Advertisement Banner

পর্ব-১

১০ বছর পর কেমন হবে আমাদের পৃথিবী?

হ্যাল ব্র্যান্ডস
হ্যাল ব্র্যান্ডস
১০ বছর পর কেমন হবে আমাদের পৃথিবী?
প্রতীকী ছবি

১৯৩০ সালে ইতালীয় দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামসি লিখেছিলেন, ‘‘পুরোনো পৃথিবী মারা যাচ্ছে এবং নতুন পৃথিবী জন্ম নেওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।” তার মার্ক্সবাদী বিশ্বাস যা-ই হোক না কেন, গ্রামসি আজকের ট্রাম্পের যুগে বেঁচে থাকলে বেশ পরিচিত পরিবেশই খুঁজে পেতেন। এখানে যে পুরোনো পৃথিবীর কথা বলা হচ্ছে, তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমাদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যা পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধে জয়ের পর তারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল।

সেই ঐতিহাসিক প্রকল্প পৃথিবীতে এক যুগান্তকারী শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্বাধীনতা এনেছিল। অথচ আজ সেই পুরোনো ব্যবস্থার মেয়াদ যেন ফুরিয়ে এসেছে। বহু বছর ধরে সংশোধনবাদী রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে চীন ও রাশিয়া, এই বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে ক্রমাগত দুর্বল করে চলেছে। আর এখন তো মনে হচ্ছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের তৈরি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছে।

আজ থেকে দশ বছর পর এই পৃথিবীটা দেখতে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হবে। তবে আমাদের এই অন্তর্বর্তী সময়ের ওপারে কী অপেক্ষা করছে– সেই নতুন বিশ্ব ঠিক কী রূপ নেবে– তা আমরা এখনো নিশ্চিতভাবে জানি না। প্রথম সম্ভাবনাটি হলো স্নায়ুযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দেওয়া একটি ‘দ্বি-মেরু বিশ্ব’, যেখানে গোটা দুনিয়া ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের নেতৃত্বে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়বে। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি দুটি ব্লকের নয়, বরং কয়েকটি বড় সাম্রাজ্যের উত্থান, যেখানে শক্তিশালী কিছু আঞ্চলিক পরাশক্তি নিজেদের প্রভাব বলয় তৈরি করবে। আর তৃতীয় সম্ভাবনাটি হলো একটি 'স্বনির্ভর কিন্তু অরাজক বিশ্ব' (সেলফ-হেল্প ওয়ার্ল্ড), যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ চরম আক্রমণাত্মক ও শিকারীসুলভ হয়ে উঠবে এবং সমগ্র বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে এক নৈরাজ্যের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করবে।

বর্তমান মুহূর্তটি এতটা বিপজ্জনক মনে হওয়ার কারণ হলো, এই দৃশ্যপটগুলোর প্রতিটিই অত্যন্ত বাস্তবসম্মত এবং প্রতিটি সম্ভাবনাই একটি দ্বিধাদ্বন্দ্বগ্রস্ত পরাশক্তির বৈদেশিক নীতির মধ্যে নিজের পক্ষে যুক্তি খুঁজে পায়। ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াবে তা এখনো অনেক কিছুর ওপর নির্ভরশীল। অনেক কিছুই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে আমেরিকার সিদ্ধান্ত এবং তাদের নির্বাচনী চক্রের ওপর। তবে আমাদের এই রূপান্তরকালীন সময়ের ওপারে কী আছে তা অনুসন্ধান করাই হলো এমন একটি বিশ্বের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ, যা সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করলেও আমাদের ফেলে আসা অতীতের চেয়ে অনেক বেশি খণ্ডিত এবং নির্মম হতে বাধ্য।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

আমাদের সমসাময়িক এই বিশ্ব মূলত আমেরিকারই একটি সৃষ্টি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ইউরেশিয়ার প্রান্তজুড়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এক মিত্রজোট গড়ে তুলেছিল। তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল এবং বিশ্ব বাণিজ্যকে নতুন করে সাজিয়েছিল। দূরবর্তী জলপথগুলোতে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা করা থেকে শুরু করে নানাবিধ বৈশ্বিক জনকল্যাণমূলক সুবিধা নিশ্চিত করেছিল তারাই। জাতিসংঘ নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রই ছিল বিশ্ব সরকারের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি রূপ। এই নীতিগুলোই একটি সমৃদ্ধিশালী পশ্চিমা ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যা পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করে এবং স্নায়ুযুদ্ধের পর একটি সম্প্রসারণশীল উদারনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়।

অবশ্য সব বীরত্বপূর্ণ অর্জনের মতোই এর পেছনেও কিছু মিথ, সত্য গোপন বা অতিরঞ্জন রয়েছে। ওয়াশিংটন কখনো কখনো অ-উদার উপায়ের আশ্রয় নিয়ে এই উদার ব্যবস্থা রক্ষা করেছে– যার মধ্যে রয়েছে নিষ্ঠুর সামরিক হস্তক্ষেপ এবং গোপন রাজনৈতিক চক্রান্ত। মিত্রদের মধ্যকার একতার গল্পগুলো প্রায়শই তাদের তীব্র বিবাদগুলোকে আড়াল করে যায়। যার প্রমাণ ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট থেকে শুরু করে ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ পর্যন্ত দেখা গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র যখনই সুবিধা মনে করেছে, তখনই নিজের তৈরি নিয়ম নিজেই লঙ্ঘন করেছে বা বদলে ফেলেছে, যেমনটা তারা ১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে করেছিল।

ভণ্ডামি আর জোরজুলুম ছাড়া কোনো বৈশ্বিক ব্যবস্থার অস্তিত্ব আসলে ইতিহাসে টিকে থাকেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ‘প্যাক্স অ্যামেরিকানা’ (মার্কিন শান্তি ব্যবস্থা) তার অসাধারণ ক্ষমতাকে মূলত এক ব্যাপক ও দূরদর্শী জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থেই ব্যবহার করেছিল। তাদের এই নীতির মূল কথা ছিল– ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকা তখনই উন্নতি করতে পারবে, যখন সে দুর্বল দেশগুলোর সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইতিহাস পরিবর্তনকারী সুফল এনে দিয়েছিল।

এক প্রজন্মের মধ্যে দুটি বিশ্বযুদ্ধ দেখার পর, আমেরিকার তৈরি এই বিশ্বব্যবস্থা মানবজাতিকে কয়েক দশকের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি উপহার দিয়েছিল। মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনীতি মানুষের জীবনযাত্রার মানকে আকাশচুম্বী করেছিল। মার্কিন প্রভাবের কারণেই বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের আধিপত্য তৈরি হয়েছিল এবং কোনো স্বাধীন দেশের অস্তিত্ব সহিংসভাবে মুছে ফেলার মতো ঘটনা অত্যন্ত বিরল ও হতবাক করার মতো বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। ওয়াশিংটন নিজেও এর থেকে প্রচুর লাভবান হয়েছে। এবং তা কেবল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ ও প্রাণবন্ত যুগে বসবাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং তাদের মিত্রজোট এবং সহযোগিতার নেটওয়ার্কগুলো আমেরিকার অতুলনীয় ক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

তবে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। মার্কিন বিশ্বব্যবস্থা, বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের পর যে আরও বেশি বিশ্বজনীন রূপটি তৈরি হয়েছিল– তা এখন সমাপ্তির দিকে এগিয়ে চলেছে। এই ব্যবস্থাটি বাইরে থেকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হচ্ছে। বেইজিং, মস্কো এবং তাদের সহযোগীরা একে তাদের নিজস্ব উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে একটি বাধা এবং তাদের স্বৈরাচারী শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। তারা ইউরেশীয় মহাদেশজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সমুদ্রের স্বাধীনতা ও সহিংস বিজয়ের নিষেধাজ্ঞার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নিয়মগুলোকে চূর্ণবিচূর্ণ করছে।

এই রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে চীন, একই সাথে ভেতর থেকেও এই ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। বেইজিং বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ নিয়ে এমন এক উৎপাদনশীল ও সামরিক সক্ষমতা তৈরি করেছে, যা তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য ব্যবহার করছে। এরই মধ্যে, খোদ ওয়াশিংটন নিজেই নিজের সৃষ্টির প্রতি ক্লান্ত এবং মারাত্মকভাবে মোহভঙ্গ হয়ে পড়েছে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের জন্ম হয়েছে কিছু বাস্তব সমস্যা থেকে, যেমন মার্কিন মিত্রজোটগুলোর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্যহীনতা এবং অন্যদের বিনা খরচে সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা, বিশ্বায়নের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও শারীরিক নিরাপত্তাহীনতা, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধগুলোর মারাত্মক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এবং যে উপায়ে এই উদার বিশ্বব্যবস্থা চীনের উত্থানকে ত্বরান্বিত করতে সহায়তা করেছিল।

এই অসন্তোষ এখন এমন একটি প্রশাসনের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে, যারা ন্যূনতমভাবে মার্কিন যুক্ততার শর্তাবলিকে আক্রমণাত্মকভাবে পুনর্নির্ধারণ করতে চায় এবং প্রায়শই যুক্তি দেখায় যে মার্কিন ক্ষমতার পুনরুজ্জীবনের জন্য বর্তমান ব্যবস্থাটিকে ভেঙে ফেলা দরকার। আর এ কারণেই আমাদের বর্তমান সময়টা এতটা অস্থির মনে হয়। এখনো ওয়াশিংটনের ক্ষমতা অতুলনীয়। মার্কিন মিত্রজোট এবং জি-৭-এর মতো বিদ্যমান ব্যবস্থার মূল কাঠামোগুলো এখনো অক্ষত আছে। কিন্তু এই ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস অত্যন্ত অন্ধকার, এমনকি হয়তো এর মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। এই মৃত্যুর প্রক্রিয়া যখন সম্পূর্ণ হবে, তখন আসলে কী ঘটবে? (চলবে)

আগামীকাল পড়বেন: যুক্তরাষ্ট্রের ভালো বিকল্প কী চীন-রাশিয়া?

লেখক: জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের একজন সিনিয়র ফেলো

(এই দীর্ঘ নিবন্ধ মূলত ফরেন পলিসি সাময়িকীর স্প্রিং ২০২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সেই সূত্রে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হলো।)

সম্পর্কিত