রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা অসংখ্য নক্ষত্র দেখি। সেই নক্ষত্রগুলোর আলো লক্ষ-কোটি বছর পেরিয়ে যখন আমাদের চোখে পৌঁছায়, তখন মহাবিশ্বের অতীত যেন নিঃশব্দে বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে। অথচ এই আলোকময় মহাবিশ্বের বুকেই রয়েছে এমন কিছু অঞ্চল, যেখান থেকে কোন আলোও আমাদের কাছে ফিরে আসতে পারে না। তাদের নাম ব্ল্যাক হোল-বাংলায় যাকে বলে কৃষ্ণগহ্বর।
মহাকালে মহাজাগতিক এক অন্ধকূপ যেখানে আলো গিয়ে হারিয়ে যায়, সময় থমকে দাঁড়ায়, আর মানুষের চেনা পদার্থবিদ্যার সব নিয়ম ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সেই প্রাচীন অন্ধকারের বুক চিরে আলোর সন্ধান করছেন এক বাঙালি বিজ্ঞানি তিনি অধ্যাপক অশোক সেন। সম্প্রতি স্টকহোম থেকে তার নাম যখন বিশ্বমঞ্চে ঘোষিত হলো, তখন এক প্রশ্ন আর বিস্ময় ছুঁয়ে গেল গোটা পৃথিবীকে। তিনি পেয়েছেন ‘অস্কার’। তবে রূপোলি পর্দার অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড নয়, এ হলো বিজ্ঞানের আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল ‘অস্কার’ আর তার নাম হলো ‘অস্কার ক্লেইন মেডেল’। আজকের আমরা দেখব সেই মহাবিশ্বের রহস্যে ঘেরা ঘটনা, যা মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে!
দুই অস্কারের গল্প: নামের গোলকধাঁধা
লস অ্যাঞ্জেলেসের ডলবি থিয়েটারে যখন লাল গালিচায় তারকারা হাঁটেন, তখন সবার চোখ থাকে রূপোলি পর্দার অস্কার–এর দিকে। কিন্তু বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এই নামের মাহাত্ম্য সম্পূর্ণ আলাদা। সুইডেনের বিখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিদ অস্কার ক্লেইন-এর স্মরণে ১৯৮৮ সাল থেকে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং নোবেল কমিটি ফর ফিজিক্স যৌথভাবে প্রদান করে অস্কার ক্লেইন মেডেল।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এই দুই অস্কারের মধ্যে কোনো সংযোগ আছে কি? উত্তর হলো–না। রূপোলি পর্দার অস্কার যেখানে মানুষের কল্পনার জগতকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার স্বীকৃতি, বিজ্ঞানের অস্কার ক্লেইন মেডেল সেখানে মহাবিশ্বের বাস্তব সত্যকে গণিতের সূত্রে খোঁজার সম্মান। একটি মানুষের আবেগকে নাড়া দেয়, অন্যটি মানুষের চেতনাকে প্রসারিত করে। স্টিফেন হকিং বা পিটার হিগসের মতো বিজ্ঞানিরা যে পদক পেয়েছিলেন, ২০২৬ সালের অক্টোবরে সেই গৌরবের মুকুট মাথায় তুললেন কলকাতার গবেষক অধ্যাপক অশোক সেন।
ব্ল্যাক হোল রহস্য: যেখানে আলোও হারিয়ে যায়
কী এই ব্ল্যাক হোল রহস্য যা ভেদ করতে অশোক সেন তার জীবনের চার দশক পার করে দিলেন?
সহজ কথায় বলা যায়–একটি বিশাল নক্ষত্র যখন তার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের মহাকর্ষ বলের চাপে নিজেই সংকুচিত হতে থাকে, তখন তৈরি হয় এক দানবীয় শক্তির কেন্দ্র। এর মহাকর্ষীয় টান এতটাই তীব্র যে, প্রতি সেকেন্ডে ৩ লাখ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা আলোও এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না।
কিন্তু রহস্যটা অন্য জায়গায়। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানি স্টিফেন হকিং দাবি করেছিলেন, ব্ল্যাক হোল পুরোপুরি কালো নয়, এখান থেকে এক ধরনের বিকিরণ বের হয়, যাকে বলা হয় হকিং রেডিয়েশন। যদি বিকিরণ বের হতেই থাকে, তবে ব্ল্যাক হোলের ভেতরে থাকা সমস্ত তথ্য কি একসময় ধ্বংস হয়ে যায়?
কোয়ান্টাম মেকানিক্স বলে–তথ্য কখনো ধ্বংস হয় না। এই যে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ (যা ব্ল্যাক হোলকে ব্যাখ্যা করে) এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্সের (যা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণিকাকে ব্যাখ্যা করে) মধ্যে এক বিরাট সংঘাত–একে বলা হয় ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্স।
অশোক সেনের ম্যাজিক: স্ট্রিং থিওরি ও ব্ল্যাক হোল এন্ট্রপি
এই দুই সাগরের মোহনায় দাঁড়িয়ে বাঙালি বিজ্ঞানি অশোক সেন তৈরি করলেন এক জাদুকরী সেতু। তিনি ব্যবহার করলেন ‘স্ট্রিং থিওরি’। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বের মূল ভিত্তি কোনো বিন্দু বা কণা নয় বরং অত্যন্ত সূক্ষ্ম, কম্পনশীল শক্তির সুতো বা ‘স্ট্রিং’। গিটারের তারের কম্পন যেমন ভিন্ন ভিন্ন সুর তৈরি করে, এই স্ট্রিংগুলোর কম্পনও তেমনই ইলেকট্রন, প্রোটন বা গ্র্যাভিটন তৈরি করে।
অশোক সেন গণিতের নিখুঁত জালে প্রমাণ করে দিলেন–ব্ল্যাক হোলের ভেতরে এক বিশাল ‘এন্ট্রপি’ বা বিশৃঙ্খলা লুকিয়ে আছে। তিনি আবিষ্কার করলেন ‘এস-ডুয়ালিটি’, যা পদার্থবিদ্যার খুব জটিল ও শক্তিশালী দুটি রূপকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। তার এই যুগান্তকারী কাজের ফলেই মানুষ প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, ব্ল্যাক হোল আসলে কোনো চিরস্থায়ী অন্ধকূপ নয়, এটিও মহাবিশ্বের নিয়মের অধীন এক পরম বিস্ময়। আর এই অনন্য অবদানের জন্যই ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর স্টকহোমের আলবানোভা সেন্টারে তার হাতে তুলে দেওয়া হলো অস্কার ক্লেইন মেডেল।
অনেকের মনেই প্রশ্ন আসতে পারে–কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরে থাকা ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা করে আমজনতার কী লাভ? মানবসভ্যতার বিকাশে এর প্রয়োজনীয়তা কোথায়? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলো এসেছে গভীর কৌতূহল থেকে।
প্রযুক্তির বিপ্লব: কৌতূহল থেকে উদ্ভাবন
কৃষ্ণগহ্বর রূপক অর্থে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অজানাকে অস্বীকার করলে অজানা দূর হয় না। বরং অনুসন্ধানের আলো জ্বালাতে হয় যুক্তি, প্রমাণ, আত্মসমালোচনা ও কৌতূহলের আলোতে।
কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশ পরবর্তী সময়ে সেমিকন্ডাক্টর, ট্রানজিস্টর, লেজার এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির ভিত্তি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদও কেবল মহাজাগতিক তত্ত্ব নয়। জিপিএস ব্যবস্থায় অত্যন্ত নির্ভুল অবস্থান নির্ণয়ের জন্য উপগ্রহের ঘড়িতে আপেক্ষিকতাজনিত প্রভাব বিবেচনা করতে হয়।
ওয়াই-ফাইয়ের বিকাশের সঙ্গে বেতার যোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন প্রকৌশলগত উদ্ভাবনের ইতিহাস জড়িত। তবে এটাও ধারনা করা যায় যে, কৃষ্ণগহ্বর থেকে রেডিও তরঙ্গ আবিস্কার এর গবেষণার বাই প্রোডাক্ট হিসাবে ওয়াই ফাই এর উদ্ভব ঘটে। তবে এটা সত্যি যে, মৌলিক গবেষণা এবং ব্যবহারিক প্রযুক্তির মধ্যে সংযোগ থাকতে পারে। কিন্তু সেই সংযোগের ধরন প্রতিটি ক্ষেত্র হয়ে থাকে আলাদা।
ভবিষ্যতের জ্বালানি ও সময় ভ্রমণ
আজই এমন হাইপোথিসিস নেওয়া যায় যে, ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষীয় শক্তিকে যদি কোনোদিন মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে শক্তির সংকট চিরতরে দূর হবে। কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটির রহস্য উন্মোচন করতে পারলে এক সময় ‘টাইম ট্রাভেল’ বা সময় ভ্রমণ এবং মহাবিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নিমেষেই পৌঁছে যাওয়ার ‘ওয়ার্মহোল’ প্রযুক্তি মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।
অস্তিত্বের প্রশ্ন
আমরা কোথা থেকে এসেছি- বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের ঠিক প্রথম সেকেন্ডে কী ঘটেছিল, তার উত্তর লুকিয়ে আছে ব্ল্যাক হোলের কেন্দ্রে। নিজেকে জানার চেয়ে বড় বিকাশ আর কী হতে পারে!
আলোয় ফেরা
অধ্যাপক অশোক সেনের এই আন্তর্জাতিক বিজয় শুধুমাত্র একটি পদক প্রাপ্তি নয়; এটি প্রতিটি সাধারণ মানুষের জন্য, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এক অপার জ্ঞানের দরজা খুলে যাওয়া। কলকাতার এক সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে যিনি আজ মহাবিশ্বের সীমানা মাপছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, আবিষ্কারের জন্য কোনো জাদুদণ্ডের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় অদম্য কৌতূহল আর চর্চার একাগ্রতা।
বিজ্ঞান কোন কঠিন বা নিরস বিষয় নয়, এটি হলো প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর কবিতা। যখন আমরা রাতের আকাশের দিকে তাকাই, তখন আমরা মূলত এক অনন্ত রহস্যের লাইব্রেরির দিকে তাকাই। অশোক সেনের এই অস্কারের জয় আমাদের মন ছবিতে এঁকে দেয়–মানুষের মস্তিষ্ক ক্ষুদ্র হতে পারে; কিন্তু তার চিন্তার জগত এই অসীম মহাবিশ্বের চেয়েও বড়। আমরা আকারে ক্ষুদ্র। আমাদের জীবনকাল মহাজাগতিক সময়ের তুলনায় অতি সামান্য। পৃথিবীও মহাবিশ্বের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তবু এই ক্ষুদ্র পৃথিবীতেই এমন প্রাণের উদ্ভব ঘটেছে, যারা নিজেদের উৎপত্তি, মহাবিশ্বের ইতিহাস এবং প্রকৃতির মৌলিক নিয়ম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারে। একটি বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো মহাবিশ্বের অতি ক্ষুদ্র এক প্রাণী মানুষের মস্তিষ্ক মহাবিশ্বকে বোঝার চেষ্টা করছে। এই অনুসন্ধান মানুষের মহত্ত্বকে তার আকারে নয় বরং প্রশ্ন করার ক্ষমতায় খুঁজে পায়। আর বিজ্ঞান কল্পনাকে নিষিদ্ধ করে না; বরং কল্পনা থেকে যাচাইযোগ্য প্রশ্ন তৈরি করতে শেখায়।
অস্কারের রূপোলি পর্দার চাকচিক্য মোহ শুধু নয়, আমাদের আরো খুঁজে দেখা দরকার প্রকৃতির ভেতরের সেই অদৃশ্য রূপালি সুতোগুলো, যা আমাদের এক সুতোয় বেধে রেখেছে জ্ঞানের মহাজাগতিক যাত্রার পথে।
লেখক: সাংবাদিক, ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকার