
সৌদি রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তা খুঁজতে হবে জনগণের শাসনের মধ্যে
নিজেদের উত্তম ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃত ভরসা খুঁজতে হবে আরব সাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতির ওপর।

সার্জ শ্মেম্যান

এতদিনে আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ এবং বিশ্বের বড় একটি অংশের কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আমেরিকা এবং এর আদর্শিক অবস্থান—উভয়ই পরিবর্তিত হয়েছে। এই পরিবর্তনের প্রধান মুখ হলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য সুপরিকল্পিত ও দৃঢ় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি ক্ষোভ ও প্রতিশোধের ওপর ভিত্তি করে নিজের একটি ‘ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক ভাবমূর্তি’ গড়ে তুলেছেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতিটি দিককে চ্যালেঞ্জ করেছেন—মিত্রদের অবজ্ঞা করেছেন আর স্বৈরাচারী শাসকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন।
বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার ভবিষ্যৎ কি তবে এটাই? জনতুষ্টিবাদ, বিদ্বেষ ও খেয়ালের বশবর্তী হয়ে চলা এক ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী, অভদ্র ও অনিশ্চিত পরাশক্তি? নাকি ট্রাম্পের বিদায়ের পর আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারের বিশ্বব্যাপী ধারক হিসেবে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে?
ট্রাম্পের আদর্শে বিশ্বাসী কোনো উত্তরসূরি (যেমন মার্কো রুবিও বা জে ডি ভ্যান্স) যে বর্তমান প্রেসিডেন্টের মতোই খামখেয়ালি, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হবেন—তা কল্পনা করা কঠিন। তবে বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যে অনেক কিছু বদলে গেছে যা কেবল ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা ও তার মিত্রদের গড়ে তোলা সেই উদার, নিয়মভিত্তিক ও মূল্যবোধ-চালিত বিশ্বব্যবস্থা যে পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারবে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।
বার্লিন প্রাচীর পতনের প্রায় চার দশক পর নতুন কিছু বাস্তবতা সামনে এসেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের চেয়েও বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীনের উত্থান; রাশিয়ার একটি ভয়ংকর পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে পুনরুত্থান এবং ইউরোপে তাদের যুদ্ধ শুরু করা; উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বৈশ্বিক পশ্চাদপসরণ—যার নেতৃত্বে রয়েছে খোদ প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র; এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির এমন সব কাজ হাতে তুলে নেওয়া, যা একসময় কেবল মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষেই করা সম্ভব ছিল। বিশ্বায়ন, যা একসময় সীমানাহীন বিশ্ব ও বিশ্বব্যাপী সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা এখন তার অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করেছে: ব্যাপক অভিবাসন, অসমতা, সাইবার অপরাধ এবং মেরুকরণ।
ইতিহাসে সবকিছু নতুন করে শুরু করার কোনো সুযোগ নেই। গত শতাব্দীর সেই সুবিধাজনক দ্বিমেরুভিত্তিক বিশ্বে ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই—ঠিক যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা)-এর মতো বিভ্রান্তিকর ধারণাগুলো বাস্তবে রূপ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিশ্ব এগিয়ে চলেছে।
ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে? তা জানার কোনো উপায় নেই। তবে আমাদের সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলো নিয়ে ভেবে রাখতে হবে, যাতে অন্তত যথাসম্ভব প্রস্তুতি নেওয়া যায়। আমেরিকানদের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যেকোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে তা শুরু হতে হবে আমেরিকান গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবনের মধ্য দিয়ে—যেমনটি চার্লস এ. কাপচান তার ‘ব্রিংগিং অর্ডার টু অ্যানার্কি: গভার্নিং দ্য ওয়ার্ল্ড টু কাম’ (বিশৃঙ্খলায় শৃঙ্খলা আনা: আগামীর বিশ্ব পরিচালনা) বইটিতে যুক্তি দিয়েছেন। যদিও জানুয়ারিতে দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি হয়তো অনেকের মনের কথাই তুলে ধরেছিলেন, যখন তিনি মধ্যম সারির শক্তিধর দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি ‘তৃতীয় পথ’ তৈরির আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবুও উদারতাবিরোধী ও স্বৈরাচারী প্রবণতাকে অর্থবহভাবে উল্টে দেওয়ার জন্য একটি নতুন ও শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা, সম্পদ ও ঐতিহ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
নিচে বর্ণিত পরিস্থিতিগুলো—যা প্রায় এক যুগ পরের সময়কালকে তুলে ধরে—তা এমন সব ব্যক্তিদের সাথে কথোপকথন এবং তাদের লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে, যারা পেশাগতভাবে রাজনীতি ও বিশ্ব পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষণ করেন। এছাড়া, আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাচ্ছি—এ বিষয়ে চিন্তাশীল ব্যক্তিদের মতামতও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এগুলো কোনো বৈজ্ঞানিক বা পূর্ণাঙ্গ পূর্বাভাস নয়, বরং বর্তমানের এই সংকটময় মুহূর্তটি নিয়ে চিন্তাভাবনার একটি প্রয়াস। কারণ, প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ যোগী বেরা একবার বলেছিলেন, “আপনি যদি না জানেন যে আপনি কোথায় যাচ্ছেন, তবে হয়তো আপনি অন্য কোথাও গিয়ে পৌঁছাতে পারেন।”
আমেরিকার প্রত্যাবর্তন
এটি আমাদের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দৃশ্যপট। হোয়াইট হাউসে এমন একজন নেতা ফিরে এসেছেন, যিনি বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন, সৎ প্রশাসন এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই ‘পাহাড়ের ওপর উজ্জ্বল নগরী’ হিসেবে নিজের হারানো অবস্থানে ফিরে আসার পথে যাত্রা শুরু করেছে।
ইউরোপীয়রা নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে কাঁধে তুলে নিয়েছে এবং সতর্কতার সঙ্গে হলেও, যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বন্ধু ও মিত্র হিসেবে মেনে নিতে শুরু করেছে। ভ্লাদিমির পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন এবং ইউক্রেনের সঙ্গে সংঘাত স্থিমিত হয়ে পড়েছে; এর ফলে ইউক্রেন দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ঘটাতে পারছে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেলেও সামরিক দিক থেকে তা পারেনি। এই দুই পরাশক্তি এখন সংঘাত এড়িয়ে চলার এবং সহাবস্থানের একটি উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
জাতিসংঘ নতুন প্রাণশক্তি ও ক্ষমতায় ফিরে এসেছে—ওয়াশিংটন এখন আর একে দুর্বল করার চেষ্টা করছে না। সংস্থাটি জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধনী দেশগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা প্রদান করলে তা স্থিতিশীলতা আনে, প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে এবং মানুষের দুর্ভোগ কমায়—সেই ধারণাটি আবারও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ট্রাম্পের আমলে বৈদেশিক সহায়তা কেবল একটি লেনদেনের হাতিয়ার বা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতো; সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।
ক্ষমতা ছাড়ার আগে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেন এবং একে বিজয় হিসেবে অভিহিত করেন—যদিও তেহরানে তখনো মোল্লাতন্ত্র বহাল ছিল এবং তাদের পারমাণবিক জ্বালানিও তাদের কাছেই থেকে যায়। তবে অন্তত মধ্যপ্রাচ্যে এখন শান্তি বিরাজ করছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায়, ওয়াশিংটনের নতুন প্রশাসন ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নতুন করে শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর সুযোগ পেয়েছে।
নিজের ঘর গুছিয়ে নেওয়ার পর এবং গণতান্ত্রিক মিত্রদের পাশে নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বকে একটি নতুন ব্যবস্থার দিকে পরিচালিত করার অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বায়ন, মুক্ত বাণিজ্য, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও উদার গণতন্ত্রের সুফল নিয়ে আগে যে ধারণাগুলো ধ্রুব সত্য বলে মনে করা হতো, তার বদলে আজ এক খণ্ডিত বিশ্ব তৈরি হয়েছে। এখানে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র প্রভাব ও মর্যাদার জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। তবে একই সঙ্গে, যেমনটি কুপচান লিখেছেন, এই বিশ্ব বিংশ শতাব্দীর তুলনায় অনেক বেশি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ও পরস্পর নির্ভরশীল। বিশ্ব শাসনের একটি নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করেছে—সম্ভবত কুপচানের কল্পনার মতোই—যেখানে প্রধান শক্তিগুলো একটি বৈশ্বিক ঐক্যের মাধ্যমে শান্তি ও সহযোগিতা বজায় রাখবে, পাশাপাশি এই জটিল বিশ্বের আদর্শগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকেও স্বীকার করে নেবে।
এই ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমেরিকার পুনরুত্থান। ‘মাগা’ যুগে আমেরিকান আদর্শের অবক্ষয় যতই গভীর হোক না কেন, শক্তি, সম্পদ, অন্তর্নিহিত মূল্যবোধ এবং গুরুতর ব্যর্থতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র আজও অনন্য। ‘সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট’—এই ধারণার পরিধিতে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করতে ৮৭ বছর সময় লেগেছিল, যার জন্য একটি নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। আর সেই ধারণাকে আইনে রূপান্তর করতে লেগেছিল আরও এক শতাব্দী। নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছেন মাত্র ১০০ বছরের কিছু বেশি সময় আগে এবং সমতার লড়াই এখনো শেষ হয়নি। তবুও, আব্রাহাম লিঙ্কনের ভাষায় বলতে গেলে, আমেরিকা বারবার ‘স্বাধীনতার এক নতুন জন্ম’ লাভে সফল হয়েছে এবং আবারও তা করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
আমরা কোনোমতে এগিয়ে চলি
আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যতের এই সংস্করণে, পৃথিবী অনেকটা বর্তমানের মতোই চলতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক তুলে নেয় এবং মিত্রদের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করে। তবে, মার্কিন রাজনীতিতে গভীর মেরুকরণ অব্যাহত থাকে, যা সরকারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ক্রমাগত উত্তেজনার জন্ম দেয় এবং নির্বাহী বিভাগকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও সামরিক শক্তি এখনো ভীতি ও শ্রদ্ধার উদ্রেক করে। কিন্তু ট্রাম্প ও বাইডেন প্রশাসনের নানা উত্থান-পতনের পর—ইউরোপ ও কানাডাসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এখন আর যুক্তরাষ্ট্রকে গণতন্ত্রের আদর্শ বা নৈতিক নেতা হিসেবে গণ্য করে না। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক জোট গঠন করতে থাকে এবং বাণিজ্য ও নিরাপত্তার প্রয়োজনে ক্রমশ চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
চীন অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যায় এবং সামরিক দিক থেকেও তাদের কাছাকাছি চলে আসে। বেইজিং ইউরোপ ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করে এবং তাইওয়ানের ওপর চাপ বাড়ায়। তবে তারা এমন কোনো সংঘাত এড়িয়ে চলে যা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়ার কারণ হতে পারে। ভারত, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার মতো একসময়ের উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রথম সারির শক্তির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। কিন্তু বিশ্ব কীভাবে সম্মিলিতভাবে কাজ করবে—সে বিষয়ে তাদের কোনো অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে, ক্ষমতা ছাড়ার আগে ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে একটি সমঝোতার পথ খুঁজে পান, যার ফলে হরমুজ প্রণালিতে চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়। তবে ইরানে মোল্লাতন্ত্র ক্ষমতায় টিকে থাকে এবং তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে যায়। নেতানিয়াহু ক্ষমতা থেকে সরে গেলেও গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে থাকে; আর পশ্চিম তীরে নতুন নতুন ইসরায়েলি বসতি ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। রাশিয়ায় পুতিনকে ক্ষমতাচ্যুত করে ‘সিলোভিকি’ বা সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একটি গোষ্ঠী—যাদের সহায়তায় তিনি শাসন করতেন—ক্ষমতা দখল করে নেয়। তবে ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধটি এক দীর্ঘস্থায়ী, অমিমাংসিত অচলাবস্থায় রয়ে যায়। ইউরোপ নিজের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে কাঁধে তুলে নেয়। কিন্তু চীন, রাশিয়া কিংবা বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর মোকাবিলায় তারা কোনো ঐক্যবদ্ধ কৌশল খুঁজে পেতে হিমশিম খায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কাজগুলো বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি বা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছাড়াই ধীরগতিতে ও বিচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতো এর প্রধান সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বড় একটি অংশের কাছে সন্দেহের তালিকায় থেকে যায়, যার ফলে তাদের কার্যক্রম ও অর্থায়নের পরিধি সীমিত হয়ে পড়ে। বিশ্বজুড়ে মোটামুটি শান্তি বজায় থাকলেও, চীনের দ্রুত শক্তি সঞ্চয়ের কারণে যেকোনো মুহূর্তে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।
অবারিত অবক্ষয়
এখানে, মেরুকরণ ও পারস্পরিক দোষারোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্র অচল হয়ে পড়েছে। শুল্ক যুদ্ধ ও পারস্পরিক বিদ্বেষের ঘূর্ণাবর্তে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অন্যান্য জোট তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে। জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কারণ উত্তর ও দক্ষিণের দেশগুলো নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের সন্ধানে নতুন নতুন জোট ও বাণিজ্যিক ব্লকের দিকে ঝুঁকেছে। বেইজিং কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক প্রতিরোধ ছাড়াই তাইওয়ানকে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। কিন্তু একই সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধিও থমকে দাঁড়িয়েছে—যার ফলে বিশ্ব এখন কোনো একক প্রভাবশালী কেন্দ্রহীন অবস্থায় পড়েছে। নিয়ন্ত্রনহীন এআই নতুন নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অননুমোদিত অনুপ্রবেশ ও হামলা, ভুল তথ্যের ব্যাপক বিস্তার, অগণিত মানুষের কর্মসংস্থান হারানো এবং সাইবার যুদ্ধের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক অগ্রগতি।

অন্যান্য জাতির অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে এবং অভ্যন্তরীণ ধ্বংসাত্মক দ্বন্দ্বে আটকা পড়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বিশ্বের জন্ম দিয়েছে, যা গভীরভাবে খণ্ডিত ও অস্থিতিশীল। আর এই বিশ্ব চীনের দাবির মুখে ক্রমশ আরও অসহায় হয়ে পড়ছে। বিদেশিদের প্রতি ঘৃণা (জেনোফোবিয়া) এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো ক্ষোভগুলো স্থানীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল উপাদানে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ককেশাস, বলকান অঞ্চল, হর্ন অব আফ্রিকা এবং আরও অনেক জায়গায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে উস্কানিদাতারা বিদ্বেষের আগুন আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অবারিত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বিশ্বজুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে—নিউইয়র্কের বাউরি এলাকায় সমুদ্রের পানি ঢুকে পড়া থেকে শুরু করে আফ্রিকা ও এশিয়ায় বন্যা ও খরার মতো বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, যা ব্যাপক অভিবাসন ও নতুন নতুন সংঘাতের সূত্রপাত ঘটিয়েছে। জোট ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পুরোপুরি ভেঙে পড়ার ফলে বিশ্ব এখন দুর্ভিক্ষ থেকে শুরু করে যুদ্ধের মতো ইতিহাসের ভয়াবহ অভিশাপগুলোর মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর কারণে রাশিয়া এখন ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কৌশলগত পারমাণবিক হামলার হুমকি দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা বজায় থাকায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল অনিয়মিত ও বিপজ্জনক হয়ে পড়েছে। এর ফলে তেলের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনে জ্বালানি, পরিবহন ও খাদ্যব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে চরম দুর্দশা বয়ে আনছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। ইসরায়েল ও অধিকৃত অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাসী হামলার সংখ্যা বেড়ে গেছে এবং পুরো অঞ্চলটি যুদ্ধের হুমকির মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া কিংবা ইউরোপের মতো—মহাশক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের সম্ভাবনা কমই থাকে। কারণ এ ধরনের সংঘাত সাধারণত ঐতিহাসিক অবিচার, কৃত্রিম সংকট বা আঞ্চলিক সীমানা নিয়ে হয়ে থাকে। তবে আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি সবসময়ই থেকে যায়। ক্ষমতায় থাকা স্বৈরাচারী শাসকরা নিজেদের জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানোর জন্য সংঘাতকে ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেন না।
