৬০ শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে ২৩ দিনের অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। এর মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া ড. মো. মামুন অর রশিদ হয়েছেন নতুন উপাচার্য। তার নিয়োগ নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলে কী হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই বা কী বলছেন? তিনি কি চলমান সংকট সমাধান করতে পারবেন।
৬০ শিক্ষকের পদোন্নতির দাবিতে ২৩ দিনের অসহযোগ আন্দোলনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলমকে অব্যাহতি দিয়ে সপ্তম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. মামুন অর রশিদ।
গতকাল বৃহস্পতিবার মো. সুলতান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই তথ্য জানানো হয়। আজ শুক্রবার বিকালে নবনিযুক্ত উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল, আন্দোলনরত শিক্ষক, কর্মকর্তা,কর্মচারীরা শুভেচ্ছা বিনিময় করে।
চলমান অস্থিরতা ও প্রশাসনিক সংকটের মধ্যে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মামুন অর রশিদকে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ নবনিযুক্ত উপাচার্যের প্রশংসা করছেন, আবার কেউ পটুয়াখালী থেকে নিয়োগ পাওয়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম ‘লিংকার্স’সহ সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তারা। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গা থেকে নিয়োগ পাওয়া এ উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পারবেন তো–এ প্রশ্ন অধিকাংশ শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত বহুদিন ধরেই। তিনি সেই অচলাবস্থা কাটাতে পারবেন কি না–তা নিয়ে সংশ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
জানা যায়, নতুন ভিসি ড. মো. মামুন অর রশিদ ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি। এ ছাড়া জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন বরিশাল চ্যাপ্টারের মনিটর ও জিয়া পরিষদের বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি।
নতুন উপাচার্যকে নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রাজিব বলছেন, “নবনিযুক্ত ভিসি, যিনি এর আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারারের দায়িত্বে থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। আশা করি, সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবং নিজের এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটগুলোকে মোকাবিলা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আমুল পরিবর্তন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে জায়গা করে নেবেন।”
জাতীয় ছাত্রশক্তির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মো. বেলাল বলেন, “বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসির ইতিহাস যদি আমরা দেখি তাহলে বলতে হয় তেমন ভালো নয়। আমরা জানতাম সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও সরকারদলীয় লোক নিয়োগ হবে। তবে একজন ভিসি হওয়ার জন্য যে ক্রাইটেরিয়া দরকার, তার কতটুকু পূরণ করে তিনি ভিসি হয়ে এসেছে–সেটা দেখার বিষয়। বিভিন্ন সোর্স থেকে যে তথ্য পাচ্ছি, তাতে মন খারাপ হওয়ার মতোই অবস্থা। তারপরেও আমাদের প্রত্যাশা থাকবে দলীয় প্রভাব থেকে বের হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতি হয় এমন পদক্ষেপ যেন তিনি গ্রহণ করেন।”
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রিপন বলেন, “যেখানে ঢাবি, রাবি থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলেও তারা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা সমাধান করতে পারেন না, সেখানে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষক কীভাবে আমাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরাবেন? পবিপ্রবি থেকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে আমাদের সাথে মশকরা করা হয়েছে। ঢাবি থেকে উপাচার্য নিয়োগ দিয়ে অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
নতুন উপাচার্যের যোগদানের সময়। ছবি: চরচাআপ-বাংলাদেশের ববি শাখার আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম বলেন, “আমাদের নতুন ভিসির বিভিন্ন কলুষিত অতীত ইতোমধ্যে আমাদের সামনে আসতে শুরু করেছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। আমরা এমন ব্যক্তিকে আমাদের পবিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে মেনে নিতে পারছি না।”
অপর দিকে ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আশিক আহমেদ বলেন, “আমরা সব সময়ই সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম এবং আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে কেন্দ্র করেই আমাদের সব আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালিত হয়, যা অতীতেও করেছি, ভবিষ্যতেও করে যাব।”
আশিক আহমেদ আরও বলেন, “প্রথম দিনেই যেন তার কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা না হয়, সেটি আমরা চাই। তিনি যেন কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়েন, সে বিষয়ে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।”
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের কারও কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পদোন্নতির দাবিতে চলমান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কোস্টাল এন্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান সহযোগী অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, “আজকে নতুন উপাচার্যের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি বলেছেন, কথা কম কাজ বেশি। কাজের মধ্য দিয়ে তিনি সব কিছু করতে চান। কাল টিচারদের সাথে উপাচার্য বসবেন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, কাজের মধ্য দিয়ে সব কিছুর সমাধান হবে।”
আন্দোলন চলবে কি না–এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আজ রাতে আন্দোলনরত সকল শিক্ষকদের মিটিং হবে। সেখানে সিন্ধান্ত যেটা হবে সেটা আমরা জানিয়ে দেব।”
নতুন উপাচার্য মো. মামুন অর রশিদ বলেন, “আমি আসার পর সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলোচনা হয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এখানেও সরকার নতুন উপাচার্য নিয়োগ দিয়েছে। আন্দোলনের সঙ্গে ভিসি পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষকদের পদোন্নতির বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়। আমি মাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। কাগজপত্র পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানো হবে।”