পৃথিবীর দুই শ্রেণির মানুষের দেশ নেই। প্রথম শ্রেণি হলো অতি ধনী। তারা যেই দেশে যাবেন, সেটাই তাদের নিজের দেশ হয়ে যায়। নির্দিষ্ট অঙ্কের বিনিয়োগ করে অনায়াসে সেখানকার নাগরিকত্ব নিতে পারেন।
আরেক শ্রেণির মানুষ হলেন অতি দরিদ্র। ‘সর্বহারা’ শব্দটি ব্যবহার করলেও ভুল হবে না। এরা প্রথমে গ্রাম থেকে শহরে আসেন। যখন দেখেন আলোকোজ্জল শহরেও ঠাঁই হচ্ছে না, তখন শেষ সম্বল লোটা-কম্বল বিক্রি করে কিংবা মোটা সুদে মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাড়ি জামান। এরপর কারও কারও জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা।
হালে গ্রামাঞ্চলে উন্নয়নকর্মীদের উপস্থিতি কমলেও আদম বেপারিদের নিয়োগ করা দালালদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, যারা লোভনীয় চাকরির কথা বলে বেকার তরুণদের বিদেশে যেতে প্রলুব্ধ করেন। লাখ লাখ টাকা তাদের পকেট থেকে হাতিয়ে নেন।
এদের খপ্পরে পড়ে কত তরুণ যে বিদেশের মাটিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সেই খোঁজ রাখেন না। প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রথমেই প্রতারিত হন ভিসা নিতে গিয়ে। কর্মী ভিসার কথা বলে তাদের হাতে ভ্রমণ ভিসা গছিয়ে দেওয়া হয়। ফলে বিদেশে গিয়ে তারা ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখে পড়েন। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কেউ লুকিয়ে কাজ করে কোনোরকমে টিকে থাকেন। যাদের কপাল মন্দ, তারা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন।
সম্প্রতি রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের ইউক্রেনে ভাড়াটে যোদ্ধা বা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী হিসেবে গিয়েছিলেন ৩৭ জন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৩৯৫ ও চার হাজার ৭২৫। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন মাঠের অবস্থা দেখতে ছদ্মবেশে তরুণদের পাঠানো হতো ‘রেকি’ করতে, রাশিয়া এখন বাংলাদেশি তরুণদের দিয়ে ইউক্রেনে রেকি করাচ্ছে। ইউক্রেন বাহিনীর প্রথম ধাক্কাটা তাদের ওপর দিয়ে যায়।
পুতিনের রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে তাদের জয়ী হওয়ার দাবি করছে। কিন্তু সেই জয়ের পেছনে বাংলাদেশের মতো অনেক উন্নয়নশীল দেশের কত হতভাগ্য তরুণ আত্মাহুতি দিচ্ছেন, তার ইয়াত্তা নেই।
জাতিসংঘের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন বলছে, বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দেশে সক্রিয় দালালদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ কর্তৃপক্ষ এই মানব পাচার করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশিদের ব্যবসায়ীক ভিসার অনুলিপিও পেয়েছে কমিশন, যাতে রাশিয়ার একটি বেসামরিক কোম্পানির আমন্ত্রণের উল্লেখ পেয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেনবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার বাহিনীতে নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে।
তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে, ভারত, শ্রীলঙ্কা, আজারবাইজান, বেলারুশ, বলিভিয়া, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, ক্যামেরুন, কলম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, এল সালভাদর, ঘানা, হন্ডুরাস, জর্ডান, কেনিয়া, মরক্কো, নাইজেরিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সোমালিয়া, তাজিকিস্তান, তিউনিসিয়া, তুরস্ক, উগান্ডা, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন ও জিম্বাবুয়ে।
এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন তৃতীয় বিশ্বের মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামে সহায়তা করত। সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি রাশিয়া এখন এসব দেশ থেকে ভাড়াটে সেনা সংগ্রহ করছে। সাম্রাজ্যগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো পার্থক্যই থাকল না।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগ-এজেন্ট বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব মানুষকে তাদের সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগ করেছে। ভুক্তভোগীরা সবাই পুরুষ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তারা বেশির ভাগই আর্থিকভাবে দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর।
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের প্রধান এরিক মোসে বলেছেন, “তদন্তে কমিশন দেখেছে রাশিয়া বিশ্বজুড়ে সক্রিয় এজেন্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে ভর্তি এবং ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে পাঠাতে ২৯টি দেশের নাগরিকদের পাচার করেছে। পাচারের শিকার ব্যক্তিদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এবং মিথ্যা কর্মসংস্থানের কথা বলে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের রাশিয়ায় যেতে আকৃষ্ট করা হয়েছে।”
২১ অক্টোবর ‘চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে, ৩ বছরে ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর’ খবর সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে। কিন্তু কতজন সেখানে গিয়ে নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন, সেই তথ্য জানা যায়নি। একজন চিকিৎসকের সহায়তায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক বাংলাদেশি তরুণ ফিরে আসার খবর আমরা জানতে পেরেছি। অন্যরা কেমন আছেন, কোথায় আছেন?
