তেল পরিবহনের পরিমাণের দিক থেকে বিচার করলে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলটি যুদ্ধের আট মাস পার করেও জ্বালানি বিশ্লেষকদের অধিকাংশের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থা ‘কেপলার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য বিকল্প পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২৪ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল পরিবাহিত হয়েছে, যা যুদ্ধের আগের ২৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেলের চেয়েও বেশি। জেপি মরগানের বিশ্লেষকেরা গত সপ্তাহে লিখেছেন যে, জ্বালানি বাজারগুলো যেন এক ‘অন্তহীন সংঘাতের’ দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ধারণাটি ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে এমন একটি বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে যে, এই অঞ্চলটি আরও এক দফা সংঘাত সামলে নিতে সক্ষম।
তবে এই দৃষ্টিভঙ্গিটি একটি বিষয়কে গুলিয়ে ফেলে—উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাসের প্রবাহ এখনো অব্যাহত থাকা আর এই জ্বালানি পরিবহনকারী স্থাপনা ও টার্মিনালগুলোর বর্তমান অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা এখানে উপেক্ষা করা হয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন তেল শোধনাগার, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র এবং রপ্তানি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি, হুথিরা লোহিত সাগরে সংঘাতের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। যেসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার অনেকগুলোই পুনর্নির্মাণ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। এর আর্থিক বোঝা মূলত এশিয়া, ইউরোপ ও উন্নয়নশীল বিশ্বের সেই সব আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর পড়বে, যারা তাদের জ্বালানি ব্যবস্থাকে উপসাগরীয় অঞ্চলের নির্ভরযোগ্য সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলেছিল।
নিউইয়র্ক টাইমসের গত সপ্তাহের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ও ইসরায়েলি পরিকল্পনাবিদরা ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডার এবং জ্বালানি অবকাঠামোর বিরুদ্ধে একটি সংক্ষিপ্ত অথচ তীব্র সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো এতে অনুমোদন দেননি। এ সপ্তাহে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে যে, ওয়াশিংটন উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকারগুলোকে এমন একটি অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, উপসাগরীয় অঞ্চলের ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতল দিয়ে যাওয়া ক্যাবলগুলো তাদের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। সংঘাতের পরবর্তী ধাপটি সম্ভবত এমন সব সম্পদ ও আমদানিকারকদের কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে, যা হারানোর ঝুঁকি নেওয়ার সামর্থ্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নেই।
একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের খ্যাতি কেবল ভূতাত্ত্বিক অবস্থানের ওপরই নয়, বরং কয়েক দশক ধরে করা বিনিয়োগের ওপরও নির্ভরশীল। ১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞার পর ভোক্তা দেশগুলো ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ (আইইএ) গঠন করে। এরপর ১৯৮০ সালের ‘কার্টার ডকট্রিন’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলকে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে উন্মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের পর, উপসাগরীয় দেশগুলো বিকল্প ব্যবস্থা বা ‘রিডানডেন্সি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিনিয়োগ করে। সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত ‘পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন’ সম্প্রসারণ করে; সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ফুজাইরাহ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করে; এবং রিয়াদ তাদের উৎপাদন সক্ষমতার একটি অংশ অতিরিক্ত হিসেবে সংরক্ষিত রাখে। এসব পদক্ষেপের মূল ভিত্তি ছিল এই ধারণা যে, মার্কিন শক্তি এই অঞ্চলের অবকাঠামোকে সুরক্ষা দেবে অথবা অন্তত এর ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ করবে। তবে চলতি বছরের সংঘাত সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় সাতটি দেশের অন্তত ৮৪টি অবকাঠামো স্থাপনায় ইরান সংশ্লিষ্ট ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে অন্তত ১৩৫টি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় সৌদি আরবের নয়টি বৃহত্তম শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালির বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রধান টার্মিনাল—ফুজাইরাহ—এর উভয় রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের রাস লাফানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি কমপ্লেক্সে ‘কোল্ড বক্স’ (যেখানে গ্যাস তরলীকরণের সরঞ্জাম থাকে) লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এর ফলে দুটি এলএনজি ট্রেন অকেজো হয়ে পড়ে, যা কাতারের মোট রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ। কাতার এনার্জি জানিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে এবং এর ফলে বার্ষিক আয়ে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। যেহেতু এসব সরঞ্জামের বেশির ভাগই বিশেষভাবে তৈরি, তাই ইরান বা অন্য কোনো পক্ষের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এই ক্ষতির প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে।
যারা নতুন করে সামরিক অভিযানের পক্ষে কথা বলছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে ইঙ্গিত করেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম দিন তাদের দিকে ছোড়া ১৩৭টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে তারা ১৩২টিই প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। ‘জিউইশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকা’-এর মার্চ মাসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, পুরো যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রর ৯০ শতাংশেরও বেশি প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। তবে জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এই ‘প্রতিহত করার হার’ কোনো সঠিক পরিমাপক নয়। একটি শোধনাগার বা এলএনজি কমপ্লেক্সকে অকার্যকর করার জন্য সেটিতে বারবার আঘাত করার প্রয়োজন নেই; বরং এর যেকোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অকেজো হয়ে গেলেই তা অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। ১৮ মার্চ কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায় যে, ইরান রাস লাফফানের দিকে পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল, যার মধ্যে চারটি তাদের বাহিনী প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে সেই হামলায় উল্লিখিত দুটি ‘ট্রেইন’ (উৎপাদন ইউনিট) ধ্বংস হয়ে যায়। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার হার ৮০ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও, এর ফলে এলএনজি সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা কয়েক বছর ধরে বজায় থাকবে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এতটাই কৌশলী ছিল যে সেগুলো ‘প্যাট্রিয়ট’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়েছিল।
দ্বিতীয় পর্যায়ের সংঘাত শুরু হলে তা আগের চেয়ে দুর্বল প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে শুরু হবে। জেআইএনএসএ-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, মার্চ মাসের শেষ নাগাদ বাহরাইন তাদের প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ৮৭ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করে ফেলেছিল; সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত ব্যবহার করেছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও ভালো কাজ করলেও, যদি হাতেগোনা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রও কোনো গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট, পাম্পিং স্টেশন বা টার্মিনাল ম্যানিফোল্ডে আঘাত হানে, তবে তা এমন সক্ষমতা নষ্ট করে দিতে পারে যা পুনরুদ্ধার করতে বাজারের কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। পরিকল্পনাকারীদের কাছে কতগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো গেল তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, যে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়বে, সেগুলো কোথায় আঘাত হানছে।
হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের বাইরে থাকা দেশগুলোর জাহাজ আটকে আছে। ফাইল ছবি
ইতিমধ্যে, ২০ জুলাই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণার পর থেকে হুথিরা সৌদি আরামকোর জিজান শোধনাগারে (যার দৈনিক সক্ষমতা ৪ লাখ ব্যারেল) তিনবার হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আগস্ট মাসে শোধনাগারটি মেরামতের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। সেপ্টেম্বরে ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ পাইপলাইন অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার কারণে রিয়াদকে ১১ দিনের জন্য পাইপলাইনটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল, যার ফলে ইয়ানবু বন্দরে পণ্য ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হয়। গোষ্ঠীটি ২৪ ও ২৬ অক্টোবর পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনগুলোতে নতুন করে হামলার দাবি করলেও, সৌদি আরব তা নিশ্চিত করেনি। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতির মোকাবিলায় নির্মিত এই পাইপলাইনটি এখন সৌদি রপ্তানি ব্যবস্থার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠানো অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই যে এশিয়ায় আসত, সেই এশিয়া মহাদেশই এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। মার্চ মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছুটি এগিয়ে আনে, জ্বালানি পাম্পগুলোতে তেল বিক্রির পরিমাণ সীমিত করে দেয় এবং বিদ্যুৎ গ্রিড সচল রাখতে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সার কারখানার মধ্যে চারটির গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। পাকিস্তান সপ্তাহে চার কর্মদিবস চালুর সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্কুলগুলো বন্ধ ঘোষণা করে। ভারতে প্রতিটি পরিবারকে প্রতি ২৫ দিনে মাত্র একটি ভর্তুকিযুক্ত রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা দেওয়া হয়, যার ফলে ডিলারদের দোকানে মানুষের ভিড় জমে যায়। ফিলিপাইন জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে; মে মাসে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের (রোলিং ব্ল্যাকআউট) কারণে