রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এরই মধ্যে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পদত্যাগপত্র জমা দেন। তার আসন শূন্য ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে সংসদ সচিবালয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের মিষ্টি জানিয়েছিলেন, ‘‘আমাকে স্পিকার ডেকেছেন, দেখা করেছি।’’
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম।
রাড্ডা সেন্টারে কী ঘটেছিল
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও মামলার তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, টিকাসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে।
পরে ভারী যন্ত্র এনে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে সাইনবোর্ড ও ব্যানারও দেখা যায়।
এ ঘটনায় শাহ আলী থানায় মামলা হয়েছে। হামলায় কারা জড়িত, কারা তাদের সংগঠিত করেছে এবং কীভাবে ভারী যন্ত্রপাতি সেখানে নেওয়া হয়েছিল- এসব বিষয় তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের গাফিলতির অভিযোগে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও প্রত্যাহার করা হয়।
মিষ্টির নাম এল যেভাবে
রাড্ডা হামলায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মী ও নারী সংসদ সদস্যদের দায়ী করে। এনসিপির সরাসরি অভিযোগ ছিল, বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদের বিরুদ্ধে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘‘আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির নেতৃত্বে, যার স্বামী এই এলাকার কমিশনার ছিলেন একসময় এবং যার ভাই ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন একসময়, তার নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ, একটা মবতন্ত্র কায়েম করা হলো।”
ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সভাপতি ছিলেন। রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি ওই সমিতির নামে বরাদ্দ চেয়ে করা আবেদনে তার স্বাক্ষর ছিল।
তবে মিষ্টি বলেছেন, ‘‘বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।” রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গেও নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, তদন্তে কোন সংসদ সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘‘রাড্ডা সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মিষ্টির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তদন্তাধীন।” তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
কেন পদত্যাগের নির্দেশ
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নাম আসা এবং তাদের কয়েকজনের সঙ্গে মিষ্টির ঘনিষ্ঠতার তথ্য সামনে আসার পর বিষয়টি বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে যায়।
দলীয় সূত্র জানায়, মিষ্টির বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিএনপির উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় আসে। গতকাল বুধবার রাতে তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর পর জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
সংসদ সদস্য কীভাবে পদত্যাগ করেন
সংসদ সদস্যের পদত্যাগের বিষয়টি সংবিধানে নির্দিষ্ট করা আছে। সংবিধানের ৬৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নিজের হাতে লিখিত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দিলে এবং তা স্পিকারের কাছে পৌঁছালে আসনটি শূন্য হয়। স্পিকারের পদ শূন্য থাকলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে পদত্যাগপত্র ডেপুটি স্পিকারের কাছে দিতে হয়।
মিষ্টির পদত্যাগের ফলে সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য হয়েছে। ওই আসনে পরবর্তী সদস্য নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সাংবিধানিক ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়নে সংসদে আসেন মিষ্টি। গত এপ্রিল মাসে বিএনপি সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জনের নাম ঘোষণা করে। ওই তালিকায় মিষ্টির নামও ছিল। দল ও জোট তাদের প্রাপ্য আসনের সমানসংখ্যক প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ায় ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি; নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে তারা নির্বাচিত হন।