১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে। এর ফলে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা নতুন করে গতি পাচ্ছে। জনপরিসরে আলোচনার বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে চুক্তিটি কি কেবল নবায়ন করা হবে, নাকি এতে সংশোধন আনা হবে? কিন্তু এর চেয়েও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নতুন চুক্তিটির রূপ ঠিক কেমন হবে? কারণ, যে রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালের চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তাই এবারের আলোচনা কেবল ফারাক্কায় পানি বণ্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্তের পর ১৯৯৬ সালের চুক্তির মূল এবং একমাত্র এজেন্ডা ছিল পানি বণ্টন। চুক্তিতে ফারাক্কায় পানির প্রবাহ একটি নির্দিষ্ট সীমার নিচে নেমে গেলে ফিফটি-ফিফটি পানি বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে শুষ্ক মৌসুমে নিজের ন্যায্য হিস্যা না পাওয়া নিয়ে বাংলাদেশ প্রায়শই অসন্তোষ প্রকাশ করে এসেছে।
পরবর্তী গঙ্গা চুক্তিটি কেবল এই একটি নির্দিষ্ট আন্তঃসীমান্ত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি সীমানা ও ভূখণ্ডের গণ্ডি পেরিয়ে আলোচনার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই আলোচনা বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। তবে এটি একই সাথে শক্তিশালী পানি কূটনীতি এবং ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে একটি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ার নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে।
আলোচনার এজেন্ডা বা পরিধি কেন বিস্তৃত হবে, তার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, রাজনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে পড়েছে। কয়েক দশকের দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে যখন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তখন দুই দেশের মধ্যে তুলনামূলকভাবে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক ও অনুকূল রাজনৈতিক মুহূর্ত বিরাজ করছিল। চুক্তিটি মূলত ধারাবাহিক ‘ট্র্যাক ১’ ও ‘ট্র্যাক ২’ (সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের) কূটনৈতিক আলোচনার ফল, যা উভয়ের মধ্যে আস্থা ও সৌহার্দ্য তৈরি করেছিল। কিন্তু আজ, কূটনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণও এই আলোচনাকে সমানভাবে প্রভাবিত করবে। ঢাকা সরকারের জন্য দেশে বিদ্যমান ভারত-বিরোধী মনোভাব সামলে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হবে। একইভাবে, ভারতেও গঙ্গা পানি বণ্টন নিয়ে রাজ্যস্তরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কম জটিল নয়। পশ্চিমবঙ্গ তাদের নিজস্ব প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে আপত্তি তুলছে, অন্যদিকে ফারাক্কার উজানে পলি জমার কারণে বন্যা হচ্ছে—এমন অভিযোগ এনে বিহারও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, এজেন্ডা এখন আর কেবল ফারাক্কার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম প্রধান উত্তেজনার কারণ ‘তিস্তা’ নদী ছাড়াও, গত তিন দশকে অন্যান্য যৌথ নদীগুলো নিয়ে তৈরি হওয়া মতপার্থক্যগুলোও এই আলোচনায় প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া, বিষয়টি কেবল পানি সম্পদের উন্নয়ন ও বণ্টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তার কারণে পানি-সংক্রান্ত ক্রমবর্ধমান ঝুঁকিগুলোর দিকেও আলোচনার পরিধি বিস্তৃত হবে। জলবায়ু পরিবর্তন দুই দেশের পানি বণ্টনের গণ্ডি পেরিয়ে হিমালয়ের হিমবাহ ব্যবস্থাপনা, চরম আবহাওয়া ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা এবং যৌথ ঝুঁকি মোকাবিলার মতো আঞ্চলিক বা সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনগুলো আলোচনার ক্ষেত্রে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবসম্মত ইঙ্গিত বহন করে।
প্রথমত, রাজনৈতিক ভূগোলবিদরা যাকে টেরিটোরিয়াল ট্র্যাপ বা ভূখণ্ডভিত্তিক ফাঁদ বলেন, তা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। অর্থাৎ, আলোচনা কেবল দিল্লি ও ঢাকার দুই সার্বভৌম সরকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এই ধারণাটি ভাঙতে হবে। কারণ, ভারত বা বাংলাদেশ কোনো দেশেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি থেকে পানি কূটনীতিকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ঢাকার ভেতরের রাজনৈতিক বিরোধ বা টানাপোড়েন যেন ভারতের সাথে আলোচনার টেবিলে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সরকারকে সেটাই নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া, আলোচনায় দর কষাকষির কৌশল হিসেবে কেবল কড়া রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ারও একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে।
তিস্তা প্রজেক্টে চীনের আসা নিয়ে ভারত কিছুটা চাপে পড়লেও, এতে নদী আলোচনার মেজাজটাই বদলে যেতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রাপ্তির জায়গাটা কমে যাবে।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: রয়টার্স
ভাটির দেশ হিসেবে ঢাকার দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থ কৌশলগত অবস্থান নেওয়ার চেয়ে বরং একটি স্থিতিশীল সহযোগিতার মাধ্যমেই বেশি সুরক্ষিত হবে।
ভারতের ক্ষেত্রেও সম্প্রতি বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ অনুকূলে থাকলেও, তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজ্য-কূটনীতিতে মনযোগী হতে হবে। রাজ্যগুলোকে একই ফ্রন্টে নিয়ে আসা সহজ হবে না। কারণ পানি একটি সংবেদনশীল বিষয় এবং এটি বিরোধী দলগুলোর জন্য রাজনৈতিকভাবে সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
দ্বিতীয়ত, যৌথ নদীগুলো একে অপরের ওপর অপরিহার্য নির্ভরশীলতা তৈরি করে, যা আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর বিষয়ে একটি কম আলোচিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। যৌথ ঝুঁকি মোকাবিলার সাথে যখন পানি বণ্টনের বিষয়টি যুক্ত হয়, তখন এটি আর ‘জিত-হারের’ হিসাব থাকে না। দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে এই আলোচনার ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক এই নির্ভরশীলতা। আর এই নির্ভরশীলতা সর্বদা কেবল নাও হতে পারে, এটি আঞ্চলিক রূপও নিতে পারে।
‘পারস্পরিক নির্ভরশীলতা’ হিসেবে বিষয়টিকে দেখলে মনোযোগ মূলত যৌথ লাভের দিকে চলে আসে। এর মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মৎস্য সম্পদ রক্ষা, বাণিজ্যের জন্য নৌপথ সচল করা, বন্যার পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি এবং যৌথ পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়ে এমন সব সুবিধা তৈরি করা সম্ভব, যা কেবল পানি বণ্টনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তৃতীয়ত, প্রথম দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কার্যকর উপায় হলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলোতে বিনিয়োগ করা। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আলোচনার অনুকূলে আনতে ভারত ও বাংলাদেশ উভয়কেই উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় জোর দিতে হবে। একই সাথে দ্বিপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
পূর্বে গঠিত ‘যৌথ নদী কমিশন’ কিংবা গঙ্গা চুক্তি বাস্তবায়নের ‘যৌথ কমিটির’ মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান বাস্তবতায় পর্যাপ্ত নয়। কারণ সেগুলোকে চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, অনিশ্চয়তা বা ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য নয়। পানির অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি সামলাতে শক্তিশালী একটি যৌথ কমিশন প্রয়োজন, যা পানি বণ্টন, সঠিক তথ্য আদান-প্রদান, বিবাদ মেটানো এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় দক্ষ হবে।
সবশেষ, ১৯৯৬ সালের চুক্তি বাস্তবায়নে যে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি কাজ করেছিল, উভয় দেশকে তা পুনরায় জাগিয়ে তুলতে হবে এবং সেখানে নতুন করে গুরুত্ব দিতে হবে। এই চুক্তি আলোচনার প্রক্রিয়াটিই সেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হতে পারে। ট্র্যাক ১ বা সরকারি পর্যায়ের কূটনীতির পাশাপাশি, উভয় দেশের উচিত ট্র্যাক ২ (বেসরকারি/বিশেষজ্ঞ পর্যায়) সংলাপে উৎসাহ দেওয়া। এতে নতুন চিন্তাভাবনা তৈরি হবে, সংলাপ বজায় থাকবে এবং আলোচনার সমর্থনে বুদ্ধিভিত্তিক ও রাজনৈতিক একটি ভিত্তি গড়ে উঠবে। ১৯৯৬ সালের চুক্তিটিও এই ধরনের এনগেজমেন্ট থেকে সুবিধা পেয়েছিল (উদাহরণস্বরূপ, সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-সহ একাধিক সংস্থা এই উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল এবং চুক্তির খসড়া তৈরিতে অবদান রেখেছিল)।
সার্ক গঠনের সময় ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে যে আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছিল, এই আলোচনাটি সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে পুনর্বিবেচনা করার একটি অনন্য সুযোগ হতে পারে। সার্ক-এর মাধ্যমে কাজ না হয়ে হয়তো নতুন কোনো উপায়ে হতে পারে, তবে আঞ্চলিকভাবে এক হয়ে কাজ করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে এখন আরও অনেক বেশি। তাই আগামী গঙ্গা চুক্তি মানে কেবল দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগের পুরোনো চুক্তি নবায়ন করা নয়; বরং বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক সংকট ও পরিবেশগত যৌথ ঝুঁকিগুলো একসঙ্গে মোকাবিলার একটি নতুন পথ খোলার সুযোগ।
শ্রীনিবাস চোক্কাকুলা: নয়াদিল্লি সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী
(নিবন্ধটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনূদিত)