স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের বক্তব্য এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতির মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
ইসির খসড়া রোডম্যাপে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এবং অঞ্চলভেদে ভোটের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হলেও সদ্য সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত জুলাই মাসে বলেছিলেন, আগামী বছরের শুরুর দিকে এসব নির্বাচন হবে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ কি আগের পরিকল্পনা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে? নাকি ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনাতেই সময়ের এই পার্থক্য তৈরি হয়েছে?
আজ সোমবার স্থানীর সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচ স্তরের নির্বাচন শেষ করা হবে। প্রতিমন্ত্রী একই সঙ্গে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি এবং অর্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে ভোটের সময় নির্ধারণ করা হবে। অর্থাৎ পাঁচ স্তরের নির্বাচন চলতি অর্থবছরের মধ্যে শেষ করার সরকারি অবস্থান আজ পুনর্ব্যক্ত করা হলেও কোন স্তরের নির্বাচন কখন শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
ইসির সামনে অন্য দুই নির্বাচন?
গত জুনে ইসির পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, আগস্টে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে সেপ্টেম্বরের শেষভাগ বা অক্টোবরের শুরুতে ভোট শুরু করা হতে পারে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদও জানিয়েছিলেন, অক্টোবরের শেষদিকে ভোট আয়োজনের লক্ষ্য থাকলে আগস্টেই তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
তবে ইসি এখন ভিন্ন একটি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রধান কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন।
সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট আয়োজনে যাবতীয় কর্মযজ্ঞ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ইসি।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইসির সামনে একটি উপনির্বাচনের প্রেক্ষাপট হাজির হতে পারে। সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিজয়ী হলে তার সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন পড়বে। সংসদ সদ্যপদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
নতুন কী বললেন প্রতিমন্ত্রী?
আজ সোমবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই পাঁচ স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এসব নির্বাচনের জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে অর্থ রাখা হয়েছে। পাঁচ স্তরের নির্বাচন আয়োজন করতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার কম-বেশি প্রয়োজন হবে বলেও জানান তিনি।
নির্বাচনের সময় নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ও অর্থের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। তার ভাষ্য, ইসির প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা বসে সময় নির্ধারণ করবেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চলতি অর্থবছরের মধ্যেই পাঁচটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করবে সরকার।
ইসির রোডম্যাপে কী আছে
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের বিষয়ে ইসির খসড়া রোডম্যাপে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া, পাবলিক পরীক্ষা ও ধর্মীয় উৎসব বিবেচনায় দেশকে চারটি ক্লাস্টারে ভাগ করেছে কমিশন।
হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চল, নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চল এবং সমতল ও নগরকেন্দ্র—এই চার ভাগে ভোটের সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। রোডম্যাপ অনুযায়ী, হাওর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে ভোট আয়োজনের কথা রয়েছে। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের কিছু অংশ এই ক্লাস্টারে পড়েছে।
পার্বত্য ও উপকূলীয় অঞ্চলে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভোটের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, হাতিয়া ও সন্দ্বীপের মতো দ্বীপাঞ্চল এবং বরিশালের কিছু এলাকা এই তালিকায় রয়েছে।
নদীবেষ্টিত ও চরাঞ্চলের জেলাগুলোতে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ভোট আয়োজনের সময় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও রাজবাড়ী।
আর সমতল ও নগরকেন্দ্রের অন্যান্য বিভাগ, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে বর্ষাকাল ছাড়া যেকোনো সময়ে ভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে।
ইসির পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকারের পাঁচ স্তরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন আগে আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছিলেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা পদাধিকারবলে উপজেলা পরিষদের সদস্য হওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ছাড়া উপজেলা নির্বাচন আয়োজন করা যায় না। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সমান্তরালভাবে করা সম্ভব হলেও জেলা পরিষদ নির্বাচন সবার শেষে করার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে ইসির খসড়া রোডম্যাপে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের কারণ হিসেবে অতীতের নির্বাচনে ধাপগুলোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান কম থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে মনোনয়ন জমা, যাচাই-বাছাই, আপিল, প্রতীক বরাদ্দ, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও ব্যালট পরিবহনে চাপ তৈরি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও দ্রুত এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছিল বলে রোডম্যাপে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করার কাজও এগিয়ে নিয়েছে। গত ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে ভোটকেন্দ্রের বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। খসড়া ভোটকেন্দ্রের তালিকা প্রকাশের পর ২৭ আগস্ট চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিল ইসি। রোডম্যাপে আইন ও বিধি সংশোধনের জন্য ১৫ আগস্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে করণীয় কাজও সেখানে নির্ধারণ করা হয়েছে। আচরণবিধির খসড়াও তৈরি করেছে ইসি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছে। গত ২১ জুলাই কমিশন সুপারিশসহ আচরণবিধিগুলো চূড়ান্ত করেছে।