Advertisement Banner

ডিমের বাজারে অস্থিরতা: উৎপাদন সংকট, নাকি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ

ডিমের বাজারে অস্থিরতা: উৎপাদন সংকট, নাকি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ

এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে ফার্মের ডিমের দাম বেড়েছে। কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে প্রতি ডজন ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকার মধ্যে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা, অভিযোগ।

ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, ডিমের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার ও পোল্ট্রি খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো অভিযোগ-বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেট ও বড় করপোরেট কোম্পানির কৃত্রিম সংকট তৈরির কারণেই দাম বেড়েছে।

কারওয়ান বাজারের ডিম ব্যবসায়ী ফিরোজ আলমের ভাষ্য, খামার থেকে আগের তুলনায় কম ডিম আসছে। কয়েক মাস ধরে কম দামে ডিম বিক্রি করতে গিয়ে অনেক ছোট খামারি লোকসানে পড়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন, অনেকেই উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন। এর প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, অতিরিক্ত গরম, ঝড়-বৃষ্টি এবং মুরগির রোগব্যাধির কারণেও উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি মুরগির খাদ্য ও ওষুধের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে, যা ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে।

পাইকারি ব্যবসায়ী হারুন রশীদের মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিম সরবরাহের কারণে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছে। তার দাবি, প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ডিম স্কুলে যাচ্ছে। এছাড়া মাছ, মাংস ও সবজির দাম বাড়ায় নিম্নআয়ের মানুষ তুলনামূলক সস্তা আমিষ হিসেবে ডিমের দিকে ঝুঁকছেন, ফলে চাহিদা আরও বেড়েছে।

তবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার চরচাকে বলেন, দেশে ডিমের উৎপাদনে কোনো ঘাটতি নেই। দেশে দৈনিক ডিমের চাহিদা প্রায় চার কোটি। উৎপাদন হয় চার থেকে সাড়ে চার কোটি পিস পর্যন্ত।

সুমন হাওলাদার বলেন, গত সাত মাস ধরে প্রান্তিক খামারিরা প্রতি ডিম ৬ থেকে ৭ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন, অথচ উৎপাদন খরচ ছিল ১০ টাকা বা তার বেশি। ফলে প্রতিটি ডিমে ৩ থেকে ৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি লোকসানের কারণে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারি খামার বন্ধ করে দেন।

অভিযোগ করে সুমন হাওলাদার বলেন, তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি ও কয়েকটি বড় করপোরেট কোম্পানি বাজার নিয়ন্ত্রণ করে কম দামে ডিম কিনে মজুত করেছে এবং এখন উচ্চ দামে বাজারে ছাড়ছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত কারণ উৎপাদন সংকট নয়, বরং বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানি বা বিদ্যুতের দাম বাড়লেও তার প্রভাব ডিমপ্রতি ১৫ থেকে ২০ পয়সার বেশি হওয়ার কথা নয়। তার মতে, বাজারে বড় সিন্ডিকেটের প্রভাবই মূল সমস্যা।

ক্যাবের সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইনও একই অভিযোগ তুলে বলেন, বড় করপোরেট খামারগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। তার ভাষায়, বিদ্যুৎ বা লোডশেডিং নয়, বরং বাজার নিয়ন্ত্রণের কারণেই ডিমের দাম বাড়ছে।

বর্তমানে দেশের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা টিকে থাকতে না পারলে পুরো বাজার কয়েকটি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে।

বিপিএ সতর্ক করে বলছে, যদি দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের টিকিয়ে রাখা না যায় তাহলে ভবিষ্যতে পুরো পোল্ট্রি খাত কয়েকটি করপোরেট কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। তখন বাজারে প্রতিযোগিতা থাকবে না এবং একটি ডিমের দাম ভবিষ্যতে ২০ টাকায় পৌঁছানো অসম্ভব নয়।

পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি ও করপোরেট কোম্পানিগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম তদন্ত করতে হবে। ডিম ও মুরগির বাজারে সিন্ডিকেট এবং মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎপাদক খামারিদের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ফিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রান্তিক খামারিদের সহজ শর্তে ঋণ ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের টিকিয়ে রাখতে বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ দিতে হবে।

সম্পর্কিত