জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশার বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর ফলে ডেঙ্গু, জিকা ও ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসের মতো মশাবাহিত রোগের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। তাই কীটনাশক ব্যবহার না করে পরিবেশবান্ধব উপায়ে মশার সংখ্যা কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রায় ৬ লাখ মশা ছাড়া হবে। চলতি গ্রীষ্মে পরীক্ষাগারে উৎপাদিত এসব মশা ছাড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
এতে বলা হয়, এক্ষেত্রে শুধু পুরুষ মশাই ছাড়া হচ্ছে। পুরুষ মশা মানুষকে কামড়ায় না এবং রক্তও খায় না। তাই এ কর্মসূচিতে ছাড়া মশাগুলো মানুষের জন্য কামড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করবে না।
এই মশাগুলো ওলবাকিয়া নামের একটি প্রাকৃতিক ব্যাকটেরিয়া বহন করে। যখন এসব পুরুষ মশা বন্য পরিবেশের স্ত্রী মশার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন স্ত্রী মশার ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে ওই এলাকার মশার সংখ্যা কমতে থাকে।
সিলভার স্প্রিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘বি সেফ মসকুইটো কন্ট্রোল’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা সরাসরি বাড়ির মালিকদের জন্য এই ধরনের মশা নিয়ন্ত্রণ সেবা চালু করেছে। এর আগে এ ধরনের কর্মসূচি মূলত সরকারি সংস্থা, মশা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত।
প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ওয়াশিংটন ডিসি ও পার্শ্ববর্তী মেরিল্যান্ডের প্রায় ২৫টি বাড়িতে এই সেবা দিচ্ছে। গ্রীষ্মকালজুড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় প্রায় এক হাজার ৫০০টি পুরুষ মশা ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ধীরে ধীরে কম সংখ্যক ডিম ফুটে এবং স্থানীয় মশার সংখ্যা হ্রাস পায়।
এই মশাগুলো সরবরাহ করছে কেন্টাকিভিত্তিক ‘মসকুইটোমেট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তারা ইউনিভার্সিটি অব কেন্টাকিতে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওলবাকিয়া সংক্রমিত মশা উৎপাদন করে।
বি সেফের দাবি, এই পদ্ধতি প্রচলিত কীটনাশক ছিটানোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। এটি শুধুমাত্র মশার ওপর প্রভাব ফেলে, অন্য উপকারী পোকামাকড় বা বন্যপ্রাণীর কোনো ক্ষতি করে না। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটি মশা নিয়ন্ত্রণে বেইট স্টেশন এবং জমে থাকা পানিতে জৈবিক চিকিৎসা পদ্ধতিও ব্যবহার করে।
ওলবাকিয়াভিত্তিক এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যেই সিঙ্গাপুরে সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। সেখানে লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়াবাহী পুরুষ মশা ছেড়ে দেওয়ার পর পরীক্ষামূলকভাবে এলাকাগুলোতে মশার সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। দেশটি ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই কর্মসূচি দেশের অর্ধেক পরিবারের মধ্যে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও এখন এই প্রযুক্তিতে আগ্রহী। গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান আলফাবেট ক্যালিফোর্নিয়া ও ফ্লোরিডায় কোটি কোটি ওলবাকিয়া সংক্রমিত মশা ছাড়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন চেয়েছে।
বি সেফের প্রতিষ্ঠাতা টড মন্টগোমারি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার এখনো উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রক জটিলতার কারণে সীমিত। তবে পরিবেশবান্ধব মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ওলবাকিয়াভিত্তিক এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে।