দুর্গার পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র বলে-
‘আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহি দেবী নমস্তুতে।
রূপং দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে।
পুত্রান দেহি ধনং দেহি সর্ব্বকামাংশ্চ দেহি মে॥’
হে ভগবতী, আপনাকে প্রণাম করি, আপনি আমাকে রোগমুক্ত করুন, বিজয়ী করুন, যশ ও সৌভাগ্য প্রদান করুন, পুত্র ও ধন দিন এবং আমার সকল কামনা পূর্ণ করুন।
বিশ্বের সংকটময় সময় থেকে উত্তোরণের জন্য মায়ের আগমন। সনাতন ধর্মালম্বীদের বিশ্বাস, মা দুর্গার আগমনে মানুষের এই দুর্গতির অবসান হবে।
বাংলাদেশে মাতৃপূজার যে বিচিত্র রূপ আছে সেগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে মাতৃদেবীর মধ্যে বহু যুগের বহু ধারা এসে মিশেছে। অনেক প্রাচীন ধারা মূল আমরা বেদের মধ্যেই লক্ষ্য করতে পারি। এই মাতৃ বা শক্তিদেবীর প্রাচীন ধারা মুখ্যত দু’টি। একটি শস্য প্রজননী ভূতধারিণী পৃথিবী দেবী, অপরটি এক পর্বতবাসিনী সিংহবাহিনী দেবী, যিনি পরবর্তীকালে পার্বতী, গিরিজা, অদ্রিজা নামে খ্যাত। এই পার্বতীই হলেন উমা। মা দুর্গা নামে ভক্তদের কাছে পরিচিতা।
চণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় মায়ের নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গম অসুরের কাজ ছিল জীবকে দুর্গতিতে ফেলা। দুর্গমকে বধ করে যিনি স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবতাদের হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দেন এবং জীবজগতকে দুর্গতির হাত থেকে রক্ষা করেন তিনি মা দুর্গা, সন্তানের মঙ্গলময়ী জননী। এছাড়া তিনি মহিষমর্দিণী, শূলিণী, পার্বতী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা, বৈষ্ণবী, কৌমারি, বাহারী, চণ্ডী, লক্ষ্মী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবাণী, যোগনিদ্রা ইত্যাদি নামে ভক্তদের কাছে পূজা গ্রহণ করে থাকেন।
দুর্গা ও দুর্গা পূজা সংক্রান্ত কাহিনীগুলোর মধ্যে ভক্তদের কাছে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও লোকমান্য হলো দেবীমাহাত্ম্যম্-এর কাহিনী। দেবীমাহাত্ম্যম্ প্রকৃতপক্ষে ‘মার্কণ্ডেয় পুরাণ’-এর একটি নির্বাচিত অংশ। সাতশ’ শ্লোকবিশিষ্ট এই দেবীমাহাত্ম্যম্-ই শ্রীশ্রীচণ্ডী। দেবীমাহাত্ম্যম্-এর কাহিনী অনুসারে পুরাকালে মহিষাসুর দেবতাদের যুদ্ধে পরাজিত করে স্বর্গ দখল করে। অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী তখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। স্বর্গ থেকে বিতাড়িত দেবতারা প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাকে মুখপাত্র করে শিব ও নারায়ণের কাছে উপস্থিত হন। মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনী শোনার পর তারা উভয়েই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করে।
ইন্দ্রাদি অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও বিপুল পরিমাণে তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। সুউচ্চ হিমালয়ে অবস্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করে। এই তেজস্বীনী দেবীই হলেন মা দুর্গা। দেবতাদের পুঞ্জিভূত শক্তির দেবী। অপরদিকে দৈত্য, বিষ্ম, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন তিনিই মা দুর্গা। আবার মার্কণ্ডেয় পুরাণমতে দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। বাঙালিরা একে দশভুজারূপে পূজা করে থাকেন। দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধের মাধ্যমে দেবতাদের স্বর্গ ফিরিয়ে দিয়ে শান্তির পরশ ছড়িয়ে দেন। তাই তাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী। দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক হিসেবে পরিচিত। আবার দুর্গাকে বলা হয় দুর্গতিনাশিনী, দশভূজা, মঙ্গলময়ী, শক্তিদায়িনী, পরমাপ্রকৃতি, আদ্যশক্তি ও স্নেহময়ী মা এই দুর্গা।
আশ্বিনের শুক্লাষষ্ঠী থেকে শুক্লানবমী পর্যন্ত দেবী দুর্গার পূজা হয়ে থাকে। দেবীর সঙ্গে যুক্ত হয় আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী দেবী সরস্বতী, সর্বৈশ্বর্য প্রদায়িনী দেবীলক্ষ্মী, সর্বসিদ্ধিদাতা গণেশ, বলরূপী কার্তিক এবং ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন ত্যাগ ও বৈরাগ্যের মূর্তবিগ্রহ দেবাদিদেব মহাদেব। এ যেন একই সঙ্গে শক্তি, জ্ঞান, ঐশ্বর্য, সিদ্ধি, বল ও বৈরাগ্যের এক অপূর্ব সমাবেশ।
পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমী। দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গা মর্ত্যলোক ছেড়ে আবার কৈলাসে ফিরে যাবেন স্বামীর ঘরে। সাথে নিয়ে যাবেন ভক্তদের ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর বেদনাশ্রু। সকালেই দেবীর দশমীবিহিত পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জনের পর্ব শেষ হবে। প্রতিমা বিসর্জনের আগে ভক্তিমতি রমনীরা দেবী দুর্গাকে বেদনাবিধূর বিদায়লগ্নে তেল, মিষ্টি, ধান, দুর্বা, সিঁদুর ও পান দিয়ে ভোজন করাবেন। এরপর শোভাযাত্রা সহকারে দেবী প্রতিমার হবে বিসর্জন। ভগ্নমনোরথে ভক্তরা মন্দিরে ফিরে শান্তিজল ও আশির্বাদ নিয়ে ফিরে যাবেন আপন ঘরে। শুরু হবে আগামী বছর মায়ের ফিরে আসার দিন গোনা।
সনাতন ধর্মের পূজা অনুষ্ঠানগুলোতে এবং বিভিন্ন প্রতিমার রূপ কল্পনায় মূলশক্তি হলো আত্মশক্তি। যাকে সংস্কৃততে বলে ‘আত্মানাং বিদ্ধি’ অর্থাৎ নিজেকে জানো বা আত্মাকে জানো। দুর্গা সাধকের নিজের এবং বিশ্বের মূল মহাশক্তি। ঋষি বেদব্যাস পরম ব্রহ্মের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বলেছেন, তুমি রূপ বিবর্জিতা; আমি ধ্যানে তোমার রূপ কল্পনা করেছি। অপরূপকে রূপময়, অনির্বচনীয়কে বচনীয় এবং সর্বব্যাপীকে স্থানিক করা হয়েছে সর্বলোকের কল্যাণের জন্য। আমাদের ঋষিকবিরা মানুষের মধ্যকার সুরশক্তির ও অসুরশক্তির দ্বন্দ্বের কথা এবং পরিণামে অসুরশক্তির বিনাশ ও সুরশক্তির জয়ের কথা ধর্মগ্রন্থে রূপকে বর্ণনা করেছেন। সব দেবতার তেজরাশির সমন্বিত শক্তিরূপই মহাশক্তি দুর্গা।
লেখক: তারাপদ আচার্য্য, সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