ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে কাকে প্রার্থী করা হবে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন, কেউ দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভূমিকা, আবার কেউ নগর প্রশাসনের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাকে নিজের যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরছেন।
তবে এবার বিএনপির হিসাব আরও জটিল। সংসদ নির্বাচনে ঢাকার কয়েকটি আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান এবং নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সরাসরি সিটি নির্বাচনে নামার সিদ্ধান্ত দুই সিটিতে বিএনপির প্রার্থী বাছাইকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
তবে নির্বাচন কবে হবে, সেটিই এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এসে ইসির পক্ষ থেকে আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমও বলেছেন, চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।
প্রশাসক থেকে মেয়র হিসাবও আছে
ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী আলোচনার শুরুতেই আসছে বর্তমান দুই প্রশাসকের নাম।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। উত্তরে দায়িত্ব পান মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং দক্ষিণে মো. আব্দুস সালাম।
দলের ভেতরের আলোচনা আছে, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে তারা নগর ব্যবস্থাপনা, করপোরেশনের কার্যক্রম ও নাগরিক সেবার বাস্তব সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে তাদের প্রার্থিতা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেই মেয়র পদে মনোনয়ন নিশ্চিত হবে- এমন কোনো সিদ্ধান্ত বিএনপি এখনো প্রকাশ করেনি।
বরং দলীয় সূত্রের ভাষ্য, শেষ পর্যন্ত প্রার্থী বাছাইয়ের সময় রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ভোট, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের শক্তির বিষয়গুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা হতে পারে।
সংসদ নির্বাচনের ফল বদলে দিয়েছে হিসাব
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল।
রাজধানীর একাধিক আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীদের ব্যবধান ছিল তুলনামূলক কম। ঢাকা-৪ ও ঢাকা-৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জয়ী হন। ঢাকা-১০ ও ঢাকা-১৬ আসনেও বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে ভোটের ব্যবধান কম ছিল।
এর ফলে বিএনপির ভেতরে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে- জাতীয় নির্বাচনে যে এলাকাগুলোতে দলটির ভোটের ভিত্তি তুলনামূলকভাবে চাপে পড়েছে, সেখানে সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে কাকে দাঁড় করানো হবে?
দলীয় নেতারা বলছেন, এবার শুধু দলের পদ-পদবি বা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নয়, প্রার্থীর নিজস্ব ভোট, স্থানীয় পরিচিতি এবং সাধারণ ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পেতে পারে।
কারণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সংসদ নির্বাচনের মতো পুরোপুরি দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর করে না। স্থানীয় পরিচিতি, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন এবং নাগরিক ইস্যুও এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
উত্তরে তাবিথ, মিল্টন না কাইয়ুম?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে বিএনপির আলোচনায় এখন প্রধানত তিনটি নাম: তাবিথ আউয়াল, মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন এবং এম এ কাইয়ুম।
তাবিথ আউয়াল এই তালিকায় সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন। ২০২০ সালের সিটি নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। এবারও দলের মনোনয়ন পেলে নির্বাচন করার আগ্রহ রয়েছে বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা আছে।
দলের একাংশের যুক্তি হলো, আগের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এবং নগর রাজনীতিতে পরিচিতি। আবার দলের নতুন প্রজন্মের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। প্রায় সাত মাস ধরে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয়ে তার প্রকাশ্য বক্তব্যেও নাগরিক সেবা, জলাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা ও উন্নয়ন কাজের বিষয়গুলো এসেছে।
তৃতীয় নাম এম এ কাইয়ুম। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সভাপতি হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতে তার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। তার সমর্থকদের একটি অংশ তাকে মেয়র পদে দেখতে চায় বলে দলীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
অর্থাৎ উত্তরের হিসাবটা অনেকটা পুরনো সাংগঠনিক শক্তি বনাম নির্বাচনী অভিজ্ঞতা বনাম প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা- এই তিন ধারায় ভাগ হয়ে আছে।
দক্ষিণে ইশরাকের সঙ্গে সালাম–সোহেল
ঢাকা দক্ষিণে সমীকরণ আরও আলোচিত। এখানে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে আসছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলের নাম।
ইশরাক হোসেনের বড় রাজনৈতিক সম্পদ ২০২০ সালের সিটি নির্বাচন। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি দুই লাখ ৩৬ হাজার ৫১২ ভোট পেয়েছিলেন। ফলে দক্ষিণের নগর রাজনীতিতে তার একটি পরীক্ষিত নির্বাচনী ভিত্তি রয়েছে।
তবে তার সামনে আরেকটি বিষয়ও আছে- বর্তমানে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। ফলে তাকে আবার সিটি নির্বাচনে পাঠানো হবে কি না, সেটিও দলের সিদ্ধান্তের অংশ।
আব্দুস সালামের ক্ষেত্রে সামনে আসছে নগর প্রশাসনের অভিজ্ঞতা। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে দক্ষিণ সিটির প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সরকারি নথিতেও তাকে বর্তমান প্রশাসক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে, হাবিব উন নবী খান সোহেলের রয়েছে দীর্ঘ সাংগঠনিক পরিচয়। ছাত্র ও অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অনুসারীরাও বিভিন্ন এলাকায় প্রচারে সক্রিয়।
প্রতিদ্বন্দ্বী কারা, সেটিও দেখছে বিএনপি
এবারের সিটি নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হলো- বিএনপিকে শুধু নিজেদের প্রার্থী নিয়ে ভাবলেই হচ্ছে না। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রার্থীরাও হিসাবের অংশ হয়ে উঠেছেন।
এনসিপি এরই মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে মেয়র প্রার্থী করেছে দলটি। এর আগে দুই নেতার ভোটার এলাকা পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরে দল আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে।
জামায়াত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দুই সিটির প্রার্থী ঘোষণা না করলেও দক্ষিণে ডাকসুর সাবেক ভিপি সাদিক কায়েম এবং উত্তরে মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
ফলে উত্তরে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি চিত্র দাঁড়াচ্ছে- বিএনপির তাবিথ, মিল্টন বা কাইয়ুমের বিপরীতে এনসিপির আসিফ এবং জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী।
দক্ষিণে বিএনপির ইশরাক, সালাম বা সোহেলের বিপরীতে এনসিপির পাটওয়ারী এবং জামায়াতের সাদিক কায়েমের নাম আলোচনায় আসছে।
এখনো অবশ্য এগুলো সম্ভাব্য সমীকরণ; বিএনপি ও জামায়াতের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়নি।
মহানগর বিএনপির প্রত্যাশা কী?
প্রার্থী বাছাই নিয়ে মহানগর পর্যায়েও ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের ভাষায়, তারা এমন একজন প্রার্থী চান যিনি দীর্ঘদিন ঢাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।
চরচাকে তিনি বলেন, “জনবান্ধব প্রার্থী হলে সবচেয়ে ভালো হয়। যার ঢাকা শহরের দূষণ সম্পর্কে ধারণা আছে, দীর্ঘদিন ঢাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, থানা-ওয়ার্ড ও মানুষের সঙ্গে যার যোগাযোগ আছে- এমন প্রার্থী দরকার।”
তার ভাষ্য, কেন্দ্র যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পক্ষেই সংগঠনের সবাই কাজ করবেন।
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েলের প্রত্যাশাও কাছাকাছি। তার ভাষায়, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত- এমন কাউকেই তারা প্রার্থী হিসেবে দেখতে চান।
তবে স্থানীয় পর্যায়ের এই পছন্দ-অপছন্দের বাইরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কোন মানদণ্ডে প্রার্থী বাছাই করবে। দলের পক্ষ থেকে এখনো দুই সিটির মেয়র পদে কোনো প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদুও জানিয়েছেন, মনোনয়ন নিয়ে হাইকমান্ডে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এখনো শেষ হয়নি।
স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন চরচাকে বলেন, “সিটি করপোরেশন নির্বাচন অতীতে যেভাবে হয়েছে, সেভাবেই হবে। প্রশাসকদের ভূমিকা কী হবে, সেটিও এখনো স্পষ্ট নয়।”
এ অবস্থায় ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির সামনে মূলত কয়েকটি প্রশ্ন- কাকে মনোনয়ন দিলে দলীয় ভোটের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভোটও পাওয়া যাবে, কে স্থানীয় সংগঠনকে এক ছাতার নিচে আনতে পারবেন, আর কে জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বিএনপির ভোট ধরে রাখতে পারবেন।
তবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। আর ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে নতুন করে ভাবায়, প্রার্থী বাছাইয়ের পাশাপাশি বিএনপির হাতে এখন আরও কিছুটা সময়ও তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কমিশনের পক্ষ থেকে আগামী বছরের জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, ঢাকার দুই সিটির লড়াই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। কিন্তু কে প্রার্থী হবেন- সেই লড়াইটি বিএনপির ভেতরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।