কখনও পিটিয়ে মেরে ফেলার ডাক দেওয়া হচ্ছে। কখনও পিটিয়ে মেরেই ফেলা হচ্ছে। কখনও শুধু মেরে ফেলেই শান্ত হওয়া হচ্ছে না, বরং মৃত ব্যক্তির লাশকেও আগুনে পোড়ানো হচ্ছে। আমাদের দেশে এই ধারাবাহিকতায় নতুন যে সংযুক্তি সেটি হলো, একেবারে সমাবেশ করে প্রকাশ্যে মব করার হুমকি দেওয়া!
সম্প্রতি এভাবেই প্রকাশ্যে মব করার হুমকি দেওয়া হয়েছে এক আবাসিক মাদরাসায় এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের ঘটনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। গত বুধবার গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (৭) যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মোসলেম আহম্মদ (৩০) নামের এক মাদরাসাশিক্ষককে মারধর করে পুলিশে দেয় স্বজন ও এলাকাবাসী। অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের কয়েকটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাতে ওই শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরের ঘটনা দেখা যায়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেছেন। আবার ভাঙচুর ও শিক্ষকদের মারধরের অভিযোগে থানায় পৃথক অভিযোগ দেয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। পরে সাত বছর বয়সী ওই মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।
তবে এই প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার বিষয়টি জানার আগেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে শুরু হয়ে যায় নানা ধরনের আলোচনা। দুটি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে এরই মধ্যে। এক পক্ষ নিয়েছে শিশুটির বাবার পক্ষ, আরেকটি নিয়েছে মাদরাসাশিক্ষকের পক্ষ। এবং দুই পক্ষই একে, অপরের বিরুদ্ধে হুমকি, ধমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে। এরই মধ্যে শিশুটির বাবা এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদরাসায় গিয়েছিলেন, কোনো ধরনের মব সৃষ্টি করতে নয়। নিজের বিরুদ্ধে ওঠা মাদরাসা ভাঙচুর ও ১৭ লাখ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন তিনি। সেই সঙ্গে তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। এ ছাড়া নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তাও চেয়েছেন শিশুটির বাবা।
ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা কেন আলাদা করে নিরাপত্তা চেয়েছেন? কারণ তার দাবি, এই ঘটনার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে তার বাড়িতে মব করার প্রকাশ্য হুমকির ভিডিওতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো সয়লাব। এক সংবাদ সম্মেলনের ওই ভিডিওতে অসংখ্যা ক্যামেরার সামনেই হুমকিদাতাদের হুমকি দিতে দেখা গেছে। তারা ওই শিশুটির বাড়িতে গিয়ে মব করার হুমকি দিয়েছেন। একেবারে ‘মব’ শব্দটি উল্লেখ করেই বলা হয়েছে এবং ‘পুনরায় মব সৃষ্টি’র হুমকি দেওয়া হয়েছে। আর পুলিশ বলছে, উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ করেছে। পুলিশ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
শেষটায় পুলিশের যে বক্তব্যের কথা উল্লেখ করা হলো, সেটি একেবারেই চিরাচরিত এবং পরিচিত একটি পুলিশি বক্তব্য। অভিযোগ তুলে মব করে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলার পরও আমরা পুলিশের কাছ থেকে এমন বক্তব্যই প্রাথমিকভাবে শুনে থাকি। ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস মেলে। কিন্তু সেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাটি নেওয়া হয় কতটা?
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে সদ্য প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গণপিটুনি বা মব (সংঘবদ্ধ) সহিংসতার ঘটনায় দায়ের হওয়া কোনো মামলাই এখনো বিচারপর্যায়ে পৌঁছায়নি। এই সময়ের পর বেশ কিছু আলোচিত মব সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসবের মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তোফাজ্জল হোসেন হত্যা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শামীম মোল্লা হত্যা, রংপুরের তারাগঞ্জ-কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় চোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যা , রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলার দরবারে হামলা ও মরদেহে অগ্নিসংযোগের ঘটনা কিংবা ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার ঘটনাটিও আছে। এতসব মামলার একটিরও বিচার শেষ হয়নি। বিচারিক প্রক্রিয়ার অগ্রগতিও থমকে রয়েছে বলে জানাচ্ছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ওই প্রতিবেদন।
তো, মবের বিচার করার হাল যদি এমন হয়, তবে কে আর পুলিশের ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেওয়ার আশ্বাসে বিশ্বাস করবে? কে ভাবতে পারবে যে, মব করে আসলে পার পাওয়া যায় না?
