বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যর্থতা, অনিয়ম কিংবা অনৈতিক কোনো ঘটনায় জড়িয়ে মন্ত্রিত্ব হারানোর ঘটনা খুব বেশি নেই। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সরকারের সময় মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে বাধ্য করার কিছু হাইপ্রোফাইল ঘটনা আছে।
১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন দুজন মন্ত্রী। এদের একজন সে ক্যাবিনেটের শিল্পমন্ত্রী এম জহিরউদ্দিন খান ও অন্যজন তথ্যপ্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। বিএনপি সরকারের সেই আমলে দেশে সার নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। সারের দাবিতে আন্দোলন করে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল বেশ কয়েকজন কৃষক। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শিল্পমন্ত্রী এম জহিরউদ্দিন খানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। সার উৎপাদনের ব্যাপারটি জহিরউদ্দিন খানের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় খালেদা জিয়া তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সাবেক শিল্পমন্ত্রী এম জহিরউদ্দিন খানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। ছবি: সংগৃহীত
তথ্যপ্রতিমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল তার একটি মন্তব্যের কারণে। দেশে সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। নাজমুল হুদা একটি বক্তৃতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের একটি ফর্মূলা দিয়েছিলেন। নাজমুল হুদার সেই মন্তব্য ছিল বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তাকে পদত্যাগ করতে হয়।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ৭ মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল সে সময়ের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আফসারউদ্দিন আহমেদকে। রাজধানীর একটি বস্তি উচ্ছেদ করাকে ঘিরে বিতর্কে তার মন্ত্রিত্ব যায়।
স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আবুল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
দুটি পাসপোর্ট রাখার অভিযোগ উঠেছিল সে সময়ের স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে। পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাকেও। এই আবুল হোসেনকেই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সড়ক যোগাযোগ মন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাংক অভিযোগ তুললে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার ১৪ মাসের মাথায় তিনি পদত্যাগ করেছিলেন।
বিতর্কিত মন্তব্য করার কারণে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। ছবি: সংগৃহীত
একই সরকারের সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলামকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি ১৯৯৯ সালে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা বিস্ফোরণের পর গ্রেনেড নিয়ে একটি মন্তব্য করেছিলেন, সেটি বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তিনি বলেছিলেন গ্রেনেড কোনো বেসামরিক ব্যক্তির কাছে থাকার কথা নয়, সেটা সেনাবাহিনীর জিনিস। এই মন্তব্যের পর তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছিলেন সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার আবার ক্ষমতায় এলে তিনজন হাইপ্রোফাইল মন্ত্রীকে বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে দেশব্যাপি অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে সে সময়ের বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল।
২০০৫ সালে তেল–গ্যাস উত্তোলন প্রতিষ্ঠান নাইকোর একটি দামি এসইউভি নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল সে সময়ের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেনকে। পত্রিকায় সে সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের দিনই একেএম মোশাররফ হোসেনকে নিজ কার্যালয়ে ডেকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একেএম মোশাররফ হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
সেই বিএনপি সরকারের শেষ দিকে লোডশেডিং অনেক বেড়ে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ নিয়ে দেশব্যাপি সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিদ্যুৎ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন আবারও।
২০০৯ থেকে ২০২৪ এর ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ১৫ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল। তিনটি মেয়াদে। প্রথম মেয়াদে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পদ্মাসেতুর অর্থায়ন নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী আবুল হোসেনকে। এই আবুল হোসেন আওয়ামী লীগের দুই মেয়াদে একবারও মন্ত্রিত্বের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি। তিনি এ ব্যাপারে হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র রাজনীতিবিদ।
প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তার সহকারী একান্ত সচিব ও দুই রেল কর্মকর্তাকে বহনকারী একটি গাড়ি থেকে ৭০ লাখ টাকা উদ্ধারের পর অভিযোগ ওঠে। ওই অর্থ রেলে নিয়োগের জন্য ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ওই ঘটনার রাজনৈতিক দায় ঘাড়ে নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করে তাকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে কাজ চালিয়ে যেতে বলেছিলেন।
দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় রেলমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ছবি: সংগৃহীত
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার দুই মাসের মাথায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ। তার পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করেননি। তিনি মন্ত্রিত্বেও ফেরেননি, মন্ত্রিত্বের বেতন ভাতাও কখনো গ্রহণ করেননি।
তাবলীগ জামাত ও হজ্বের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছিলেন আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তৃতীয় মেয়াদে একজন নায়িকার সঙ্গে অনৈতিক কথোপকথনের অডিও ভাইরাল হওয়ার পর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসান। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছিলেন।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখনো পর্যন্ত দুইজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। শুরুর মন্ত্রিসভার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহিরউদ্দিন স্বপনকে কিছুদিন আগের সরিয়ে দিয়ে তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন গত শনিবার তার নিজ নির্বাচনী এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় গেলে তা নিয়ে দেশব্যাপি ও সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। একজন মন্ত্রী বা এমপি আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে এ ধরনের কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কিনা, এমন এখতিয়ার তার আছে কি না, এ নিয়ে সমালোচনার জন্ম হলে রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। ইশরাক আজ সোমবার দুপুরে প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলন করে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
আজ পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
ইশরাকের আগে মন্ত্রিসভা থেকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা পদত্যাগে বাধ্য হলেও সে সব ঘটনা ঘটেছে অনেকটাই নিরবে–নিভৃতে। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে নিজের অবস্থান জানিয়ে পদত্যাগ করার ঘটনা খুব সম্ভবত বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম।
তবে সংবাদ সম্মেলন করে রেল মন্ত্রণালয় থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও। আগেই বলা হয়েছে তিনি সেই ঘটনার রাজনৈতিক দায় নিয়েছিলেন। একই সঙ্গে রেলের দুর্নীতির কালো বিড়াল খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইশরাকের সঙ্গে তার পার্থক্য হলো, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর ইশরাক সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজ থেকেই সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছিলেন।