ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তার চতুর্থ মেয়াদে জয়ী হয়েছেন। ডানপন্থী প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে এক তীব্র ও কঠিন লড়াইয়ের পর তিনি এই জয়লাভ করেন। ৮০ বছর বয়সী এই নেতার প্রত্যাবর্তনকে যেকোনো মানদণ্ডেই অসাধারণ বলা যায়। তিনি মোট ভোটের ৫১.৮ শতাংশ পেয়েছেন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮.২ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ৪৪ লাখ ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়ী হয়েছেন। তবে ব্রাজিলের মেরুকরণে বিদ্ধ রাজনীতিতে কোনো বিষয়ই সহজে বা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয় না। গত রোববার নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই ফ্লাভিও বলসোনারো পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করেন এবং নির্বাচন বাতিলের দাবি জানান। ভোট গণনা শেষ হলেও, লুলা এবং পুরো ব্রাজিল সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়তে যাচ্ছে।
এই মাসের শুরুর দিকে নির্বাচনের প্রথম ধাপে লুলা পিছিয়ে পড়ার পর এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, ফ্লাভিও বলসোনারো—যিনি ব্রাজিলের বিতর্কিত সাবেক প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারোর ছেলে (যিনি ২০২২ সালে অভ্যুত্থান চেষ্টার দায়ে বর্তমানে গৃহবন্দি)—প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হয়ে যেতে পারেন। লাখ লাখ ব্রাজিলিয়ানের কাছে এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার এক গভীর আতঙ্ক। তারা ভাবছিলেন, দেশটি কীভাবে একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ককে সরিয়ে এমন একজনকে বেছে নিতে পারে, যার নাম জড়িয়ে আছে নানা কেলেঙ্কারির সঙ্গে? যার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে রিও ডি জেনিরোর মিলিশিয়া বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার, এমনকি ভাড়াটে খুনি ও প্রতারক ব্যাংকারদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতার কথা শোনা যায়!
ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপ যতই এগিয়ে আসছিল, ব্রাজিলের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ততই বাড়ছিল। আর নির্বাচনের দিনটির পরিস্থিতি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়াটি মোটেও নির্বিঘ্ন ছিল না। ভারী বৃষ্টিপাত এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্নের কারণে যখন কিছু ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পথে, তখন সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি—যিনি অতীতে লুলার ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন, উভয় পক্ষের অনুরোধে ভোটগ্রহণের সময়সীমা বাড়িয়ে দেন। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত উভয় পক্ষই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলতে থাকে। এই বিশৃঙ্খলা প্রমাণ করে যে, প্রায় এক দশক ধরে চলা গভীর মেরুকরণের ফলে ব্রাজিলের রাজনৈতিক পরিবেশ কতটা উত্তপ্ত ও জটিল হয়ে উঠেছে।
যাই হোক, লুলার জয় কেবল ব্রাজিলে নয়, বরং বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক শক্তির জন্য একটি বিজয়। এমন একটি অঞ্চলে—যেখানে ক্রমশ অসহিষ্ণু ও কর্তৃত্ববাদী শক্তির প্রভাব বাড়ছে—সেখানে বলসোনারোর সম্ভাব্য প্রেসিডেন্সি মোকাবিলার তাগিদে ভোটাররা দ্বিতীয় দফায় বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হন। তারা লুলার হাতে জয় তুলে দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, কষ্টার্জিত গণতন্ত্রকে রক্ষা করার দৃঢ় সংকল্প দেশটির জনগণের রয়েছে। এখন, বলসোনারো নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার হুমকি দেওয়ায়, ব্রাজিলের নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা একটি কঠিন পরীক্ষার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একদিকে যেমন সেই গণতান্ত্রিক ভিত্তির পরীক্ষা, যা ব্রাজিলবাসী সবেমাত্র রক্ষা করেছেন। অন্যদিকে এটি এমন একজন বামপন্থী নেতার জন্যও বড় পরীক্ষা, যিনি এমন এক অঞ্চলে টিকে আছেন যেখানে উগ্র ডানপন্থী শক্তির উত্থান ঘটছে।
ব্রাজিলের সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা সাবেক ধাতুশ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতা লুলা এমন এক সময়ে গণতান্ত্রিক বামপন্থার পতাকাবাহীর ভূমিকা গ্রহণ করেছেন, যখন বিশ্বজুড়ে প্রতিক্রিয়াশীল জনতুষ্টি আরও জোরালো ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তার ভাষণের কথা ধরা যাক: সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের জাতীয় পতাকার রঙের টাই পরা এক প্রবীণ ব্যক্তি, যার চেহারায় ছিল দৃঢ় সংকল্পের ছাপ, কণ্ঠে ছিল কিছুটা কর্কশ সুর। তিনি ‘মহাশক্তিধর দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার’-এর তীব্র নিন্দা করেন এবং যুক্তি দেন যে, সবচেয়ে অসহায় মানুষদের অবিচার ও যুদ্ধ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, বিশ্ব আজ বহুমুখীবাদ বনাম একমুখীবাদ, গণতন্ত্র বনাম চরমপন্থা এবং সার্বভৌমত্ব বনাম পরাধীনতার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আর এমন পরিস্থিতিতে, ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশের ওপর দায়িত্ব বর্তায় যেন তারা মাঝারি ও ছোট রাষ্ট্রগুলোকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করে।
লুলা সেই অল্প কয়েকজন বিশ্বনেতার একজন, যিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তার মুখোমুখি হতে দ্বিধা করেননি। সে সময় ট্রাম্প কঠোর শুল্ক আরোপের হুমকি, সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা এবং বলসোনারো পরিবারের সমর্থনপুষ্ট অন্যান্য শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্রাজিলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন। গত কয়েক বছরে বলসোনারো পরিবারের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা অনেক ব্রাজিলিয়ানকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। কারণ তারা মনে করত, এর ফলে ব্রাজিলের জাতীয় স্বার্থ ‘মাগা’ আদর্শের কাছে গৌণ হয়ে পড়তে পারে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ বাড়তে পারে। এর বিপরীতে, লুলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ব্রাজিল “কারও বাড়ির পেছনের আঙিনা (বা কারো অধীনস্থ এলাকা) হয়ে থাকতে রাজি নয়”, রোববার রাতে নিজের বিজয় ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
লুলা শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার শাসনামলের শুরুর দিকে তিনি ব্রাজিলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করেন এবং ‘বলসা ফামিলিয়া’ নামে একটি প্রশংসিত শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা কর্মসূচি চালু করেন, যা লাখ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসে। অতি সম্প্রতি, তিনি শক্তিশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ব্রাজিলে প্রচলিত ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ বিলুপ্ত করতে এবং সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ সীমা ৪৪ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৪০ ঘণ্টায় নামিয়ে আনতে তিনি তার রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়েছেন। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, তার পুনঃনির্বাচনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শ্রমজীবী মানুষ বিপুল সংখ্যায় তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল।
লুলা শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। ছবি: রয়টার্স
ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি সবসময়ই শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন, যাতে দেশের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলো করপোরেট আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা পায়। তিনি কৃষি-ব্যবসায়িক ও খনি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং আমাজন অঞ্চলে বন উজাড়ের হার প্রায় ৫০ শতাংশ কমাতে সহায়তা করেছেন। সম্প্রতি লুলা অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ করেছেন এবং বড় করপোরেট মুনাফা ও লভ্যাংশের ওপর কর আরোপ করেছেন। এছাড়া, অনলাইনে হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুল তথ্যের বিস্তার রোধে তিনি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে লুলার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। সমালোচকরা প্রায়ই তার বয়স, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে আপস করার প্রবণতা এবং তার দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন—যার ফলে দলে স্পষ্ট কোনো উত্তরসূরি তৈরি হয়নি। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে, গুয়ারুজার একটি সমুদ্রতীরবর্তী অ্যাপার্টমেন্ট সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি ৫৮০ দিন কারাগারে ছিলেন—এমন অভিযোগ যা দণ্ডাদেশ বাতিল হওয়ার পরেও তার পিছু ছাড়েনি।
তবে ব্রাজিলের ভোটাররা বুঝতে পেরেছিলেন যে, লুলার বিকল্প হিসেবে যা সামনে এসেছিল, তা কেবল একটি রক্ষণশীল পরিবর্তনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। ফ্লাভিও বলসোনারো এমনভাবে তার নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছিলেন যা ব্রাজিলের ডানপন্থীদের সবচেয়ে অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলোকে উসকে দেয়। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সাংস্কৃতিক অসন্তোষকে পুঁজি করেছিলেন। তবে এর চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক হলো বলসোনারোর প্রাতিষ্ঠানিক এজেন্ডা। তিনি সরাসরি বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি তার বাবাকে ২০২২ সালের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার দায় থেকে ক্ষমা করে দেবেন। এমনকি তিনি স্বীকার করেছেন যে, এর ফলে সরকারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে এমন এক প্রাতিষ্ঠানিক সংঘাত তৈরি হতে পারে যেখানে ‘বলপ্রয়োগের’ প্রয়োজন পড়তে পারে। এছাড়া, তিনি প্রেসিডেন্টের মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সাংবিধানিক সংশোধনেরও কথা বলেছিলেন। আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এসব পদক্ষেপ ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাতের শামিল হবে।
লুলার জয় উদ্যাপনের যোগ্য। এটি বলসোনারো পরিবারের আধিপত্যের মুখে একটি কঠোর জবাব দিয়েছে এবং আপাতত তাদের প্রতিশোধমূলক এজেন্ডাকে থামিয়ে দিয়েছে। তবে লড়াই এখানেই শেষ নয়। সোমবার লাখ লাখ ব্রাজিলিয়ান উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করছিলেন—বলসোনারো শিবির পরবর্তী কী পদক্ষেপ নেয় এবং ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো রোববারের নির্বাচনের ফলাফলকে সমুন্নত রাখে কি না, তা দেখার জন্য।
লুলার ফিরে আসাকে ব্রাজিলে ডানপন্থীদের চূড়ান্ত পরাজয় বলে ভুল করা উচিত হবে না। আগামী বছর থেকে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ও সিনেট—উভয় জায়গাতেই ডানপন্থীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। এছাড়া অনেক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর পদও তাদের দখলে থাকবে। লুলার জয় ছিল তার লড়াইয়ের কেবল শুরু মাত্র। এখন তার সামনে রয়েছে আরও কঠিন কাজ—এমন একটি জাতিকে শাসন করা, যা আগে কখনো এতটা বিভক্ত ছিল না।
লেখক: সাহিত্য বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘আ হোরতালিসা’-র সম্পাদক।
(লেখাটি নিউইয়র্ক টাইমসের সৌজন্যে প্রকাশিত হলো।)