শুধু নীতিগত সংস্কার দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন। বিনিয়োগ ধরে রাখতে শুধু নতুন নীতি করলেই হবে না। বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে হবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”
বন্দর ও পরিবহন ব্যয়ও ভাবাচ্ছে বিনিয়োগকারীদের
একটি কারখানা স্থাপনের পর কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। উৎপাদিত পণ্য আবার দেশের বাইরে পাঠাতে হয়। তাই বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার ওপরও বিনিয়োগের সাফল্য অনেকটা নির্ভর করে। চট্টগ্রাম বন্দর বা স্থলবন্দরে পণ্য খালাসে বেশি সময় লাগলে প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে থাকে। একই সঙ্গে বাড়ে পরিবহন, গুদাম ও অন্যান্য খরচ।
এডিবি ও ইউএনসিটিএডির বিনিয়োগ সংস্কার বিশ্লেষণেও বাণিজ্য সহজীকরণ, সরকারি সেবা এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় শুধু কম মজুরি বা কর সুবিধা যথেষ্ট নয়। দ্রুত কাস্টমস সেবা, শক্তিশালী বন্দর ব্যবস্থাপনা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, সহজ ব্যাংকিং এবং দ্রুত সরকারি সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
কর ব্যবস্থা জটিল, ভোগান্তিতে বিনিয়োগকারীরা
বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে কর ও শুল্কসংক্রান্ত নানা জটিলতা রয়েছে। এডিবি ও ইউএনসিটিএডির বিশ্লেষণে করব্যবস্থা এবং কর প্রণোদনার কাঠামো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখানে শুধু করের হার কমানোই বিষয় নয়। একজন বিনিয়োগকারী কত দ্রুত করসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পাবেন, শুল্ক নিয়ে বিরোধ হলে কত দিনে তার সমাধান হবে এবং কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত কতটা ন্যায় সঙ্গত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বিদেশি কোম্পানিকে কর সুবিধা দেওয়ার পরও যদি ব্যবসা পরিচালনার অন্যান্য খরচ বেশি হয়, তাহলে সেই সুবিধা তাকে আকর্ষণ করবে না।
জমি ও বিভিন্ন ছাড়পত্র অনুমোদনে জটিলতা
বাংলাদেশে শিল্পের জন্য উপযুক্ত জমি পাওয়া, জমির মালিকানা নিশ্চিত করা, পরিবেশগত ছাড়পত্র নেওয়া এবং অন্যান্য অনুমোদন পাওয়া বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য বড় বিষয়। ইউএনসিটিএডির সর্বশেষ প্রতিবেদনে জমিতে প্রবেশাধিকার, অবকাঠামো পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি প্রকল্পের অনুমোদন যদি একাধিক সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর করে, তাহলে একটি জায়গায় বিলম্ব হলেই পুরো প্রকল্প পিছিয়ে যেতে পারে। অথচ এই সময়েও জমির খরচ, ঋণের সুদ, কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য খরচ চলতে থাকে।
অগ্রগতি কিছুটা, দরকার বাস্তবায়ন
বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনগুলোতে শুধু সমস্যার কথাই বলা হয়নি। গত কয়েক বছরে কিছু সংস্কার ও অগ্রগতির কথাও উঠে এসেছে। ইউএনসিটিএডি বলেছে, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং শ্রম ও কর ব্যবস্থায় কিছু সংস্কার হয়েছে। মেধাস্বত্ব কাঠামোতেও অগ্রগতি হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল পেতে হলে বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ বাড়াতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং বিনিয়োগকারীর জন্য নিয়মকানুন আরও পরিষ্কার করতে হবে।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে বাস্তবায়ন সক্ষমতা ও সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “বৈশ্বিক বিনিয়োগ পরিস্থিতি খুব কঠিন। এই সময়েই নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হবে। তাহলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি ভালো হলে যেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ে।”
যেসব সংস্কার সুপারিশ করছে সংস্থাগুলো
সংস্থাগুলোর বাংলাদেশের করণীয় নিয়ে একাধিক সুপারিশ করেছে। প্রথমত, ওয়ান স্টপ সার্ভিসকে সত্যিকারের ওয়ান স্টপ সার্ভিস করতে হবে। একজন বিনিয়োগকারী যাতে একই তথ্য বারবার বিভিন্ন দপ্তরে দিতে বাধ্য না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর, শুল্ক ও বিনিয়োগ নীতিতে ধারাবাহিকতা আনতে হবে। একজন বিনিয়োগকারী যেন দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প করার সময় ভবিষ্যতের নিয়মকানুন নিয়ে অযথা অনিশ্চয়তায় না থাকেন।
তৃতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ও মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারী যেন প্রয়োজনের সময় ব্যাংকিং সেবা, বাণিজ্য অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সহজে করতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জ্বালানি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিশ্চিত না হলে নতুন শিল্পে বড় বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে।