Advertisement Banner

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন পথে?

তুহিন কান্তি দাস
তুহিন কান্তি দাস
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কোন পথে?
ছবি: চরচা

গত ১২ মে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনার পরপর আরও কিছু হেনস্তার অভিযোগ তোলে শিক্ষার্থীরা। দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনায় ১৩ মে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার মামলা করেছে।

অন্যদিকে, এই ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়। প্রথমে অভিযুক্তকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেয় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। কিন্তু ঘটনার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এবং সিসি ক্যামেরা ফুটেজ ও স্পষ্ট ছবি থাকা সত্ত্বেও এখনো মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। একে প্রশাসনের ব্যর্থতা বলে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের দাবি করেছে শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা ইসলাম নূর চরচাকে বলেন, “১২ মে থেকে শুরু করে ১৮ তারিখ পর্যন্ত অপরাধীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। প্রশাসন আমাদের জানিয়েছে পুলিশ, র‍্যাব এবং ডিবি সকলে একসাথে কাজ করছে। আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নটা আমরা আসলে দীর্ঘ দিন ধরে তুলে আসছি। ক্যাম্পাসে এত পরিমাণ বহিরাগত আসে, এসে মেয়েদের বাজে কথা বলে যায়। মেয়েদের হলের মধ্যে দেয়াল টপকে ঢুকে যায়। প্রক্টরিয়াল বডি দায়িত্বে আসার পর থেকে ১৯-২০ মাসে ইভটিজিং, হেনস্তা ও নিপীড়নের যতগুলো ঘটনা ঘটেছে কোনোটারই কোনো সুরাহা হয়নি। তাই আমরা প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি করেছি।”

আন্দোলনরত অবস্থায় আমরা দেখি ক্যাম্পাসে হেনস্তার ঘটনা ঘটেই চলেছে। আমাদের প্রথম দাবি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় শিকার করা আমাদের দ্বিতীয় দাবি। কারণ, প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই ঘটনাগুলো ঘটছে। প্রশাসন যদি পোক্ত না হয়, তাহলে এই ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির শাস্তি এবং নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন চলছে, তখনো ঘটেছে হেনস্তার ঘটনা।

আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের একজন নারী শিক্ষার্থী লামিশা জামান প্রক্টর কার্যালয়ে যৌন হামলার শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই শিক্ষার্থী বিচারের দাবিতে লাগাতার অবস্থানে বসেন। লামিশার ভাষ্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা সূত্রে জানা যায়, গত রোববার সন্ধ্যায় দুই ছাত্রীকে গালিগালাজ ও অসংগতিপূর্ণ আচরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী এলাকার এক যুবককে নিরাপত্তা কার্যালয়ে আনেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় ক্যাম্পাসের বটতলা এলাকার ‘পেটুক’ নামক হোটেলের কর্মচারী মো. নাইম ভুক্তভোগী ছাত্রীকে বাজেভাবে স্পর্শ করেন বলেও অভিযোগ ওঠে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে। ছবি: চরচা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে। ছবি: চরচা

আন্দোলনরত এই শিক্ষার্থী চরচাকে বলেন, “একটা মেয়েদের হলের ভেতরে দেয়াল টপকে একটা মানুষ দৌড়াচ্ছে। এর চাইতে ট্রমার বিষয় আর কী হতে পারে। গত একমাসে আমরা এই ক্যাম্পাসে এইরকম অনেক ইস্যু দেখেছি। গত দুই বছরে এই ক্যাম্পাসে ৫/৭ টা লাশ পড়েছে, যদি আমি ভুল না করে থাকি। এই প্রক্টর অফিসে পিটিয়ে একটা মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমি আসলে আন্দোলনকারী থেকে ভুক্তভোগীতে রূপান্তরিত হলাম আজ। ঘটনার পর কারও সাথে আলোচনা বাদ দিয়ে আমি ভিসি স্যারের হাত ধরে বলি, স্যার এই ঘটনায় মামলা হতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় বাদী হয়ে মামলা করবে।”

পরে অভিযুক্ত কর্মচারী নাইমকে আটক করে আশুলিয়া থানায় সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে আশুলিয়া থানায় যৌন হয়রানির মামলা করেছে।

আন্দোলনরত অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিহা বিনতে সামসুদ্দিন চরচাকে বলেন, “আন্দোলনরত অবস্থায় আমরা দেখি ক্যাম্পাসে হেনস্তার ঘটনা ঘটেই চলেছে। আমাদের প্রথম দাবি অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় শিকার করা আমাদের দ্বিতীয় দাবি। কারণ, প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই ঘটনাগুলো ঘটছে। প্রশাসন যদি পোক্ত না হয়, তাহলে এই ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে।”

অন্যদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিকে ‘ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’ বলছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু)।

গতকাল সোমবার এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অভিযুক্তকে শনাক্ত করে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে জাকসু প্রতিনিধিরা ১০ মিনিটের জন্য প্রতীকী অবরোধ করেন ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক।

এ বিষয়ে জাকসুর ভিপি আব্দুর রশিদ জিতু চরচাকে বলেন, “যে দাবিগুলো শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আমরা দেখেছি নিরাপত্তা শাখা এবং প্রক্টরিয়াল টিম সেগুলো নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ঘটনার পর গত দুই-তিন দিনে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো আমাদের নারী শিক্ষার্থীদের হয়রানি করেছে। আমরা দেখছি যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে, সেটির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চাই; একই সাথে নিরাপত্তা সংকটে যে বিষয়গুলো অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেগুলো সমাধান করে একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই। অন্যদিকে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা মহল এই ঘটনাকে পুঁজি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে স্বাভাবিক পরিবেশ আছে, সেটিকে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশকে নষ্ট করে অস্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাচ্ছে।”

ধর্ষণের প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে। ছবি: চরচা
ধর্ষণের প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন চলছে। ছবি: চরচা

তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ‘ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দেওয়ায় জাকসুর দাবিকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ-পরিপন্থী বলছেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী নাজিহা বিনতে শামসুদ্দিন চরচাকে বলেন, “আমাদের আন্দোলনে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে প্রক্টরের পদত্যাগের যে অংশটা, সেটা নিয়ে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের মাঝে মতবিরোধ আছে। কিন্তু আমাদের দাবিটা যে যৌক্তিক না, সে কথা কেউ যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। সুতরাং এইখানে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা বা কোনো ষড়যন্ত্র চলছে–বিষয়টিকে আমরা খুব অবমাননাকর মনে করি। কারণ, আমাদের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একটাই দাবি, নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং যারা নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ তাদের দায় নিতে হবে।”

একজন নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার বিচার চাওয়ার মাঝে অন্য কোনো জিনিসকে সম্পৃক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।

আরেক শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া চরচাকে বলেন, “আমরা সারা দেশে এমন অনেক নারী নির্যাতন ও নিপীড়নের ঘটনা দেখেছি। মামলা হয়, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়, কিন্তু কোনোভাবেই দোষীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। সেই জায়গা থেকে না রাষ্ট্রীয়বাহিনী বা প্রশাসন কাউকেই আমরা ভরসা করতে পারছি না, আস্থা রাখতে পারছি না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, এটা একটা দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের দিকেই মোড় নেবে। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।”

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘যৌক্তিক’ উল্লেখ করে তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আহসান। তিনি চরচাকে বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির রাজধানী। কোনো ধরনের অন্যায়, অপরাধ বা অবিচার হলে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়। নানা জায়গায় এমন হেনস্তার ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেখানে আন্দোলনের পরিবেশ থাকে না। আমি গর্বিত আমাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। তবে এবার যা ঘটেছে, তা অসহনীয়। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট বাহিনী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দেশনা রয়েছে, তারা এই কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করে দেবেন।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে জরুরি প্রশাসনিক সভায় ১৪টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান ভিসি। ক্যাম্পাস অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “একজন নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার বিচার চাওয়ার মাঝে অন্য কোনো জিনিসকে সম্পৃক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।”

সম্পর্কিত