যে রাশিয়ার ওপর বছরের পর বছর ধরে নানান নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে, গত মাসেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলোর ওপরই যেখানে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, সেই রাশিয়ার কাছ থেকেই এবার ডিজেল সরবরাহের চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র!
দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য কমাতে রাশিয়ার মজুত থেকে ডিজেল সরবরাহের একটি চুক্তিতে তিনি সম্মত হয়েছেন। এই ঘোষণার সময়টাও নজরে রাখার মতো–নভেম্বরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কিনা!
তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি দিয়ে সারা বিশ্বে চলমান জ্বালানিসংকট খুব একটা কমানো যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিলেও ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কিনতে রাজি হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে বিশ্লেষকদের অনেকের।
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর চার বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর। গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে, যে নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা দেশগুলো। এর মধ্যেই এল ট্রাম্পের দিক থেকে চুক্তির ঘোষণা। কিন্তু চুক্তিটাতে আসলে কী আছে, এর প্রতিক্রিয়া কী, উদ্দেশ্যই-বা কী, এই চুক্তির কারণে আসলে কী হবে, রাশিয়ার এই তেল সরবরাহ করার ক্ষমতাও আছে কি না–এ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছে আল জাজিরা।
পুতিন-ট্রাম্পের চুক্তিটা কী নিয়ে?
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ‘অত্যন্ত সফল আলোচনা’র পর একটি সমঝোতা হয়েছে তার। এর আওতায় রাশিয়া ‘অবিলম্বে’ যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন ডিজেল বাজারে ছাড়বে রাশিয়া। এরপর ১০ লাখ টন; তবে সেটা কখন ছাড়া হবে, সে সময় নির্দিষ্ট করে বলেননি ট্রাম্প–শুধু বলেছেন “পরবর্তী কোনো এক সময়ে।” যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট আরও বলেছেন, রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দেশটি পরে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের পর থেকেই তো হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রেরই নিয়ন্ত্রণ আছে বলে দাবি করে আসছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণায়ও বলছেন, এই উদ্যোগের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে’র কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ডিজেলের দাম কমবে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমেরিকানদের জন্য–বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
শুক্রবার হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় চুক্তির জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প, “সত্যি বলতে, আমাদের দেশে বিপুল পরিমাণ তেল আসছে। আর আমাদের যে জিনিসটা দরকার, সেটা হলো ডিজেল।”
শুক্রবার দেওয়া এক বিবৃতিতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনও বলেছেন, রাশিয়া “যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এবং সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক বাজারে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহে নিজেদের আগ্রহের কথা নিশ্চিত করছে।”
বিশ্বজুড়ে ডিজেলসংকট কেন?
একদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ, অন্যদিকে চার বছর পার করে ফেলা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ…দুই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। শুধু হরমুজেই এই যুদ্ধের প্রভাব এখন আর সীমিত নয়, ক্রমেই আয়তক্ষেত্র বাড়াতে থাকা এই যুদ্ধের প্রভাবে সম্প্রতি বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়েও জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলাও তেল পরিবহনে চাপ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে রাশিয়া ও ইউক্রেন–দুই দেশই একে অন্যের তেল শোধনাগার, জ্বালানি স্থাপনা ও বন্দরগুলোতে ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে।
দুই দিকের চাপে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির মজুত দ্রুত কমছে। সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ–দুই জায়গাতেই ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
ট্রাম্পের চাপেই গত সপ্তাহে ধনী সাত দেশের জোট ‘জি-৭’-এর সদস্যরা তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়তে রাজি হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও একই চাপ তৈরি করেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জলবায়ু ও পণ্যবাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন গত সপ্তাহে আল জাজিরাকে বলেন, জি-৭-এর এই উদ্যোগের প্রভাব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কারণ, সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলায় এটি কেবল একটি সাময়িক সমাধান।
ডিজেলসংকট যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?
যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম বাড়তে বাড়তে সেপ্টেম্বরে প্রতি গ্যালনের দাম রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছায়। এক বছর আগের তুলনায় এই দাম দ্বিগুণেরও বেশি। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশটিতে ডিজেলের প্রতি গ্যালনের গড় দাম ৬ দশমিক ২০ ডলার।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির ডিজেলের মজুত দ্রুত কমেছে। শোধনাগারগুলো উৎপাদন বাড়ালেও মজুত এখনো স্বাভাবিক মাত্রার নিচেই আছে।
জ্বালানি তেল উত্তোলন যন্ত্র। ছবি: রয়টার্স
এমন অবস্থায় ভোক্তাদের জন্য দাম কমানোর লক্ষ্যে গত সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা এবং ট্রাম্প নিজেও ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করার কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদনসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান ট্রাম্প। এমনকি ট্রাম্প তখন এমন কথাও বলেছেন যে, এ বছর রাশিয়ার জ্বালানি খাতে হামলা বাড়িয়ে ইউক্রেনই ডিজেলের সংকট তৈরি করছে। তবে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তখন কিছু বলেননি যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ডিজেলের দাম কমানো নিয়ে ট্রাম্প বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার নিচের দিকে। ট্রাম্পের ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ সমর্থকগোষ্ঠীর অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও সাশ্রয়ী দামের ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল।
ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরও। ট্রাকচালকেরা ডিজেল ব্যবহার করে খাবারসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন করেন। কৃষকেরাও কৃষিকাজের যন্ত্রপাতি চালাতে ডিজেলের ওপর নির্ভর করেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, নিবন্ধিত ভোটারদের ৮৪ শতাংশের কাছে অর্থনীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
আইওয়া ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যগুলো সাধারণত ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে এসব অঙ্গরাজ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে রিপাবলিকানদের পরাজয় এড়াতে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার তাহলে কী হবে?
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সে সময়ের যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও গ্যাস আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেন। গত মাসে কংগ্রেসে পাস হওয়া এবং ট্রাম্পের স্বাক্ষর করা একটি নিষেধাজ্ঞায়ও রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনা দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই আইন বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়িয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর চাপ বাড়াতে এতে রাশিয়ার জ্বালানি বাণিজ্যে সহায়তাকারী কর্মকর্তা, ব্যাংক ও গোপনে পরিচালিত তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সবচেয়ে বড় পাঁচ আমদানিকারক দেশের পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতাও ট্রাম্পকে দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফাইল ছবি: রয়টার্স
শুক্রবার ট্রাম্পের ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, বিশ্বের বাজারগুলোতে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের অনুমতি দিতে শিগগিরই একটি ‘সাময়িক সাধারণ লাইসেন্স’ জারি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (ওএফএসি)।
রাশিয়ার নিজেরই কি জ্বালানিসংকট নেই?
হ্যাঁ, রাশিয়াও জ্বালানিসংকটে ভুগছে। এ কারণে ট্রাম্প যে পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের কথা বলেছেন, রাশিয়ার পক্ষে তা দেওয়া সম্ভব হবে কি না–এ নিয়ে সংশয় আছে অনেক বিশ্লেষকের।
নিল অ্যাটকিনসন আগে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তেলশিল্প ও বাজার বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এই চুক্তিতে ডিজেল সরবরাহের যে পরিমাণ ঠিক করে দেওয়া হয়েছে, এত অল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়া কীভাবে এত তেল সরবরাহ করবে, এই হিসাব মেলানো কঠিন। দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ না কমালে এটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।”
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিজেল রপ্তানিকারক ছিল রাশিয়া। কিন্তু চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে রাশিয়ার ডিজেল ও গ্যাস রপ্তানির পরিমাণ কমে দৈনিক ১ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা ছিল দৈনিক ৬ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল, আর প্রথম প্রান্তিকে ছিল ৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল।
অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে রাশিয়া গত জুলাইয়ে ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধও করে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো হয় অক্টোবরের শেষ নাগাদ।
ইউক্রেনের হামলাও রাশিয়ার জ্বালানিসংকট বাড়িয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইউক্রেনের হামলার কারণে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পুতিন।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, তাদের বিমান হামলায় রাশিয়ার অর্ধেকের বেশি তেল শোধন সক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া জুলাইয়ে আজভ সাগর ও কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার ছায়া নৌবহরের কয়েক শ জাহাজেও হামলা চালায় ইউক্রেন। এর ফলে ২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের যে অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল, সেই ক্রিমিয়ায়ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।
জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের বিশ্লেষক মিশেল উইজে বকম্যান আল জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ায় নিজ দেশের ভেতরেই জ্বালানির ঘাটতি এত তীব্র যে, বছরের তৃতীয় ভাগে প্রথমবারের মতো দেশটি পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাস অয়েল আমদানি করতে বাধ্য হয়েছে। ‘এ সপ্তাহেও’ ডিজেল ও গ্যাস অয়েলবাহী একটি জাহাজ রাশিয়ার ভাইসোৎস্ক বন্দরে পৌঁছেছে বলে জানান বকম্যান।
গত সপ্তাহে রাশিয়া জানিয়েছে, উৎপাদন যখন চাহিদার চেয়ে বেশি হবে, তখন তারা ডিজেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আংশিকভাবে তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানাচ্ছে, রাশিয়া সাধারণত নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার দ্বিগুণ ডিজেল উৎপাদন করে। তবে দেশটিতে বিভিন্ন তাপমাত্রার উপযোগী আলাদা মানের ডিজেল তৈরি হয়।
সামনের দিনে ডিজেলের যে ধরনটা রপ্তানির জন্য বাজারে ছাড়া হতে পারে, সেটি হলো, শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার জন্য উপযোগী গ্রীষ্মকালীন ডিজেল। কারণ, সামনের মাসগুলোতে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারে শীতকালীন ও আর্কটিক অঞ্চলের উপযোগী ডিজেলের চাহিদা বাড়বে।
ট্রাম্প-পুতিন চুক্তি, ইউক্রেন কী ভাবছে?
ট্রাম্প যখন রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দিচ্ছেন, ঠিক ওই সময়েই ফ্লোরিডার মায়ামিতে ইউক্রেনের কর্মকর্তা আর ইউরোপিয়ান আলোচকদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শেষ কীভাবে টানা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন।
ট্রাম্পের ঘোষণায় প্রতিক্রিয়ায় জেলেনস্কি বলেন, এটা “শক্তিশালী অংশীদারদের দুর্বল সিদ্ধান্ত।” এই চুক্তি ‘রাশিয়ার স্বার্থেই যাচ্ছে” জানিয়ে তিনি বলেন, “…এর ফলে রাশিয়া আরও মানুষ মারতে পারবে, আরও লম্বা সময় ধরে যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারবে।”
রাশিয়ার ডিজেলের কারণে কি বিশ্ববাজারে দাম কমবে?
গত শুক্রবার পুতিন বলেন, তিনি নিশ্চিত, এই চুক্তি “পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
ট্রাম্পের সঙ্গে এই চুক্তি নিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ ঠিক রাখা এবং নিজ নিজ দেশের প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা ও এ ধরনের আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সমঝোতা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট কমানোর ক্ষেত্রে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারবে না।
আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্প-পুতিনের ডিজেল সরবরাহ চুক্তি একটা স্বল্পমেয়াদি সমাধান। তার ভাষায়, এটা “ট্রাম্পের দেখনদারি আরেকটা চুক্তি।”
চুক্তিটিকে বিউচ্যাম্প বর্ণনা করেছেন এভাবে, “একজন স্বৈরশাসক – যাকে মানুষ পছন্দ করে না - তার সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দেওয়া, শিরোনামে জায়গা করে নেওয়ার মতো বড় অঙ্কের কথা বলা… অথচ কোনো লক্ষ্যই এই চুক্তি দিয়ে অর্জিত হবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।”
রাশিয়া থেকে কিছু ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হলেও এটা কেবল একটা ‘স্বল্পমেয়াদি সমাধান’ হবে বলে জানান বিউচ্যাম্প। কেন এমন মনে হচ্ছে তার? “কারণ, বিশ্বে প্রতিদিন ডিজেল ব্যবহৃত হয় প্রায় ৩ কোটি ব্যারেল। ট্রাম্প যে পরিমাণ ডিজেল সরবরাহের কথা বলেছেন, তার মোট পরিমাণ এই দৈনিক ব্যবহারের পরিমাণের কাছাকাছি” – বলেছেন বিউচ্যাম্প।
বকম্যানও আল জাজিরাকে বলেন, রাশিয়ার ডিজেল বাজারে ছাড়লে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও সরবরাহের সংকট কতটা কমবে, তা এখনো বোঝা যাচ্ছে না। তার ব্যাখ্যা, “সাধারণ লাইসেন্স জারি করে যে পরিমাণ ডিজেল আমদানির সুযোগ দেওয়া হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডিজেলের দাম কমানোর মতো হয়ে উঠতে পারবে কি না, এ নিয়ে আমি নিশ্চিত হতে পারছি না।”
অ্যাটকিনসনের মতে, ট্রাম্প যে পরিমাণ ডিজেলের কথা বলছেন, রাশিয়া যদি সে পরিমাণেই ডিজেল সরবরাহ করতে পারে, তারপরও দাম খুব একটা কমবে না।
এ ছাড়া ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়া থেকে ডিজেল কিনবেই, এমন নিশ্চয়তাও নেই। অ্যাটকিনসন বলেন, “নীতির দিক থেকে দেখলে… ইউরোপের কোনো একটা সরকার কেন ও কীভাবে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনবে, তা বোঝা যাচ্ছে না। কারণ, গত চার বছরে ইউরোপের বড় একটা লক্ষ্যই ছিল বাস্তবিকভাবে যত সম্ভব রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা।”