দায়িত্ব নেওয়ার আট মাসের মাথায় পদত্যাগ করলেন বিএনপি সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নয়, স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। তার পরবর্তী কাজ হবে মাদকবিরোধী অভিযানকে সফল করে তোলা। একজন মন্ত্রী বা এমপি হিসেবে নয়, একজন নাগরিক হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করবেন।
প্রশ্ন উঠেছে, ইশরাক হোসেনের এই পদত্যাগ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি না নতুন অধ্যায়ের সূচনা? এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, ‘দল চাইলে তিনি ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে লড়বেন।’ তার এই আগ্রহ, ঢাকা মহানগর বিএনপিতে টানাপোড়েন বাড়িয়ে দেবে বলে ধারণা করা যায়। বিএনপি নেতৃত্ব সম্ভাব্য দুই প্রার্থীর কথা মাথায় রেখে উত্তর ও দক্ষিণে দুজন প্রশাসক নিয়োগে করেছে। তাদের নামে রাস্তায় পোস্টারও সাঁটা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়া তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার তৃতীয় পদত্যাগের ঘটনা এটি। এর আগে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেছিলেন। জহিরউদ্দিন স্বপন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হলেও দীপেন দেওয়ানকে এমপি পদ নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
অবিভক্ত ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেন আওয়ামী লীগ আমলে ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণে মেয়র নির্বাচন করে হেরে যান। ওই নির্বাচনে তিনি ২ লাখ ৩৬ হাজার ভোট পান, আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ ফজলে নূর তাপস ৪ লাখ ২৪ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। কিন্তু ইশরাক ওই ফলাফল মেনে নেননি। তিনি নির্বাচনে কারচুপির বিরুদ্ধে মামলা করলেও সেই সময় প্রতিকার পাননি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পর ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. নুরুল ইসলাম শেখ ফজলে নূর তাপসের মেয়র পদে বিজয় বাতিল করে ইশরাক হোসেনকে বিজয়ী ও বৈধ মেয়র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেয়নি। এ নিয়ে নগরভবনের সামনে দীর্ঘদিন আন্দোলন–সংগ্রামও করেছিলেন ইশরাক হোসেন।
এবারে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের সূত্রপাত শনিবার মাদকবিরোধী অভিযানকে কেন্দ্র করে। শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় তিনি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের হাতেও অস্ত্র ছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, শনিবার বিকেলে রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ গুন্টিঘর রেলগেট এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে যান ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। তার নিজের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা ভিডিওতে দেখা যায়, গাড়ি থেকে নেমেই আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছেন, “এই ধর ধর ধর...।”
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ নিয়ে সরকারের ভেতরেও অস্বস্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়।
রাতে খবরে ছড়িয়ে পড়ে যে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রচার হলেও তিনি একে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন। তবে সোমবার সকাল সাড়ে আটটার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ওই দিন বেলা দুইটায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন।
তিনি পোস্টে আরও লেখেন, এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করবেন।
১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই দল ও সরকারের মধ্যে চাপান-উতোর লক্ষ্য করা যায়। দলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা মন্ত্রিসভার বাইরে থেকে যান। পরে অবশ্য দুএকজনকে নেওয়া হয়। তবে মন্ত্রিসভায় তরুণদের প্রাধান্য দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে।
এর আগে ১ অক্টোবর বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজনের নাম সামনে আসে। ঘটনা নিয়েও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়। মিষ্টির রাজনৈতিক দায় নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার পর ১ অক্টোবর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন মিষ্টি। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
সেই সময় বিএনপির ঢাকা উত্তরের কমিটিও ভেঙে দেওয়া হয়। মিষ্টি ওই কমিটির যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন।
একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন এমপির পদত্যাগের ঘটনাকে বিএনপির নেতারা দলীয় শৃঙ্খলা ও আইনের শাসনের প্রতি নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখছেন দলের নেতা-কর্মীরা। কিন্তু এ রকম কঠোর অবস্থানের ঘটনা বাড়তে থাকলে দল ও সরকারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। যেদিন গেন্ডারিয়ায় মাদককাণ্ড ঘটে, সেদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা শহরে অন্তত ১৩টি স্থান পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেন। দায়িত্বে অবহেলার জন্য কারও কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেন। তার এই আকস্মিক ও ‘ওমরীয় পরিদর্শনকে’ সবাই প্রশংসা করলেও সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি থাকে প্রতিমন্ত্রীর অস্ত্রকাণ্ডে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রতিমন্ত্রীকে অস্ত্র উঁচিয়ে যদি মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করছে?