খাবারেও নাকি ফ্যাসিবাদ আছে? শুনেছেন কখনো? যত অদ্ভুতই লাগুক ‘ফুড ফ্যাসিজম’ বলে একটা বিষয় কিন্তু আছে।
চমকাবেন না। এটা কোনো খাবরে ঠিক নুন-ঝাল থাকবার মতো কোনো বিষয় নয়। বেশ গুরুতর বিষয়টা। যা বুঝতে হলে খুব বেশি দূর যেতে হবে না। এই অঞ্চলের গরু নিয়ে গোলমালের দিকে ভালো করে তাকালেই হবে।
এই গোলমাল নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই তাকাতে হবে ভারতের দিকে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গরু-সংক্রান্ত সহিংসতায় ৯১ জন নিহত হয়েছেন। ঘরে কিংবা হাতের প্যাকেটে গরুর মাংস আছে–এই অভিযোগেই নিহত হয়েছেন অনেকে।
এর প্রতিক্রিয়ায় হোক বা অতি উৎসাহেই হোক–বাংলাদেশেও কিন্তু কাছাকাছি প্রবণতা দেখা গেছে।
অনেকেরই মনে থাকার কথা দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানের পর রাজধানীতে হঠাৎ করেই গরুর মাংসপ্রেমীরা তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় তারা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের দাবি ছিল, যেসব রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস বিক্রি করা হচ্ছে না, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে তা বিক্রি করতে হবে।
এ ছাড়া গণমাধ্যম অফিসের সামনে ‘গরু জবাই করার কর্মসূচি ও বিক্ষোভ সমাবেশ’-এর কথাও হয়তো অনেকের মনে পড়ার কথা। গত বছর পয়লা বৈশাখের দিন ‘পহেলা বৈশাখ উদযাপনের নামে ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টার প্রতিবাদে’ ‘বাংলাদেশের জনগণ’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে গরু জবাই করে জিয়াফত আয়োজন করা হয়।
এই উদাহরণগুলোর সবই বাংলাদেশে ‘ফ্যাসিবাদ-বিরোধী’ আন্দোলনের পরের। এবং চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতিতে ‘ফ্যাসিবাদ’ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে।
যে ভারতের ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্যের’ বিরুদ্ধে ঢাকায় এই আয়োজন, সেই দেশটির কথা তো আগেই বলেছি। মনে করিয়ে দিই–আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিসাবে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে গরু-সংক্রান্ত সহিংসতায় ৯১ জন নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া আমিষ খাবারবিরোধী এবং নিরামিষ খাবার ‘চাপিয়ে দেওয়ার’ অভিযোগ ভারতে অনেক দিন পর্যন্ত আলোচনার বিষয়। এই তো সেদিন ভারতে বাংলাভাষী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। সেখানে একটি বিরিয়ানির দোকানের মালিককে বলা হয়, মন্দিরের পাশে বিরিয়ানির দোকান রাখা যাবে না। একইসঙ্গে ‘আফরিন’ নামের ওই দোকানের নাম পরিবর্তনের করতে বলা হয়।
ভারতের অধিকারকর্মী লেখক নন্দিতা হাকসার তার ‘দ্য ফ্লেভার্স অব ন্যাশনালিজম: আ মেমোয়ার ফর লাভ, হেইট অ্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ’ বইয়ে ভারতের খাদ্য-সংক্রান্ত রাজনীতির নানা বিষয় তুলে ধরেছেন। নন্দিতা ‘ফুড ফ্যাসিজম’ শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেছেন। এই যে খাবার নিয়ে রাজনীতি, সেখানে ‘ফুড ফ্যাসিজম’ শব্দবন্ধটির অর্থ কী?
আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের দেহ, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। খাদ্য নিয়ন্ত্রণও এই ক্ষমতা চর্চার একটি অংশ হতে পারে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
তবে এই শব্দবন্ধটি প্রথম কবে, কে ব্যবহার করেছিল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালির শাসক বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী শাসনামলে রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যাভ্যাস ও শস্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকে অনেক গবেষক পরবর্তী সময়ে ‘ফ্যাসিস্ট ফুড পলিটিকস’ বা ‘ফিডিং ফ্যাসিজম’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
ইতিহাসবিদ সিমোন চিনোত্তো ‘গ্যাস্ট্রোফ্যাসিজিম অ্যান্ড এম্পায়ার’ বইতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ইতালির সময় ইথিওপিয়া দখলের ক্ষেত্রে খাদ্যের রাজনৈতিক ও ঔপনিবেশিক ব্যবহারের এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন।
সিমোন চিনোত্তো দেখিয়েছেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য ইতালি ইথিওপিয়া আক্রমণ করে। চিনোত্তোর মতে, খাদ্য ছিল ঔপনিবেশিক প্রকল্পের সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার লক্ষ্য ছিল একটি নতুন ‘অর্গানিক ন্যাশনাল কমিউনিটি’ গঠন করা। যাকে কল্পনা করা হয়েছিল এমন এক শক্তিশালী জাতিসত্তা হিসেবে, যা বর্ণগত, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ‘বিষ’ থেকে পরিশুদ্ধ।
এই ধারণাকেই তিনি ‘গ্যাস্ট্রোফ্যাসিজম’ নামে অভিহিত করেছেন। চিনোত্তোর সংজ্ঞা অনুযায়ী, গ্যাস্ট্রোফ্যাসিজম হলো এমন এক জটিল মতাদর্শ, যেখানে বিশ্বাস করা হয় যে একটি জাতি–যাকে একই সঙ্গে ভৌগোলিক ভূখণ্ড এবং বর্ণগতভাবে সংজ্ঞায়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে কল্পনা করা হয় এবং তাকে টিকিয়ে রাখা তখনই সম্ভব, যখন সেই জাতি তার তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী’ খাদ্য নিরাপদ করবে, উৎপাদন করবে এবং ভোগ করবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে দখল ও উপনিবেশ স্থাপনকেও বৈধ বলে বিবেচনা করা হবে।
গ্যাস্ট্রোফ্যাজিম-এর এই ধারণা পরে ফুড ফ্যাসিজম হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
২০০৮ সালে ল্যাটিন আমেরিকা বিষয়ক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাংবাদিক রজার বারব্যাক তার ‘দ্য রাইজ অব ফুড ফ্যাসিজম’ নিবন্ধে বলিভিয়ার কৃষি ব্যবসা ও ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে খাদ্যের ওপর করপোরেট ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ধরনকে বর্ণনা করতে ‘ফুড ফ্যাসিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
পরবর্তীকালে দক্ষিণ এশিয়া, বিশেষ করে ভারতে খাদ্যাভ্যাস ও গোমাংসকে কেন্দ্র করে ধর্মীয়-রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিষেধাজ্ঞার আলোচনায় বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মী এই পরিভাষাটির ব্যবহার শুরু করেন।
সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা দেখিয়েছেন যে, খাদ্য কেবল পুষ্টির বিষয় নয়। এটি পরিচয়, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়ু তার ‘ডিসটিংশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, খাদ্যাভ্যাস সামাজিক শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক পুঁজির প্রতিফলন। অন্যদিকে উত্তরাধুনিক দার্শনিক মিশেল ফুকো তার ‘দ্য হিস্ট্রি অব সেক্সচুয়ালিটি’তে ‘বায়োপওয়ার’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছে যে, আধুনিক রাষ্ট্র মানুষের দেহ, স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে। খাদ্য নিয়ন্ত্রণও এই ক্ষমতা চর্চার একটি অংশ হতে পারে।
ফুড ফ্যাসিজমের উদাহরণ খোলা চোখেই বিভিন্নভাবে দেখা যায়। কোনো সমাজে নির্দিষ্ট খাদ্যকে ‘নৈতিক’ এবং অন্য খাদ্যকে ‘অনৈতিক’ হিসেবে প্রচার করা ফুড ফ্যাসিজম। ধর্ম বা জাতীয়তাবাদের নামে খাদ্যাভ্যাসের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ, কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ–এসবই এর উদাহরণ।
খাবার নিয়ে আলোচনায় আরও একটি বিষয় উঠে আসে। ‘আমার খাবার’, ‘ওর খাবার’। এর উদাহরণ বাংলাদেশেই মিলবে। দেশের পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের নানা খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নাক সিঁটকানো একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। আদিবাসীদের নানা পদের খাবারের উপকরণ নিয়ে তাদের ছোট করা এবং প্রায় ক্ষেত্রেই ঘৃণা-বিদ্বেষমূলক মন্তব্যও ফুড ফ্যাসিজমের একটি উদাহরণ। কারণ, এখানে একটি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সংখ্যাগুরু আরেকটি জাতির মানুষ নিজের ধর্মাচরণ দিয়ে অন্যকে বিচার করছে।
তবে এখানে একটা কথা বলা দরকার, জনস্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রান্স-ফ্যাট সীমিত করা, খাদ্যের লেবেলিং বাধ্যতামূলক করা বা নিরাপদ খাদ্য আইন আরোপ–এসবকে সাধারণভাবে ফুড ফ্যাসিজম বলা যায় না। কারণ, এগুলোর উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা দমন নয়। তাছাড়া প্রাণীর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রেও একটি কথা রয়েছে। বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করতে যদি কোনো প্রজাতির প্রাণী খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, সেটাও ফুড ফ্যাসিজমের মধ্যে পড়ে না।