মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ‘স্বেচ্ছায় অব্যাহতির’ ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। আজ সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ঘোষণা দেন।
গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ার রেল লাইনসংলগ্ন ঘুন্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে তাকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যাওয়ার পর সমালোচনার মধ্যে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সংবাদ সম্মেলন করেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন।
স্বেচ্ছায় অব্যাহতির কারণ
স্বেচ্ছায় অব্যাহতির কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “দল যেন বিব্রত না হয়, সে জন্য আমি অব্যাহতি নিচ্ছি। আমি আবারও ক্লিয়ার করতে চাই আজকে থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিচ্ছি।”
অস্ত্র নিয়ে অভিযানের ব্যাখ্যা
ইশরাক বলেন, “মাদকের ডিস্ট্রিবিউশন হাব হিসেবে পরিচিত গেন্ডারিয়ার এই জায়গা। এখানে ঘরে বসে তারা মাদক সেবন ও বিক্রি করে। ওই এলাকার বাড়ির মালিকদের জিম্মি করে এই মাদক কারবারিরা। মাদকের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আমাদের কয়েকটা বৈঠক হয়। অনেক মিটিং করার পর যখন আমরা সুরাহা করতে পারছিলাম না। এরপর সিদ্ধান্ত হয় সেখানে একটা ফাঁড়ি স্থাপন করা হবে। কিন্তু পরবর্তিতে ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়নি। আমরা সিদ্ধান্ত নেই একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবো। আপনারা জানেন ৫ আগষ্টের পর থেকে অভিযান পরিচালনায় পুলিশ প্রশাসন যথেষ্ট ছিলনা।”
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ঢাকা-৬ আসনের আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ওই অভিযানে অংশ নিয়েছি। স্থানীয় ওসি ও সংশ্লিষ্ট উপকমিশনাররা বিষয়টি জানতেন এবং তারা এতে যুক্ত ছিলেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছি।”
অভিযানের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নির্বাচনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যাচ্ছিল না। এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা ও ভোটারদের কাছ থেকেও তার ওপর চাপ ছিল।”
‘নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলাম’
ইশরাক বলেন, “আমরা যাওয়ার পর দেখলাম ২৫-৩০ জন লোক ওখানে থাকা মাচা থেকে বের হয়ে আমাদের দিকে আসতে থাকে। আমার ব্যক্তিগত একটা লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। যেটা আমার কাছে সবসময় থাকে। আমি নিরাপত্তার স্বার্থে সেটা বের করি। ওখানে এমন অনেক ঘটনা আছে যেমন পুলিশ বাহিনী মাদক ব্যবসায়ীর হামলায় আহত হয়েছে। আমি নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমার পিস্তলটি রেখে দেই।”
অভিযানের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, “কয়েকটি ভবনে পুলিশের উপস্থিতিতে বিভিন্ন কক্ষ থেকে চোরাই মোবাইল ফোনে ভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইনের প্যাকেট, কয়েক বোতল মদ, দেশীয় অস্ত্র, চাপাতি ও অন্যান্য জিনিস উদ্ধার করা হয়। পরে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। উদ্ধার করা মাদক ধ্বংস করে ফেলি। সেই সাথে আমরা সতর্ক করে আসি আমরা আবারও অভিযান চালাব। রাতে আমি জানতে পারি একটি ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। যেটা আমি এবং আমার দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলাম নিজেকে রক্ষা করতে।”
বিএনপির এই নেতার দাবি, অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া, যাতে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আমাদের লক্ষ্য শুধু রাস্তার পর্যায়ের মাদক বিক্রেতাদের খুঁজে বের করা নয়। যারা মাদকের মূল সরবরাহকারী, তাদের চিহ্নিত করা জরুরি।”
ইশরাক বলেন, “আপনি জানেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী মিরপুরে আটটি স্পট পরিদর্শন করেছিলেন সে দিন। কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়া মাদকের বিরুদ্ধে যেভাবে প্রচার করেছে প্রধানমন্ত্রীর ভালো কার্যক্রম তাতে ঢাকা পড়েছে। আমি তো ওখানে জমি দখল বা চাঁদাবাজি করতে যাইনি। কিন্তু গণমাধ্যম চাইলে এমন নিউজ না করে, মাদক কারবারিদের চিহ্নিত করে নিউজ করতে পারত। কিন্তু তা করেনি।”
কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন ইশরাক হোসেন। ছবি: চরচা
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে বলি- আমি পদত্যাগ করব। আমি চাইনা আমার কারণে আপনার কোনো ভালো কাজ ঢাকা পড়ে যাক। আমার কারণে যেন প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড আড়ালে পড়ে বা দল বিব্রত হয়, সেটি আমি চাই না।”
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নিজের সিদ্ধান্ত জানানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আজ আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে আমার সিদ্ধান্ত জানিয়েছি। তিনি এতে সম্মতি দিয়েছেন এবং আমাকে ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূলসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়েছেন।”
‘সে দিন কোনো ভুল করিনি’
অভিযান নিয়ে সমালোচনার জবাবে ইশরাক বলেন, “অভিযানের মাধ্যমে যদি আমি কাউকে আঘাত করে থাকি, বাংলাদেশের যে পর্যায়ের মানুষই হোন না কেন, তার জন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সে দিন আমি কোনো ভুল করিনি।”
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে অভিযান নয়
ঘুন্টিঘরে অভিযান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, “এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গত ছয়-সাত মাস ধরে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। এসব বৈঠকে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং ওয়ারী ও লালবাগ বিভাগের উপকমিশনাররা উপস্থিত থাকেন।”
তিনি বলেন, “এসব ছোটখাটো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিটি গলিতে গিয়ে নির্দেশ দিতে হবে, এমন তো নয়। সংসদ সদস্য হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।”
ইশরাকের দাবি, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাভাবিক সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকেই তারা উদ্যোগটি নিয়েছেন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ইশরাক বলেন, “আজীবন আমাদের যুদ্ধে লড়ে যেতে হবে। সেটা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ হোক, মাদকের বিরুদ্ধে হোক। আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে অভিযানে যাই। কিন্তু মূল বিষয়টি তুলে ধরার পরিবর্তে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে, ‘অস্ত্র’, ‘ইশরাক’ ও ‘প্রতিমন্ত্রী’। এতে মাদকবিরোধী অভিযানের উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে গেছে।”
তার অভিযোগ, হাতে অস্ত্রসহ ছবি দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো ‘নানা ধরনের ন্যারেটিভ’ তৈরি করেছে। তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো।”
ইশরাক বলেন, “আমার সঙ্গে অনেকের ব্যক্তিগত পরিচয় বা সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কেন আমাকে লক্ষ্য করে এভাবে খবর প্রকাশ করা হলো, তা আমার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।”
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, “আমার দ্বিতীয় অস্ত্রটি আমার সাথে থাকা সহকর্মীকে রাখতে দিয়েছি। আইন অনুযায়ী যার লাইসেন্স যার আছে সে উপস্থিত থাকলে অন্য কেউ সেটা বহন করতে পারবে।”
ভবিষ্যতেও মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে আমরা যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি, তা চালিয়ে যাব।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, “এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএনপি এবং দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।”
ইশরাক হোসেনের কর্মী-সমর্থকরা। ছবি: চরচা
তিনি বলেন, “দল যদি মনে করে, দলের স্বার্থে আমার নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রয়োজন, তাহলে আমি শতভাগ প্রস্তুত। আবার দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তাকে বিজয়ী করতে কাজ করব।”
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, “কোনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি বলে মনে করি না।” তবে জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার বক্তব্যে তাকে ‘সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উঁচিয়ে চলা ব্যক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করায় তিনি ব্যথিত হয়েছেন বলে জানান।