একদিকে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা; অন্যদিকে সরকার বলছে, ভোটের সময়সূচি নিয়ে ‘আলোচনা হয়নি’-স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে এই দুই অবস্থান এখন প্রকাশ্য। তবে শুধু ইসি ও সরকারের বক্তব্যের অমিলই নয়, নির্বাচন কবে হবে-সেই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক সমীকরণও সামনে এসেছে।
নভেম্বরের শেষ থেকে শুরু হচ্ছে বিভিন্ন স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা। এরপর রোজার মাস, ঈদ ও এসএসসি পরীক্ষা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসন, শিক্ষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত করার সময় এবং সরকারের বাজেট ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের বিষয়। সব মিলিয়ে নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়টিই এখন জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ১২ নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করা বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
কিন্তু এর বাইরে আরেকটি রাজনৈতিক সমীকরণও ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেটি হলো—ক্ষমতাসীন বিএনপি নিজেই কি এখনো তৃণমূলকে স্থানীয় নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত করতে পেরেছে?
ক্ষমতাসীনদের ভেতরের একাধিক সূত্র বলছে, ইউপি নির্বাচন সামনে রেখে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রার্থী বাছাই। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই একাধিক বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান পদে ভোট করতে আগ্রহী। কোথাও তিন-চারজন এরই মধ্যে মাঠে নেমেছেন। কেন্দ্রীয়ভাবে একক প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি করা দুরূহ হয়ে উঠছে। যদিও স্থানীয় নির্বাচন দলীয়ভাবে হয় না, তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কথাটি শুধুই কাগুজে।
ফলে নির্বাচন যত দ্রুত হবে, বিএনপির ভেতরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও কোন্দলও তত দ্রুত প্রকাশ্যে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আর এ কারণেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার দৃশ্যমান কারণ যদি পরীক্ষা ও রোজা হয়, তাহলে এর আড়ালে কি বিএনপির সাংগঠনিক প্রস্তুতির ঘাটতিও আছে?
পরীক্ষাই বড় বাধা
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত চলার কথা। ভোটের দিনটি পরীক্ষার বাইরে রাখা গেলেও নির্বাচন আয়োজনের পুরো প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিএনপির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট পেছানোর যুক্তি হিসেবে তারা বলছেন, ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আবার নির্বাচনী দায়িত্বে থাকেন বিপুলসংখ্যক শিক্ষক। ভোটের আগে তাদের প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব বণ্টন ও প্রস্তুতির জন্যও সময় প্রয়োজন। ফলে একই সময়ে পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও নির্বাচনী দায়িত্ব চললে শিক্ষা কার্যক্রমে চাপ তৈরি হবে।
এই বিষয়টিকেই নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ‘জেনুইন কনসার্ন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নভেম্বর-ডিসেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের জন্য পর্যাপ্ত সময়ের ‘স্পেস’ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
নভেম্বর পেরোলেই সামনে রমজান
নভেম্বর-ডিসেম্বরের পরীক্ষা এড়িয়ে নির্বাচন আয়োজন করা গেলেও এরপর আরেকটি বড় বাধা-রমজান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু এবং ১০ মার্চ ঈদুল ফিতর হওয়ার সম্ভাবনা ধরে সময় বিবেচনা করা হচ্ছে। রোজা ও ঈদের সময়ে বড় পরিসরে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করতে চায় না সরকার-সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা।
অর্থাৎ নভেম্বরের নির্বাচন পিছিয়ে দিলে জানুয়ারি একটি সম্ভাব্য সময় হতে পারে। কিন্তু জানুয়ারির পরপরই রমজান। ফলে জানুয়ারির সময়টিও পুরোপুরি ব্যবহার করা যাবে কি না, সেটি নির্ভর করবে প্রস্তুতি ও নির্বাচনের পরিধির ওপর।
ঈদের পর এসএসসি
রমজান ও ঈদ শেষ হওয়ার পরও স্বস্তির সময় খুব বেশি নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের ১৪ মার্চ থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়ে ১৫ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা।
এ কারণে মার্চ-এপ্রিলও নির্বাচন আয়োজনের জন্য সমস্যামুক্ত সময় নয়। নির্বাচন কমিশনের হিসাবেও বিষয়টি এসেছে। কমিশনার সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় ৬ জুনের আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শেষ করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন।
অর্থাৎ নভেম্বর থেকে শুরু করে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এমন একটি সময় বের করতে হবে, যখন একসঙ্গে পরীক্ষা, রমজান, ঈদ এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির সঙ্গে সংঘাত কম থাকে।
ইসির পরিকল্পনা বনাম সরকারের প্রস্তুতি
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি—ইসি যখন ১২ নভেম্বর থেকে ভোট শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা করল, তখন সরকারের সঙ্গে সমন্বয় কতটা হয়েছিল?
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনায় সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছিল। প্রথম ধাপ ১২ নভেম্বর, এরপর ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে ভোটের সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। তবে ইসি তখনই জানিয়েছিল, এগুলো চূড়ান্ত নয়।
কিন্তু পর দিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি। তার বক্তব্যের পর ইসি সচিবালয়ও ব্যাখ্যা দেয়, এগুলো ছিল প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের সম্ভাব্য তারিখ; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত পাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
ফলে এখানে মূল সমস্যা শুধু ভোটের তারিখ নয়; নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব এবং নির্বাচন আয়োজনের জন্য সরকারের প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।
তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যে এ বছর সরকার শুরু করতে চাইছে তা স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বুধবারই ইঙ্গত দিয়েছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘‘চলতি বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
ইসিও আগামী বছরের প্রথম দিকে নির্বাচন শুরু করতে চায় জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু করতে চায় নির্বাচন কমিশন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা ও জেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে সব নির্বাচন সম্পন্ন হবে।’’
সরকারের হাতে কেন এত সমন্বয়ের বিষয়?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব ইসির হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সরকারের বহু সংস্থা।
ভোটকেন্দ্র, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক, পরিবহন, অর্থ বরাদ্দ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সহযোগিতা প্রয়োজন।
এ কারণেই আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর মতামত নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই শুধু একটি ভোটের তারিখ ঠিক করাই যথেষ্ট নয়; একই সময়ে প্রশাসনের ওপর কতটা চাপ পড়বে এবং অন্য সরকারি কার্যক্রমের সঙ্গে তা কীভাবে সমন্বয় হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
ইউপি নির্বাচন স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের একটি মাত্র নির্বাচন। ইউনিয়ন পরিষদের পাশাপাশি পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনও করতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচ স্তরের নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একটি স্তরের নির্বাচন পিছিয়ে গেলে পরবর্তী স্তরের নির্বাচনগুলোর সময়সূচিও নতুন করে সাজাতে হবে।
এখানেই সময়ের চাপ তৈরি হচ্ছে। একটি নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরবর্তী নির্বাচনের প্রস্তুতি, তফসিল, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হয়। ফলে ইউপি নির্বাচন যদি মে-জুনের দিকে চলে যায়, অন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন নিয়েও নতুন সময়সূচি তৈরি করতে হতে পারে।
এক ইউনিয়নে একাধিক বিএনপি প্রার্থী
স্থানীয় নির্বাচন এবার দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার পরও বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো তুলনামূলক কঠিন। বিএনপির জন্য এখানেই বড় সমস্যা।
আগামী ইউপি নির্বাচনে একেকটি ইউনিয়নে একাধিক বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন। কেউ দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেতা, কেউ সংসদ নির্বাচনের সময় সক্রিয় ছিলেন, আবার কেউ স্থানীয়ভাবে এমপি বা প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আশঙ্কা, একাধিক বিএনপি নেতা প্রার্থী হলে ভোট ভাগ হবে। তার চেয়েও বড় বিষয়, নির্বাচনের আগে থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে যে বিরোধ তৈরি হবে, তা পরবর্তী সময়ে সংগঠনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এই আশঙ্কা থেকেই বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় নেতাদের একক প্রার্থী ঠিক করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত জুলাইয়ে তিনি স্থানীয় নেতাদের আগেভাগে প্রার্থী নিয়ে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছানোর নির্দেশ দেন।
পরে আগস্টেও সংসদীয় দলের বৈঠকে তিনি দলের ভেতরের বিভাজন কমিয়ে প্রতিটি এলাকায় একজন প্রার্থী দাঁড় করানোর ওপর জোর দেন। জাতীয় নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে কয়েকটি আসনে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নিজেরাই বুঝতে পারছেন—স্থানীয় নির্বাচন বিএনপির জন্য শুধু আরেকটি নির্বাচন নয়, এটি দলের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণেরও পরীক্ষা।
সমস্যার আরেকটি জায়গা বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো। ক্ষমতায় আসার পর সরকারের দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দলের অনেক শীর্ষ ও মধ্যম সারির নেতা। এর প্রভাব পড়েছে তৃণমূলের দলীয় কার্যক্রমে।
বিএনপির একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমের গতি কমেছে। অনেক নেতা সরকারি ও সংসদীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। নিজেদের মধ্যেকার গন্ডগোল আগে ঠিক করতে হবে। তার আগে নির্বাচন দিলে ম্যাসাকার হবে।”
দলীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপির ৮২টি জেলা ও মহানগর কমিটির মধ্যে ৭২টির মেয়াদ পার হয়ে গেছে। ফলে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, উপজেলা থেকে জেলা—এই সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে প্রার্থী যাচাই ও বাছাইয়ের কাজ করাও জটিল হয়ে উঠেছে।
এখানেই স্থানীয় নির্বাচন বিএনপির জন্য জাতীয় নির্বাচনের চেয়ে আলাদা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের একজন উপদেষ্টা চরচাকে বলেন, “জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া যায়। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে হাজার হাজার স্থানীয় নেতার আকাঙ্ক্ষা সামলাতে হবে। একজনকে সমর্থন করলে অন্যদের অসন্তোষ তৈরি হবে। আর দলীয় প্রতীক না থাকায় অসন্তুষ্ট প্রার্থীদের নির্বাচনে থেকে যাওয়ার সুযোগও বেশি।”
এমপি বনাম স্থানীয় নেতাদের সমীকরণ
দলের তৃণমূল নেতারা বলছে, আরেকটি সম্ভাব্য সংঘাতের জায়গা তৈরি হয়েছে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় সংগঠনের নেতাদের মধ্যে।
বিএনপির তৃণমূলের একাংশের আশঙ্কা, স্থানীয় নির্বাচনে এমপিরা নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সামনে আনতে চাইতে পারেন। এতে দীর্ঘদিনের দলীয় কর্মী বা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় অন্য প্রার্থীরা বাদ পড়তে পারেন।
স্থানীয় প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব, গোষ্ঠী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে বিএনপির ভেতরে উদ্বেগ রয়েছে বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বলছে, প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ বা প্রভাব নয়—জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা, গ্রহণযোগ্যতা ও মাঠের তথ্য বিবেচনা করা হবে। দলীয় নির্দেশ অমান্য করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা আছে, কিন্তু সেই নির্দেশনা মাঠে কতটা কার্যকর করা যায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
দ্রুত নির্বাচনে ঝুঁকি কোথায়?
নির্বাচন কমিশন যদি নভেম্বর থেকে ইউপি ভোট শুরু করে, তাহলে বিএনপিকে অল্প সময়ের মধ্যেই হাজার হাজার প্রার্থীর মধ্যে থেকে একক প্রার্থী বাছাই করতে হবে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানো, স্থানীয় বিরোধ মেটানো এবং নির্বাচনের পর দলীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা।
একজন কেন্দ্রীয় নেতা সমর্থিত প্রার্থী বনাম স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় আরেক নেতা—এই দ্বন্দ্ব যদি তৈরি হয়, সেটি শুধু নির্বাচনী মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বিএনপির সংগঠনেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এখন থেকেই ‘এক ইউনিয়নে এক প্রার্থী’ নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকদের কয়েকজন।
তবে নির্বাচন হলে সকল প্রস্তুতিই রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। চরচাকে তিনি বলেন, “নির্বাচন যেভাবে যে সময়েই হবে না কেন, দলীয় ভাবে সকল প্রস্তুতি নেওয়া আছে।”
তবে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ইসি প্রস্তুতি থামিয়ে রাখেনি। স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার তথ্য চাওয়া হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের সময় বসানো ক্যামেরার কোনোটি অচল থাকলে তা দ্রুত সচল করার জন্যও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ কমিশনের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু প্রস্তুতি চলা মানেই নভেম্বরেই ভোট হবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান চরচাকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া ও নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করে ‘যথাসময়ে’ নির্বাচন ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ-স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরেই নির্বাচন হবে।”
তবে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এই ‘যথাসময়’ নিশ্চিত করতে পারছেন না। তাদের মতে, সময়ের থেকেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এখন। তারা বলছেন, দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নেয়া যায়, তা নিয়েই বেশি ভাবছেন শীর্ষনেতৃত্ব।
নির্বাচনের সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রশ্ন তৈরি করেছে। জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও সুস্পষ্ট সময়সূচির দাবি জানিয়েছে। দলটির অভিযোগ, প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সময় দীর্ঘ হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়াও পিছিয়ে যাবে।
অন্যদিকে স্থানীয় নির্বাচনকে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠপর্যায়ের সংগঠন ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছে। ফলে সময় যত পিছোবে, ততই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ও কৌশল নিয়ে আলোচনা বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কোথায়
এখন পর্যন্ত যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করছে—নভেম্বর-ডিসেম্বরের পরীক্ষা, রমজান ও ঈদ, মার্চ-এপ্রিলের এসএসসি পরীক্ষা, শিক্ষকদের নির্বাচনী দায়িত্ব, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, বাজেট, রাজনৈতিক সংকট এবং সরকারের সঙ্গে ইসির সমন্বয়।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ১২ নভেম্বর থেকে ভোট শুরু করা। কিন্তু সেটি চূড়ান্ত নয়। আবার সরকারও সরাসরি নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। বরং আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনার মাধ্যমে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সময় নির্ধারণের কথাই বলা হচ্ছে।
তাই এখন মূল প্রশ্ন ‘নির্বাচন হবে কি না’ নয়; বরং কোন সময়কে সরকার ও ইসি বাস্তবে নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করে এবং সেই সময়ের সঙ্গে পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পুরো সূচি কীভাবে মেলানো যায়।
এই সমীকরণেই নির্ধারিত হবে- নভেম্বরে ভোটের প্রাথমিক পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ পাবে, নাকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ভোট আরও কয়েক মাস পিছিয়ে যাবে।