খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেন হত্যা মামলায় নতুন মোড় নিয়েছে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত চার আসামির মধ্যে তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও, নির্যাতন পরবর্তী ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি তারা কৌশলগতভাবে গোপন করছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আজমুলকে পিটিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার সত্যতা মিলেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহিম খলিল মাহিমের আদালতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে কৃষি ব্যাংক নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হাবিব রিফাত প্রথম জবানবন্দি দেন। এরপর বুধবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রতাপ সরকার এবং খাজা হলের সামনের ‘মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নার’-এর মালিক তারেক ওরফে রুবেল একই বিচারকের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
তারা তিনজনই আজমুলকে নির্যাতনের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করলেও ছাদ থেকে ফেলে দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। এ নিয়ে হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন জানান, গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে আজমুলকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোড সংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেসে চুরি করে ভাত খাওয়া এবং মোবাইল ও টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে মেস ম্যানেজার মেহেদী, সাবেক ছাত্র হাবিব রিফাত, রুহুল ও রবীনের উপস্থিতিতে জুস বিক্রেতা তারেক ওরফে রুবেল লাঠি দিয়ে তাকে দুই ঘণ্টা ধরে বেধড়ক পেটায়।
নির্যাতন চলাকালে রাত ১১টা থেকে ১টার মধ্যে আজমুলের বাবার কাছে ফোন করে টাকাও দাবি করা হয়। পুলিশের ধারণা, অমানুষিক নির্যাতনের পর আজমুলকে চারতলার ছাদ থেকেই নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে এসআরবি-৬ স্পেশাল কোম্পানি ও ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পের যৌথ অভিযানে বুধবার রাত আড়াইটার দিকে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর এলাকা থেকে এ মামলার আরেক আসামি শেখ আসিফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসিফ খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটি গ্রামের শেখ মিরাজের ছেলে।
এসআরবি-৬ এর অধিনায়ক নিন্তার আহমেদ জানান, আগামী ২০ সেপ্টেম্বর একটি বেসরকারি ব্যাংকে যোগদানের কথা থাকলেও ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আজমুলের মৃত্যুর পর আসিফ আত্মগোপনে চলে যান। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ জানান, আজমুলকে চারতলার ছাদে আটকে রেখে ভাত, মোবাইল ও টাকা চুরির মিথ্যা কথা স্বীকার করাতে বাধ্য করা হয় এবং সেই স্বীকারোক্তির ভিডিও ধারণ করা হয়। পুলিশে দেওয়ার হুমকি দিলে ভয়ে আজমুল চারতলা থেকে তিনতলার ছাদে লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে যান। তবে আসিফের এ দাবির সত্যতা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। আসিফ আরও জানান, আজমুলকে হত্যার উদ্দেশ্য না থাকলেও মেস ম্যানেজার মেহেদী, ব্যাংক কর্মকর্তা হাবিব রিফাত ও জুস বিক্রেতা রুবেল তাকে মারধরে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ভাত চুরির অপবাদে আজমুলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে দাবি করে গত শনিবার রাতে আয়মানের বাবা কুতুবউদ্দিন বাদী হয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাতপরিচয় ২০-২৫ জনকে আসামি করে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে এ পর্যন্ত প্রাক্তন তিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও এক জুস বিক্রেতাসহ মোট ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক মেস ম্যানেজার মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে পুলিশ।