Advertisement Banner

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সিইসির ‘কপালের ভাঁজ’ দূর হবে?

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সিইসির ‘কপালের ভাঁজ’ দূর হবে?
নির্বাচন কমিশন। ফাইল ছবি

স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন এ বছরের শেষ নাগাদ শুরু হবে বলে গত ২৭ এপ্রিল সংসদে বলেছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

মন্ত্রীর এই ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশনসহ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার ভোট নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে।

যদিও সরকারি দল বিএনপি এখনো এই ভোট নিয়ে দলীয়ভাবে প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা স্তরের শতাধিক প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। জামায়াত জোটের অন্য শরিকরাও প্রস্তুতি শুরুর কথা বলেছে।

যদি এ বছরের শেষের দিকে স্থানীয় সরকারের ভোট শুরু হয়, তাহলে প্রায় দেড় দশক পরে দলীয় প্রতীক ছাড়াই নির্বাচন হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান রেখে আইন সংশোধন করে। দলীয় প্রতীকে ভোট করার বিধান নিয়ে ওই সময় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। ওই বছরই সব শেষ দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কার কমিশন করেছিল, তার মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তবর্তী সরকার।

সেই অধ্যাদেশগুলো ত্রয়োদশ সংসদের অনুমোদনও পেয়েছে। সুতরাং যদি আইনে এ-সংক্রান্ত আর কোনো সংশোধন না হয়, তবে দলীয় প্রতীক ছাড়াই হবে স্থানীয় সরকারের ভোট।

গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তী সরকার স্থানীয় সরকারগুলো ভেঙে দেয়। ওই সরকার পরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন করেনি। দীর্ঘ দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচন হয় না।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে এখন একগুচ্ছ স্থানীয় নির্বাচন, যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। সিটি ও জেলা পরিষদে বিএনপি দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসিয়েছে।

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২১ সালের শুরুতে ধাপে ধাপে পৌরসভা, ২০২১ সালের এপ্রিলে শুরু হয় ধাপে ধাপে ইউপি, ২০২২ সালের অক্টোবরে এক দিনে জেলা পরিষদ এবং ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদের ভোট হয়।

দলীয় প্রতীকে ভোট না হলেও দলগুলোর প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে ‘উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। গতকাল সোমবার এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “গণমাধ্যমে দেখছি, বিভিন্ন দল থেকে অলরেডি মনোনয়নের ঘোষণা দিচ্ছে। এটা আমার জন্য চিন্তার, আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে।”

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয় না, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

সিইসি আরও বলেন, “স্থানীয় নির্বাচন কবে হবে এখনো ফাইনাল হয়নি। নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, আমাদের কিছু বিধিবিধান সংস্কার করতে হবে। এ নিয়ে কাজ শেষ করে আমরা সরকারের সঙ্গে বসব। সরকার তো ঘোষণা দিয়েছে এ বছরের মধ্যে শুরু করবে। এটার জন্য সময় লাগে।”

সিইসি বলেন, “যদি ইনডিপেনডেন্ট হয়ে যেত, পার্টির মালিকানা থাকত না, ওনারশিপ থাকত না, দলে দলে গোলমাল হতো না। এ জন্য মনে করি, দলগুলোর উচিত হবে নিজেরা বসে ফায়সালা করা; আমাদের সহায়তা থাকবে।”

স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ইসি এরই মধ্যে কিছু কাজ শুরু করেছে। গত ১৩ মে এক বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা এবং আচরণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার কাঠামোর জন্য অভিন্ন আচরণবিধি তৈরির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে।

এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহে গত ৭ মে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে ইসি। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, ‘‘সরকারের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমরা বলেছি ৪৫ দিনের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা আইন ও বিধি সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছি। সেটার খসড়া অনুমোদন ও ভেটিং হয়ে আসতে আসতে বছরের শেষ নাগাদ নির্বচানের সম্ভাব্য সময় হতে পারে।’’

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে আইন, বিধিমালা ও আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নিয়েছে ইসি। প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোর মধ্যে প্রার্থীদের জামানতের অঙ্ক বাড়ানো, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে ভোটারদের স্বাক্ষর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান যুক্ত করার বিষয় রয়েছে।

ইসি সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা আচরণবিধি থাকলেও তা একীভূত করে একটি সমন্বিত আচরণবিধি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ইসি এসব সংস্কার হাতে নিয়েছে ঠিকই। সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়াই হচ্ছে সেটা মোটামুটি নির্ধারিত। কিন্তু দলগুলোর আচরণ সিইসির ‘কপালে চিন্তার ভাঁজ’ ফেলেছে বলে খোদ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান জানিয়েছেন। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোকে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সিইসি। দলগুলো এই কাজটা কতটুকু করে সেটাই দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত