ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ আবারও তীব্র আকার ধারণ করায় উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এখন ওয়াশিংটনের পরিবর্তে বেইজিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তাদের আশা, ইরানের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে চীন তেহরানকে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দিতে রাজি করাতে পারবে। এতে বোঝা যাবে, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে চীন কতটা সক্ষম এবং কতটা আগ্রহী।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ নিয়ে এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি চরচায় প্রকাশ করা হলো।
উপসাগরীয় দেশগুলোর এই কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান হতাশা। উপসাগরীয় কয়েকটি সূত্রের ভাষ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধে তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং বিভিন্ন মাত্রায় তারাও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইরান ও তার মিত্ররা বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর উপসাগরীয় দেশগুলো বেইজিংয়ের সহায়তা চেয়েছে। তাদের ধারণা, চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট করে তুলেছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই নতুন যুদ্ধবিরতির উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও টেলিফোনে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে চীনের বিশেষ দূত ঝাই জুন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর রাজধানী ও ইরান সফর করে আলোচনা করেছেন।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, “চীন সব পক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রেখেছে এবং যুদ্ধ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।”
চীনের প্রভাব কতটা?
উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল কেনে চীন। একই সঙ্গে ইরানেরও সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার বেইজিং। এই অবস্থান চীনের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি কূটনৈতিক সংবেদনশীলতাও সৃষ্টি করেছে।
উপসাগরীয় এক সূত্র বলেন, “চীন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। তারা আমাদের বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই এ ধরনের বিষয় অত্যন্ত নীরবে ও সতর্কতার সঙ্গে উত্থাপন করা হয়।”
ইরান বলছে, তারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। তেহরানের অভিযোগ, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে।
উপসাগরীয় সরকারগুলোর আশা, চীন শেষ পর্যন্ত ইরানকে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথে আনতে পারবে। তবে তারা এটাও জানে, বেইজিং সাধারণত ধীর ও সতর্কভাবে এগোয়। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়ালে সেটি চীনের কৌশলগত স্বার্থেও যেতে পারে।
পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ চীনের নীতি
২০২২ সালে উপসাগর-চীন শীর্ষ সম্মেলনের পর থেকে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) ছয় সদস্য—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক দ্রুত বেড়েছে। এ বছর রিয়াদে আরেকটি শীর্ষ সম্মেলনের পরিকল্পনা থাকলেও তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তবে তেহরানের নৌপথ-সংক্রান্ত হুমকির প্রকাশ্য বিরোধিতা থেকে বিরত রয়েছে বেইজিং। এতে প্রশ্ন উঠেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল ও জ্বালানি রপ্তানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন আসলে কতদূর যেতে প্রস্তুত।
আরেক উপসাগরীয় সূত্র বলেন, “চীন আরও সক্রিয় হতে এবং সহায়ক ভূমিকা রাখতে চায়। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম, তাদের প্রভাব আরও বেশি হবে। এটি সদিচ্ছার অভাব, নাকি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা—তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পরাশক্তিগুলোর বৃহত্তর হিসাব-নিকাশই প্রাধান্য পায়।”
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হেনরি টুগেনডহাট রয়টার্সকে বলেন, বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য হলো অঞ্চলের সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা। কোনো এক পক্ষের প্রকাশ্য সমর্থন দিয়ে কূটনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি নিতে চায় না তারা।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর চীনের হিসাব শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ওয়াশিংটনের সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়েও বিস্তৃত হয়েছে।
চীনের আলোচনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সূত্র বলেন, “উপসাগরীয় দেশগুলো চীনের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ড্রোন কিনতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে—এমন চীনা প্রভাব তারা কিনতে পারবে না।”
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সি চার দফা প্রস্তাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এ অঞ্চলের দেশগুলোর উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষায় চীন
অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাব বাড়িয়েছে চীন। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঐতিহাসিক সমঝোতায় মধ্যস্থতা করেছিল বেইজিং। এখন সেই উদ্যোগও নতুন পরীক্ষার মুখে।
গত সপ্তাহে রয়টার্সকে পাকিস্তানের তিনটি সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করতে পাকিস্তানকে মধ্যস্থতার ভূমিকা নিতে উৎসাহ দিচ্ছে চীন।
এ সপ্তাহে ছয়টি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছে বেইজিং, যাতে চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজগুলো দক্ষিণ লোহিত সাগরে নিরাপদে চলাচল করতে পারে।
ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক আনা বোরশেভস্কায়া বলেন, এখন পর্যন্ত চীনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দৃশ্যমান ফল হলো শুধু চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর জন্য সীমিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তার ভাষায়, “এর বাইরে চীন আর কী অর্জন করেছে—অথবা করতে চেয়েছে—তা বোঝা কঠিন।”
তিনি বলেন, এই যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বেড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়লেও চীন নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ছাড়ে ইরানি তেল কিনে দীর্ঘদিন ধরেই লাভবান হচ্ছে চীন। একই সঙ্গে দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ, চিপ তৈরির সরঞ্জাম ও স্যাটেলাইট নেভিগেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে ইরানের নিরাপত্তা সক্ষমতাও বাড়িয়েছে। তবে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রকাশ্যে কোনো সামরিক সহায়তা দেয়নি।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চিপ সরঞ্জাম, গোয়েন্দা সহায়তা বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের খবর গণমাধ্যমে এলেও চীন তা বারবার অস্বীকার করেছে। বেইজিংয়ের দাবি, তাদের অবস্থান “স্বচ্ছ ও সরল” এবং তারা “আগুনে ঘি ঢালেনি।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটে চীনের প্রতিক্রিয়া তাদের দীর্ঘদিনের কৌশলেরই প্রতিফলন। পূর্ব এশিয়ার বাইরে কোনো অঞ্চলে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতিতে জড়াতে তারা অনাগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিনির্ভর জোট গড়ার বদলে চীন বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অস্ত্র বিক্রির ভিত্তিতে অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে বেশি আগ্রহী। সামরিক সম্পৃক্ততা সাধারণত তারা নিজেদের নিকটবর্তী এলাকাতেই সীমাবদ্ধ রাখে।
চীনের আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, হুতিদের সঙ্গে বেইজিংয়ের সমঝোতার ফলে চীনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো আপাতত নিরাপদে চলাচল করতে পারছে। তবে এর ফলে সব ধরনের হামলা বন্ধ করার মতো কোনো চাপ তৈরি হয়নি।
সূত্রটি আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মতো উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের কোনো প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি বা আঞ্চলিক নৌপথ রক্ষার সামরিক দায়িত্ব নেই এবং সে ধরনের ভূমিকা নেওয়ারও আগ্রহ তাদের খুব কম।
বেইজিং স্পষ্ট করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে তারা সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত নয় এবং অন্য কোনো পক্ষও তা করতে পারবে বলে তারা মনে করে না। এর পরিবর্তে তারা কূটনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে নিরাপদ ও অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছে।