দুই এমপির অপরাধই গুরুতর। একজন দলের নির্দেশে পদত্যাগ করলেন। আরেকজন দল থেকে বহিস্কার হওয়ার পরও পদে বহাল থাকলেন। এটি আইনের দুর্বলতা, না রাজনৈতিক কৌশল?
আমরা বলছি ত্রয়োদশ সংসদের দুই দলের দুই সংসদ সদস্যের কথা। একজন গাজী নজরুল ইসলাম, যিনি জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে যিনি সাতক্ষীরা-৪ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি দলীয় সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
প্রথম দুই অধিবেশনে সংসদীয় কার্যক্রমেও অংশ নিয়েছেন। কিন্তু এরপরই চাকরিপ্রার্থী এক তরুণীকে নিয়ে তার ছবি ভাইরাল হলে সারা দেশে শোরগোল ওঠে। জামায়াতে ইসলামী তাকে বহিস্কার করে নির্বাচন কমিশনে বিষয়টি জানিয়ে দেয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যে বেশি কিছু করার নেই, তা জামায়াতের নেতৃত্বও জানে।
বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
দ্বিতীয়জন হলেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তিনি বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হয়েছিলেন ১২ মে। সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে যোগও দিয়েছেন। এরপরই মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। এরপর বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি ভেঙে দেয়। এই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরেই খবর আসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
এরপরই গতকাল দুটোর দিকে তিনি স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। ১২ মে থেকে ১ অক্টোবর। মাত্র চার মাস তার সংসদ সদস্যের বয়স।
তিনি অবশ্য সাংবাদিকদের কাছে পদত্যাগের প্রশ্নটি এড়িয়ে যান। সাংবাদিকেরা তার কাছে জানতে চান, পদত্যাগ করেছেন কি না। উত্তরে তিনি বলেন, “আমি স্পিকারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, কথা বলেছি।”
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী বুধবার রাতে ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে দল থেকে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সূত্র আরও বলছে, পদত্যাগের পর দলীয়ভাবেও সংসদ সদস্যের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বিএনপি ও সরকারের সূত্রগুলোর ভাষ্য, রাড্ডার ঘটনা নিয়ে সরকারও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুই দিন ধরে ঘটনাটি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন। হামলা ও ভাঙচুরে কারা জড়িত ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় এবং নেপথ্যে কারা ভূমিকা রেখেছেন, এসব বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন। তদন্তে ফেরদৌসী আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত চলছে এবং কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
শেষ পর্যন্ত মিরপুরে সন্ত্রাসী ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অর্থাৎ, দল তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে।
গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটি রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেয়েও গুরুতর। তার জন্য এক তরুণীকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে আত্মহত্যা করতে হয়েছে।
অভিযোগ আছে, এলাকার দরিদ্র মেয়েটি এমপি গাজী নজরুল ইসলামের কাছে গিয়েছিলেন চাকরির জন্য। এই সুযোগে তিনি মেয়েটির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই ছবি ভাইরাল হলে নিজের অপরাধ ঢাকতে মেয়েটি তার দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন। প্রথম স্ত্রী বিয়েতে সম্মতি দিয়েছেন বলেও জানানো হয়।
এরপর গাজী সাহেব দুই স্ত্রীকে নিয়েই ন্যাম ফ্ল্যাটে থাকতেন। সেখানে যে মেয়েটির ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো, সেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তদন্তে। তারা বলেছেন, মেয়েটিতে বারান্দায় ঘুমাতে বাধ্য করা হতো। আমাদের সমাজে সাধরণত দুই স্ত্রীকে আলাদা বাসায় রাখা হয় পারিবারিক বিরোধ এড়ানোর জন্য। কিন্তু গাজী সাহেব একই বাসায় দুই স্ত্রীকে রেখে এক অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করেছেন, যা সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন।
পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দফায় গাজী নজরুল ইসলামকে দুই দফায় আটদিন রিমান্ডে নিয়েছে। পুলিশি তদন্তে কী তথ্য এসেছে, তা জানার অধিকার দেশবাসীর আছে।
আত্মহত্যার প্ররোচনায় যে গাজী সাহেব ও তার প্রথম স্ত্রীর সংশ্লিষ্টতা আছে, তার প্রমাণ বাদীকে দিয়ে আপসরফার প্রস্তাব আদালতে পেশ করা। এতে বলা হয়, বিবাদী জামিন পেলে তাদের আপত্তি নেই এবং দুই পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্ক আছে। এটা যে বাদীকে চাপ দিয়ে করানো হয়েছে, তা বিজ্ঞ বিচারকও বুঝতে পেরেছেন। আর এ কারণেই বাদীর আবেদন গ্রহণ করেননি তিনি।
আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে কোনো আপসরফা হয় না। আপসরফা হয় দেওয়ানি ও ছোটখাট ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে।
সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। ফাইল ছবি
স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়ার কারণে যদি বিএনপির সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়, তাহলে গাজী নজরুল ইসলাম সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন না কেন? এখানে তার দল জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে কি না, সেটাও প্রশ্ন। বিএনপি নেতৃত্ব দলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসায় তাকে সংসদ থেকে পদত্যাগ করতে বলেছে। সেই সঙ্গে তার নেতৃত্বাধীন কমিটিও বাতিল করে দিয়েছে।
কিন্তু জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের সদস্যপদ বহাল আছে। দল তাকে বহিষ্কার করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।
তাহলে কি জামায়াত জেনেশুনেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে–যাতে লাঠিও না ভাঙে, সাপও মরে। এর মাধ্যমে তারা দলকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করতে চেয়েছে। আবার তাদের মনোনয়নে নির্বাচিত গাজী সাহেবের সদস্যপদও বহাল থাকল। যেকোনো সময় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা যাবে। কিন্তু সংসদ সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করলে সেটা ফিরে পাওয়া যাবে না।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা