ষোল বছর আগের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন বিধিমালায় একগুচ্ছ পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
২০১০ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন বিধিমালায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর সংশোধনী আনে সাংবিধানিক সংস্থাটি। ১৭ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।
এই বিধিমালায় বলা আছে, ইউপি নির্বাচনের প্রার্থী হতে গেলে কী কী করতে হবে।
সংশোধিক বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে প্রার্থীর জামানতে। বলা হয়েছে, প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশর কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে।
সদস্য প্রার্থীর জামানত ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যয়সীমাও চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে ৫ লাখ থেকে বেড়ে ১০ লাখ এবং সদস্যের ক্ষেত্রে ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা হয়েছে।
এছাড়া নতুন বিধানে প্রার্থীর আয়-সম্পদ ও করসংক্রান্ত তথ্য, জামানত, নির্বাচনী ব্যয়, প্রতিবন্ধী ভোটারকে সহায়তা, সমান ভোটে পুনর্নির্বাচন, নির্বাচনী অনিয়মে প্রার্থিতা বাতিল এবং ফল বাতিল করে পুনরায় ভোট নেওয়ার মতো বিষয় যুক্ত হয়েছে।
১৫ শতাংশের কম ভোটে যাবে জামানত
কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ১৫ শতাংশ পেলে তার জামানত ফেরত দেওয়া হবে। এর কম ভোট পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আগে এই সীমা ছিল এক-অষ্টমাংশ বা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। নতুন বিধানে তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
জামানত বাজেয়াপ্ত হলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা তা ইসিকে জানাবেন। আর জামানত ফেরত পাওয়ার যোগ্য প্রার্থী ফল গেজেটে প্রকাশের ছয় মাসের মধ্যে তা না নিলে সেই টাকাও সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
জামানত বাড়ল পাঁচ গুণ
চেয়ারম্যান পদে জামানত ২৫ হাজার এবং সদস্য পদে ৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। ট্রেজারি চালান, পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুকূলে এই টাকা জমা দিতে হবে। আগে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ছিল ৫ হাজার এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীর ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুই ক্ষেত্রেই জামানত পাঁচ গুণ হয়েছে। একই প্রার্থীর পক্ষে একাধিক মনোনয়নপত্র জমা পড়লেও একাধিক জামানত দিতে হবে না।
ব্যয়ের সীমা ১০ ও ২ লাখ
নতুন বিধানে চেয়ারম্যান প্রার্থী সর্বোচ্চ ১০ লাখ এবং সদস্য প্রার্থী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্টকে আলাদা ব্যাংক হিসাব খুলতে হবে। সব ব্যয় ওই হিসাবের মাধ্যমে করতে হবে। ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি ব্যয় চেকের মাধ্যমে পরিশোধের বিধানও রাখা হয়েছে।
আগের বিধিতে চেয়ারম্যানের নির্বাচনী ব্যয়সীমা ছিল ৫ লাখ টাকা এবং ব্যক্তিগত খরচের সীমা ৫০ হাজার টাকা। সদস্যের ক্ষেত্রে নির্বাচনী ব্যয় ১ লাখ ও ব্যক্তিগত খরচ ১০ হাজার টাকা ছিল। নতুন বিধানে ব্যক্তিগত খরচ ও নির্বাচনী ব্যয়ের আলাদা সীমার বদলে একক সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সমান ভোটে আবার ভোট
ভোট গণনার পর দুই বা তার বেশি প্রার্থী সমান সর্বোচ্চ ভোট পেলে তাদের মধ্যে পুনর্নির্বাচন হবে। এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবে ইসি।
আগের বিধিতেও সমান ভোটে পুনর্ভোটের বিধান ছিল। তবে ২০২৩ সালের সংশোধনে তা বদলে লটারির মাধ্যমে ফল নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবার আবার পুনর্নির্বাচনের বিধান ফিরেছে।
মনোনয়নপত্রে আরও তথ্য দিতে হবে
নতুন নিয়মে চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীর আয়, সম্পদ, দায়-দেনা ও অর্থের উৎসের তথ্য দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। দেশে ও বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের বিবরণও দিতে হবে।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদের সত্যায়িত অনুলিপি, টিআইএন সনদ এবং সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন দাখিলের নথি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
২০২৩ সালের সংশোধনে ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর হলফনামা দেওয়ার বিধান যুক্ত হয়েছিল। সেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফৌজদারি মামলা, পেশা, আয়ের উৎস এবং নিজের ও নির্ভরশীলদের সম্পদ-দায়ের তথ্য দিতে হতো। এবার করসংক্রান্ত নথিও মনোনয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা হল।
প্রতিবন্ধী ভোটারকে সহায়তায় নতুন শর্ত
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নিজে ব্যালটে চিহ্ন দিতে না পারা ভোটার একজন সহায়তাকারী নিতে পারবেন। সহায়তাকারীর বয়স ২১ বছরের বেশি হতে হবে। তিনি প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হতে পারবেন না।
আগের বিধিতেও ২১ বছর বয়সী সহায়তাকারীর ব্যবস্থা ছিল এবং প্রার্থী বা এজেন্টকে সহায়তাকারী হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল। এবার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও বাদ দেওয়া হয়েছে।
অনিয়মে প্রার্থিতা বাতিল
কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বিধিমালা লঙ্ঘন করেছেন-এমন তথ্য বা লিখিত প্রতিবেদন পেলে ইসি তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবে। তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে প্রার্থিতা বাতিলের আদেশও দিতে পারবে। প্রার্থীর পক্ষে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কাজ করা ব্যক্তি, সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান বিধি লঙ্ঘন করলেও একই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
আগের বিধিতে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের সময় প্রার্থীর যোগ্যতা বা মনোনয়নপত্রের ত্রুটির কারণে বাতিলের সুযোগ ছিল। তবে নির্বাচনী প্রচার বা কার্যক্রমে প্রার্থী বা তার পক্ষে কাজ করা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের বিধি লঙ্ঘনের কারণে তদন্ত করে প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়টি এভাবে স্পষ্ট ছিল না।
অনিয়মে ফল বাতিল, হবে পুনর্ভোট
কোনো কেন্দ্রে সহিংসতা, ভয়ভীতি, কারচুপি বা অন্য কোনো অনিয়মের কারণে ফল গুরুতরভাবে প্রভাবিত হলে ইসি সেই কেন্দ্রের নির্বাচন বা ফল বাতিল করতে পারবে। তদন্তের পর প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে পুনরায় ভোট নেওয়ার নির্দেশও দিতে পারবে কমিশন।
আগের বিধিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত বা বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় ভোট নেওয়ার সুযোগ ছিল। নতুন বিধানে অনিয়মের কারণে ফল গুরুতরভাবে প্রভাবিত হলে তদন্ত করে ফল বাতিল ও পুনর্ভোটের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।
আচরণবিধি দেখবে মনিটরিং কমিটি
সংশোধিত বিধিমালায় বলা আছে, ভোটের তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচনী আচরণবিধি ও অনিয়ম পর্যবেক্ষণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মনিটরিং কমিটি গঠন করতে পারবে ইসি। আগের বিধিতে এ ধরনের কমিটি গঠনের বিধান ছিল না। বিভিন্ন নির্বাচনে কমিশন প্রশাসনিক নির্দেশনা বা পরিপত্রের মাধ্যমে মনিটরিং টিম করেছে। এবার বিষয়টি সরাসরি বিধিমালায় যুক্ত করা হলো।
বাধা-হুমকিতে শাস্তি
নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে বাধা, ভয়ভীতি বা হুমকি, বলপ্রয়োগ কিংবা ভোটারকে কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। একইভাবে প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র দাখিল বা প্রত্যাহারে বাধা দেওয়া এবং অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী বা পর্যবেক্ষকের কাজে বাধা দেওয়াও এর আওতায় থাকবে। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে ভোট বাতিল নয়
রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বা অন্য কোনো অনুমোদিত ব্যক্তি দায়িত্ব পালনের সময় অনুপস্থিত থাকলেও শুধু সেই কারণে কোনো নির্বাচনী কার্যক্রম অবৈধ হবে না। তবে অনুপস্থিতির বিষয়টি নথিভুক্ত করে ইসিকে জানাতে হবে। নতুন বিধানে এভাবে কর্মকর্তার অনুপস্থিতির প্রভাব এবং তা নথিভুক্ত করার প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা হয়েছে।