২৭ অক্টোবর আরেকটি খবরে বলা হয়, লিবিয়ায় আটক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা ১৭৪ জন বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে ৩৬ জন সাগর থেকে আটকের পর ত্রিপলির একটি বন্দিশিবিরে ছিলেন। বাকিরা ত্রিপলির ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরেছেন। বাংলাদেশ দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) যৌথ উদ্যোগে মানবিক সহায়তায় তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪১ জন শারীরিকভাবে অসুস্থ। চাকরির নামে ইউক্রেনে পাঠানো বাংলাদেশিরা যাতে নিরাপদে দেশে ফিরতে পারেন, সরকারের উচিত সেই বিষয়ে কূটনৈতিক প্রয়াস অব্যাহত রাখা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া।
এদিকে, কানাডায় অভিবাসন জালিয়াতির এক ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযুক্ত চার ব্যক্তি- রাসেল মির্জা, মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, মো. মুদাসসার আলম ভূঁইয়া ও কাজী নাফিজ আলম ২২ অক্টোবর কুইবেকের ভ্যালিফিল্ড আদালতে হাজির হন। পঞ্চম অভিযুক্ত মো. রাকিবুল হাসান বর্তমানে বাংলাদেশে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
৩০ অক্টোবর বণিক বার্তা থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানায়, অবৈধ প্রবেশ ও অবস্থানের অভিযোগে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল থাইল্যান্ডের সংখলা প্রদেশের চানা জেলার একটি রিসোর্ট থেকে ২১ বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে ২৫ মে সীমান্ত এলাকায় আরও ছয় বাংলাদেশী আটক হন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, থাইল্যান্ডের কারাগারে বর্তমানে ১২৭ বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে যে বাংলাদেশের লাখ লাখ কর্মী আছে, তাদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণ অব্যাহত থাকায় দেশে বেড়াতে আসা নাগরিকদের অনেকে ফিরে যেতে পারছেন না।
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় হলেও বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ করেনি। তারা কেবল রাষ্ট্রদূতকে ডেকে তথ্য জানতে চেয়েছেন। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কারও শাস্তি কার্যকর করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা অন্য কোনো শক্তিধর দেশের নাগরিক হলে কি এভাবে শিরশ্ছেদ করতে পারত?
সৌদি আইনে দুই বাংলাদেশির বিচার হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতি বছর যে শত শত নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসছেন, তাদের বিষয়ে আইনের প্রয়োগ হতে দেখলাম না কেন?
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রবাসীদের সুরক্ষায় ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে তথ্য, দক্ষতা ও চাকরির শর্ত সংরক্ষণ থাকবে। কিন্তু যেসব শ্রমিক বিদেশে গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হন, তাদের সুরক্ষায় কী করছে, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই জনগণের আছে।
বিদেশে আমাদের শ্রমিকদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে লাশ হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তির সংখ্যাও। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে তিন হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় তিন হাজার ১৪০ জন। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহ বাড়তে থাকে।
চলতি বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে চার হাজার ৬০টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে, দুই হাজারের মতো। সরকার প্রবাসী কার্ড দেবে, ভালো কথা। কিন্তু বিদেশে গিয়ে যারা লাশ বা পঙ্গু হয়ে ফিরে আসেন, তাদের তো প্রবাসী কার্ড সুরক্ষা দিতে পারবে না।
আমরা আশা করব, প্রবাসী কার্ডের দিবাস্বপ্ন না দেখিয়ে বিদেশে যাওয়া প্রতিটি শ্রমিকের নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি আদায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
আমরা চাই না আর কোনো শ্রমিক বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে আসুন কিংবা অন্যের অন্যায় যুদ্ধে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহৃত হোন। যে প্রবাসী শ্রমিকদের টাকায় দেশের অর্থনীতি চলে, মন্ত্রীদের বেতন-ভাতার জোগান হয়, তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে সরকার উদাসীন থাকতে পারে না।
লেখক: সম্পাদক, চরচা