বিশ্ব এক অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গা হয়ে উঠেছে, আর সেই অন্ধকারে আলো দেখানোর মতো অবস্থানে আমেরিকা এখন আর নেই।
অবশ্য আগামী বছর বা দশকগুলোতে পরিস্থিতি অন্য যেকোনো দিকে মোড় নিতে পারে—এমন সম্ভাবনা অগণিত। আমাদের মহান আমেরিকান চিন্তাবিদের ভাষায়, “ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন, বিশেষ করে ভবিষ্যতের বিষয়ে।”
বিপদগুলো বিশাল, তবে ভবিষ্যৎ যে কেবল দুঃসহ বা অন্ধকারাচ্ছন্নই হবে, তা কিন্তু নয়। পুরোনো উদারনৈতিক ব্যবস্থাকে যেভাবে দেখা হোক না কেন, এর অর্জনগুলোকে অস্বীকার করা যায় না—আবার এগুলোকে চাইলেই দ্রুত মুছে ফেলাও সম্ভব নয়। স্বৈরতন্ত্রের বিস্তার ঘটলেও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এখনো প্রবল। ইউক্রেনীয়রা মুক্ত থাকার ক্ষেত্রে অসাধারণ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। আমেরিকার বিচারকেরা এখনো প্রায়শই ট্রাম্পের আইনকে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। সারা বিশ্বের সাংবাদিকরা সত্য তুলে ধরতে গিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা, এমনকি জীবনকেও বাজি রাখেন। কোনো বিপর্যয় ঘটলে দেশগুলো এখনো একে অপরকে সহায়তায় এগিয়ে আসে—যেমনটা দেখা গিয়েছিল আগস্ট মাসে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যার সময়।
নির্বাচনের মাধ্যমে চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়া প্রবণতাকে উল্টে দেওয়া সম্ভব। যেমনটা পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিতে দেখা গেছে। আবার নির্বাচন সতর্কবার্তাও বয়ে আনতে পারে—যেমনটি দেখা গেছে জার্মানির সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনে ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) দলের উত্থানের ক্ষেত্রে। আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন সারা বিশ্বের নজর কাড়বে, আর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন তো আরও বেশি গুরুত্ব পাবে।
একটি স্তোত্রের ভাষায়, মানবজাতির ভাগ্য এখনো নির্ভর করে মানুষ ও জাতিগুলোর নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর—যেখানে তারা ‘সত্য ও মিথ্যার সংঘাতের’ মাঝে দাঁড়িয়ে কোনো একটি পথ বেছে নেয়। তারা যে সবসময় ভুল সিদ্ধান্তই নেয়, তা কিন্তু নয়। আসল কথা হলো, সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি দেরি করা উচিত নয়।
লেখক: কলাম লেখক এবং ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর মস্কো, বন ও জেরুজালেম ব্যুরোর সাবেক প্রধান।
(এই লেখাটি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)

সৌদি রাজতন্ত্রকে নিরাপত্তা খুঁজতে হবে জনগণের শাসনের মধ্যে
নিজেদের উত্তম ভবিষ্যতের জন্য প্রকৃত ভরসা খুঁজতে হবে আরব সাগর, লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগর অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতির ওপর।

মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্যই ইশরাকের পদত্যাগ!
প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র উঁচিয়ে যদি মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কি রিপাবলিকানদের জন্য অন্ধকার দিন অপেক্ষা করছে?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসা করতেই হয়। তিনি ডেমোক্র্যাটদের ক্ষুব্ধ করেছেন, নিরপেক্ষ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছেন, আর এখন—সব মিলিয়ে—রিপাবলিকানদেরও বিরক্ত করে তুলেছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকতে, এটি খুব একটা বুদ্ধিদীপ্ত রাজনৈতিক কৌশল নয়।

জয়তু দেবী দুর্গা
বাংলাদেশে মাতৃপূজার যে বিচিত্র রূপ আছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে মাতৃদেবীর মধ্যে বহু যুগের বহু ধারা এসে মিশেছে। অনেক প্রাচীন ধারা মূল আমরা বেদের মধ্যেই লক্ষ্য করতে পারি।