Advertisement Banner

ই-লোন: আর্থিক বিপ্লব, নাকি নতুন ঋণফাঁদ?

ই-লোন: আর্থিক বিপ্লব, নাকি নতুন ঋণফাঁদ?
বাংলাদেশ ব্যাংক। ছবি: বাসস

ব্যাংকঋণ নেওয়া মানেই এক ধরনের মানসিক যুদ্ধ। শাখায় লাইনে দাঁড়ানো, বারবার কাগজপত্র জমা দেওয়া, পরিচিত কারও সুপারিশ খোঁজা, কখনো জামানত, কখনো গ্যারান্টর–সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য আনুষ্ঠানিক ঋণ পাওয়া সময়সাপেক্ষ একটি প্রক্রিয়া।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার বা দৈনিক আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি ছিল আরও কঠিন। অনেকেই শেষ পর্যন্ত উচ্চসুদে অনানুষ্ঠানিক ধার বা এনজিওনির্ভর ঋণের দিকে ঝোঁকেন।

তবে বাংলাদেশের আর্থিক খাত এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। স্মার্টফোন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল আইডেন্টিটি এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের ফলে ‘ডিজিটাল ঋণ’ বা ‘ই-লোন’ নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠছে। এখন ধারণা করা হচ্ছে–ভবিষ্যতে ছোট অঙ্কের অনেক ঋণই আর ব্যাংকের কাউন্টারে নয়, বরং মোবাইল স্ক্রিনে অনুমোদিত হবে।

এই পরিবর্তনকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনতেই বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ডিজিটাল লেন্ডিং বা ই-লোন সংক্রান্ত নতুন গাইডলাইন জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষায়, এটি মূলত ‘স্মল ভ্যালু রিটেইল ডিজিটাল লেন্ডিং’ কার্যক্রমের জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো।

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, যেকোনো মোবাইল অ্যাপ নিজে থেকে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। কেবল অনুমোদিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিতে পারবে, প্রয়োজনে ফিনটেক অংশীদারের সহায়তায়।

প্রশ্ন হচ্ছে–এই নতুন ব্যবস্থায় কারা লাভবান হবে? ঝুঁকি কোথায়? আর ভারত ও কেনিয়ার মতো দেশের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশকে কী শিক্ষা দিচ্ছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গাইডলাইন: কী বদলাচ্ছে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং রেগুলেশন অ্যান্ড পলিসি ডিপার্টমেন্ট (বিআরপিডি) ডিজিটাল ঋণ কার্যক্রমের জন্য নতুন যে নির্দেশনা জারি করেছে, তার মূল লক্ষ্য হলো–ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক ছোট ঋণ বিতরণকে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ কাঠামোর মধ্যে আনা।

গাইডলাইনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো হলো-

  • বিষয়: নির্দেশনা
  • সর্বোচ্চ ঋণসীমা: ৫০ হাজার টাকা
  • ঋণের মেয়াদ: সর্বোচ্চ ১২ মাস
  • গ্রাহক যাচাই: বাধ্যতামূলক ই-কেওয়াইসি
  • ক্রেডিট যাচাই: ডিজিটাল সিআইবি চেক
  • পরিচালনা: অনুমোদিত ব্যাংক ও এনবিএফআই

বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, যেকোনো মোবাইল অ্যাপ নিজে থেকে ঋণ বিতরণ করতে পারবে না। কেবল অনুমোদিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই সেবা দিতে পারবে, প্রয়োজনে ফিনটেক অংশীদারের সহায়তায়।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘ডিজিটাল যাচাই’। অর্থাৎ, একজন গ্রাহককে শাখায় গিয়ে ফর্ম পূরণ করতে হবে না; বরং জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, সেলফি ও আর্থিক তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাই হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী এখনো আনুষ্ঠানিক ঋণসেবার বাইরে। ডিজিটাল লোন সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কতটা সতর্ক হাতে নতুন এই ঋণ কার্যক্রম মনিটর করতে পারবে? কারণ আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ডিজিটাল লোন সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত না হলে খুব দ্রুত তা ঋণফাঁদে পরিণত হতে পারে।

মোবাইলে কীভাবে মিলবে লোন

ডিজিটাল ঋণের পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত প্রযুক্তিনির্ভর। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীর জন্য এটি যতটা সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ধরা যাক, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার টাকা প্রয়োজন। তিনি কী করবেন?

ধাপ ১: অনুমোদিত অ্যাপ ব্যবহার

প্রথমে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাপ ব্যবহার করতে হবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ওয়ালেট বা ফিনটেক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এ সেবা পাওয়া যেতে পারে।

ধাপ ২: ই-কেওয়াইসি বা ডিজিটাল পরিচয় যাচাই

এ পর্যায়ে গ্রাহককে কিছু তথ্য দিতে হবে। যেমন–

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর
  • মোবাইল নম্বর
  • লাইভ সেলফি বা ফেস ভেরিফিকেশন
  • কখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তথ্য

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি ও এনআইডি মিলিয়ে পরিচয় যাচাই করবে।

বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং এমএফএস সেবায় ই-কেওয়াইসি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল লোনের ক্ষেত্রেও এই অবকাঠামো কাজে লাগানো হবে।

ধাপ ৩: আর্থিক আচরণ বিশ্লেষণ

এরপর অ্যালগরিদম গ্রাহকের আর্থিক আচরণ বিশ্লেষণ করবে। যেমন-

  • মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন
  • ব্যাংক স্টেটমেন্ট
  • নিয়মিত আয়
  • বিল পরিশোধের ইতিহাস
  • ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহার

এই তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি হবে একটি ‘ডিজিটাল ক্রেডিট প্রোফাইল’।

ধাপ ৪: সিআইবি যাচাই

বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ডেটাবেজ ব্যবহার করে দেখা হবে গ্রাহকের পূর্বের ঋণ পরিস্থিতি। তিনি ঋণখেলাপি কি না, কোথাও বকেয়া আছে কি না–এসব তথ্য ডিজিটালি যাচাই হবে।

ধাপ ৫: অনুমোদন ও অর্থছাড়

সব তথ্য সন্তোষজনক হলে ঋণ অনুমোদন হবে এবং টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ডিজিটাল ওয়ালেটে চলে যাবে। পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শেষ হতে পারে।

কেন ডিজিটাল লোন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার দ্রুত বাড়লেও আনুষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তিতে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা সহজে ব্যাংকঋণ পান না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কয়েক কোটিতে পৌঁছেছে। প্রতিদিন হাজার হাজার কোটি টাকার ডিজিটাল লেনদেন হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

এই বাস্তবতায় ক্ষুদ্র ডিজিটাল ঋণকে অনেক বিশেষজ্ঞ ভবিষ্যতের ব্যাংকিংয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে:

  • ক্ষুদ্র ব্যবসার কার্যকর মূলধন
  • নারী উদ্যোক্তা
  • ফ্রিল্যান্সার
  • গ্রামীণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তি
বাংলাদেশ এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে ডিজিটাল লেন্ডিং বিস্তারের আগে শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল লোন বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের অভিজ্ঞতা: সাফল্যের পাশাপাশি সতর্কবার্তা

ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় ডিজিটাল লেন্ডিংয়ের অন্যতম বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। আধার কার্ডভিত্তিক ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা, ইউপিআই পেমেন্ট সিস্টেম এবং ফিনটেক বিস্তারের ফলে কোটি কোটি মানুষ ডিজিটাল আর্থিক সেবার আওতায় এসেছে।

প্রথম দিকে ডিজিটাল লোনকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল। কারণ, ছোট ব্যবসায়ী বা নিম্ন আয়ের মানুষ খুব দ্রুত ক্ষুদ্রঋণ পেতে শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন পর সমস্যাও সামনে আসে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) দেখতে পায়, শত শত অনিয়ন্ত্রিত থার্ড-পার্টি লোন অ্যাপ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদ নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের কন্টাক্ট লিস্ট, ছবি এবং ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে বকেয়া আদায়ে ভয়ভীতি ও অপমানজনক পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে।

২০২২ সালে আরবিআই ডিজিটাল লেন্ডিংয়ের ওপর কঠোর গাইডলাইন জারি করে। সেখানে বলা হয়–

  • গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি ছাড়া ডেটা সংগ্রহ করা যাবে না
  • ঋণের সব চার্জ আগেই জানাতে হবে
  • ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় স্বচ্ছ হতে হবে

ভারতের অভিজ্ঞতা একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে–ডিজিটাল লোন যত দ্রুত বিস্তৃত হয়, তত দ্রুত শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়।

কেনিয়ার এম-পেসা: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মডেল, আছে ঝুঁকিও

কেনিয়ার এম-পেসা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল ফাইন্যান্স বিপ্লবের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। সাফারিকম পরিচালিত এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কোটি মানুষ প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবার আওতায় আসে।

পরে M-Shwari ও অন্যান্য মোবাইলভিত্তিক ঋণসেবা চালু হলে মানুষ মোবাইল থেকেই দ্রুত ক্ষুদ্রঋণ নিতে শুরু করে।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

তবে সময়ের সঙ্গে কিছু উদ্বেগও সামনে আসে। গবেষণায় দেখা যায়–

  • মানুষ বারবার ছোট ঋণ নিচ্ছে
  • উচ্চ চার্জের কারণে ঋণের চাপ বাড়ছে
  • অনেকের ক্রেডিট স্কোর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে
  • ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ আর্থিক সেবাও সীমিত হয়ে যাচ্ছে

কিছু গবেষক এটিকে ঋণের চক্র বলে উল্লেখ করেছেন। তবে একই সঙ্গে এম-পেসা গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র ব্যবসাকে ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অর্থাৎ, প্রযুক্তি নিজে সমস্যা নয়; মূল বিষয় হলো–নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং ভোক্তা সুরক্ষা।

ডিজিটাল লোনের বড় ঝুঁকি কোথায়?

১. ডেটা প্রাইভেসি ও সাইবার নিরাপত্তা। ডিজিটাল ঋণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা। কারণ, এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর–

  • ফোন নম্বর
  • অবস্থান
  • আর্থিক লেনদেনের তথ্য
  • ডিভাইস তথ্য
  • কখনো কন্টাক্ট লিস্টও সংগ্রহ করতে পারে

যদি পর্যাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশ এখনো পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে ডিজিটাল লেন্ডিং বিস্তারের আগে শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

২. লুকানো চার্জ ও কার্যকর সুদহার

অনেক ডিজিটাল লোন প্ল্যাটফর্ম কম সুদের বিজ্ঞাপন দেয়। কিন্তু বাস্তবে:

  • প্রসেসিং ফি
  • প্ল্যাটফর্ম চার্জ
  • বিলম্ব ফি
  • ডিজিটাল সার্ভিস চার্জ

যোগ হওয়ার পর প্রকৃত ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক গ্রাহক প্রকৃত কার্যকর সুদের হার বুঝতে পারেন না। ফলে ছোট অঙ্কের ঋণও দ্রুত বড় বোঝায় পরিণত হয়।

৩. আগ্রাসী লোন কালেকশন

ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে ডিজিটাল লোন আদায়ে ভয়ভীতি, অপমান ও মানসিক চাপ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে ভোক্তা সুরক্ষা কাঠামো এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

৪. দুর্বল ক্রেডিট স্কোরিং

বাংলাদেশে এখনো বড় অংশের মানুষের আনুষ্ঠানিক ক্রেডিট ইতিহাস নেই। ফলে অ্যালগরিদমভিত্তিক স্কোরিং অনেক ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ফলে হয়তো যোগ্য গ্রাহক ঋণ পাবেন না, আবার ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক অতিরিক্ত ঋণ পেয়ে যেতে পারেন।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ কতটা বড়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ এবং ২০২৭ সালে ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ লক্ষ্য অর্জনে ডিজিটাল ফাইন্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক নীতিমালা থাকলে ডিজিটাল ঋণ দেশের ব্যাংকিং খাতে তিনটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে–

১. আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি। যারা আগে ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিলেন, তারা আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারবেন।

২. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন সহজ হবে। ছোট ব্যবসার কার্যকর মূলধন সংকট কমতে পারে।

৩. নগদনির্ভর অর্থনীতি কমবে। ডিজিটাল লেনদেন ও আনুষ্ঠানিক অর্থপ্রবাহ বাড়বে।

যা যা প্রয়োজন

এ অবস্থায় বেশকিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে–

  • শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা
  • ডেটা সুরক্ষা আইন
  • স্বচ্ছ সুদনীতি
  • কার্যকর গ্রাহক অভিযোগ ব্যবস্থাপনা
  • এবং শক্তিশালী কেন্দ্রীয় তদারকি

বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে–উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া, কিন্তু একইসঙ্গে গ্রাহক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

ই-লোন নেওয়ার আগে যে ৫টি বিষয় অবশ্যই যাচাই করতে হবে

  • প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত কি না
  • অপরিচিত অ্যাপ বা অননুমোদিত প্ল্যাটফর্ম এড়িয়ে চলতে হবে
  • প্রকৃত সুদের হার কত? শুধু বিজ্ঞাপনের সুদ নয়, মোট কত টাকা ফেরত দিতে হবে, তা হিসাব করুন।
  • অতিরিক্ত চার্জ আছে কি না? প্রসেসিং ফি, প্ল্যাটফর্ম চার্জ বা বিলম্ব ফি আছে কি না জেনে নিন।
  • অ্যাপ কী ধরনের তথ্য নিচ্ছে? অপ্রয়োজনীয় পারমিশন চাইলে সতর্ক হোন।
  • কিস্তি সময়মতো পরিশোধ সম্ভব কি না

মনে রাখতে হবে–জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অপ্রয়োজনীয় ঋণ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

ডিজিটাল ঋণ বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য একটি বড় বাঁকবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি যেমন ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত হলে নতুন ধরনের আর্থিক সংকটও তৈরি করতে পারে।

ভারত ও কেনিয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে–প্রযুক্তি যত দ্রুত এগোয়, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকেও তত দ্রুত আধুনিক হতে হয়। অন্যথায় সহজলভ্য ঋণই একসময় সামাজিক ও আর্থিক চাপের উৎস হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ আছে শুরু থেকেই একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল লেন্ডিং ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার।

শেষ পর্যন্ত ই-লোনের সফলতা নির্ভর করবে শুধু প্রযুক্তির ওপর নয়; বরং নীতিনির্ধারণ, তদারকি, আর্থিক সাক্ষরতা এবং সচেতন ব্যবহারকারীর ওপরও।

সম্পর্কিত