লুজন দ্বীপের প্রায় ২০ লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। সেপ্টেম্বর নাগাদ বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকেরা জানান যে, তাদের অনেক অর্ডার বাতিল হয়েছে এবং উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। সিলেটে হাসপাতালগুলোতে প্রায় প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছিল এবং ঢাকার অনেক পরিবারকে রাতের খাবার রান্নার জন্য গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপের আশায় মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছিল। ইউরোপের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটি মূলত পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের ওপর; সেপ্টেম্বরে ইউরোপে ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়।
সৌদি তেল স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের হামলা এবং হুথিদের অভিযানের ফলে সৌদি আরবের রপ্তানি পথগুলো একই সঙ্গে আক্রমণের মুখে পড়বে, অথচ এই অঞ্চলের অন্যান্য বিকল্প পথগুলো ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যেতে পারে এবং সৌদি আরবের সেই অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা—যা ১৯৯০-এর দশক থেকে জ্বালানি সরবরাহের বড় ধরনের সংকট সামাল দিতে সহায়তা করেছে—তাও নিঃশেষ হয়ে যাবে। ক্রেতা ও বিক্রেতারা ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেছে; সংঘাতের আরেকটি পর্যায় এলে এই পরিবর্তনগুলো স্থায়ী রূপ নিতে পারে। ২২ অক্টোবর, কাতার এনার্জি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ‘শেনিয়ার’-এর কাছ থেকে ২০৫৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৪০ লাখ মেট্রিক টন পর্যন্ত এলএনজি কেনার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে—যে সরবরাহ ব্যবস্থা হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল নয়। যদি নতুন করে লড়াই শুরু হয়, তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারীরা দেখতে পাবেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, কয়লা বা অন্যান্য সরবরাহকারীর কাছে তারা যে বাজারের অংশ হারিয়েছেন, তা আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এই সংঘাতের আরেকটি পর্যায়ের বিকল্প হতে পারে একটি সমঝোতামূলক সমাধান, যেখানে উভয় পক্ষই কিছু ছাড় দেবে—আর এমন একটি সমাধানের রূপরেখা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। ২৫ অক্টোবর কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানে একটি খসড়া চুক্তি পৌঁছে দিয়েছেন। জানা গেছে, এতে সাত দিনব্যাপী পারস্পরিক আস্থা তৈরির পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যার পেছনে কয়েকটি নিশ্চয়তাদানকারী রাষ্ট্রও রয়েছে। ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এটিকে ‘প্রস্তাবই নয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে চলতি সপ্তাহে তেহরান এ বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওয়াশিংটন এখন আর ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে না, বরং তারা এটি ‘অর্থপূর্ণভাবে’ কমিয়ে আনার ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, তেহরানের প্রধান অগ্রাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ ও তেল সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়া। এমন একটি চুক্তি—যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর যাচাইযোগ্য সীমাবদ্ধতা আরোপ এবং হরমুজ প্রণালি শর্তহীনভাবে পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়া হবে—তা কার্যকর করতে হলে উভয় পক্ষকেই এমন কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে, যা তারা এতদিন প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
এই ছাড়গুলো দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। তবে সংঘাতের অন্য পরিণতির তুলনায় এটি অনেক কম ব্যয়বহুল। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭.১ বিলিয়ন ডলারে, যার মধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলারই ব্যয় হয়েছে ব্যবহৃত গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনের পেছনে। একটি সংক্ষিপ্ত সামরিক অভিযানও ‘রাস লাফান’-এর ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে পারবে না কিংবা সৌদি আরবের অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। বরং এটি এমন এক পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করবে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়।
উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদনকারীরা পাঁচ দশক ধরে বিশ্বকে এই নিশ্চয়তা দিয়ে এসেছে যে, আঞ্চলিক যুদ্ধ সত্ত্বেও তাদের সরবরাহ ব্যবস্থা অটুট থাকবে। কিন্তু দুটি ফ্রন্টে আট মাস ধরে চলা লড়াই সেই দাবির ভিত্তিকেই মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটলে তা অঞ্চলটিকে পুনর্গঠনের জন্য সময় দেবে। সৌদি-হুথি যুদ্ধের পাশাপাশি যদি আরও একটি সংঘাত শুরু হয়, তবে তা অবকাঠামোর এমন ক্ষতিসাধন করবে এবং আমদানিকারকদের মধ্যে আস্থার ওপর এমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, যার রেশ হয়তো এক প্রজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকবে।
লেখক: কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপন্সিবল স্টেটক্রাফট-এর একজন বোর্ড সদস্য
(এই লেখাটি মার্কিন প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসির সৌজন্যে প্রকাশিত হলো)