মূলত মবের ক্ষেত্রে বিচারহীনতার এই সংস্কৃতিই দেশের সংশ্লিষ্ট উৎসাহী পক্ষগুলোকে মব করতে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৭ মাসে (২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) দেশে মব ভায়োলেন্সের অন্তত ৪১৩টি ঘটনায় ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ সময় মাসওয়ারি মৃত্যুর গড় দেখা যাবে ১৬–এর কাছাকাছি। মূলত এই সময় থেকেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই ভয়াবহ প্রাণসংহারী প্রবণতাটি প্রকট হয়ে ওঠে।
অবশ্য গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির অসাধারণ কোনো উন্নতি আসেনি। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) হিসাবে, একই সময়ে ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত ও ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
অবশ্য সরকার এই হিসাব স্বীকার করছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত তুলনামূলক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতার ৬৩টি ঘটনা ঘটেছে। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১০৭টি। সরকারি হিসাবে, এ সময়ে নিহতের সংখ্যা ৬৩ থেকে কমে ৪০ জনে এবং আহতের সংখ্যা ৮২ থেকে কমে ৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, এই সময়ে মব সহিংসতার ঘটনা কমেছে ৪১ দশমিক ১২ শতাংশ।
এখন মবের মাত্রার এমন বিপরীতমুখী সরকারি, বেসরকারি দাবিনামার মধ্যে একেবারেই আমজনতা হিসেবে আমরা অন্তত এটুকু বুঝতে পারছি যে, মব তিরোহিত হয়নি। উল্টো বেশ আয়েশ করেই যে সেটি টিকে আছে, সেটি কিছুদিন পর পরই নানা আলোচিত মবের ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে ভালোমতোই। সমস্যা হলো, সরকার বা বিরোধীদল বা অন্য নানা পক্ষ তো নানা ধরনের তর্ক–বিতর্ক করে ‘কেল্লা ফতে’ করে দিতে পারছে। কিন্তু, সাধারণ মানুষদের অসীম নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতির কী হবে?
সমস্যা হলো, মব সহিংসতাকে মাঝে মাঝেই ক্ষমতা কাঠামো থেকে এক ধরনের ‘ক্লিন চিট’ দেওয়া হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নেওয়া হয় দায়সারা কিছু পদক্ষেপ। এই প্রবণতাই মববাজদের কাজ চালিয়ে যাওয়ায় ঘি, তেল ঢালে। কারণ পক্ষভেদে মব কখনো হয়ে যায় ‘প্রেশার গ্রুপ’, কখনো হয়ে যায় ‘সংশ্লিষ্টদের ক্ষোভ প্রকাশ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ, নিজেদের পক্ষে গেলে ‘মব’ হয়ে যায় ‘গুড জব’। নিজেদের বিপক্ষে হওয়া মবকেই মনে করা হয় সত্যিকারের মব। তাই শুধু অন্যায় আচরণ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বৈশিষ্ট্য মেনে সব মবকে চিহ্নিত করা হয় না।
ফলে মব আর কখনো থামে না। এভাবে বছরের পর বছর নিজেদের দেশের মাটিতেই পক্ষ, আদর্শ নির্বিশেষে মবের বিচার করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি, হয়ে চলেছি। ফলে মববাজ বা মবলাভারদের প্রতি কোনো ‘কড়া বার্তা’ পৌঁছায়নি আসলে। তাই হয়তো এখন বাড়ি গিয়ে মব করার প্রকাশ্য হুমকিও মিলছে। সার্বিকভাবে চিরতরে মব বন্ধ করার কাজটি তাই সোনার পাথরবাটিতে রূপ নিচ্ছে ধীরে ধীরে।
সোনার পাথরবাটি—ঠিক এই শব্দটি লেখার সময়ই টিভির পর্দায় ভেসে উঠল একটি ‘ব্রেকিং নিউজ’ টিকার। তাতে বলা হচ্ছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে স্কুলের একজন প্রধান শিক্ষককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বিস্তারিত তথ্য তখনো মেলেনি। হয়তো এই লেখা প্রকাশ হতে হতে বিস্তারিত সবই সংবাদমাধ্যমে চলেও আসবে। আগেই অবশ্য অনুমান করে ফেলা যায় সেই বিস্তারিত সংবাদটি। বিস্তারিত খবরে অবশ্যই পাওয়া যাবে একটি ‘বায়বীয়’ অভিযোগ, এরপর একটি গোষ্ঠীবদ্ধ ‘ক্ষুব্ধ জনতা’র উপস্থিতি পরিলক্ষিত হবে। আর তার পরেই আসবে একটি লাশ!
হয়তো এই ব্রেকিং নিউজটিই এক সময় হয়ে যাবে ছাপা পত্রিকার ভেতরের পাতায় এক চিপায় পড়ে থাকা একটি সিঙ্গেল কলাম নিউজ। কেউ পড়বে, কেউ দেখবেই না। কিন্তু ওই লাশের পরিবারটি চক্কর খাবে ন্যায় বিচারের আশায়। এই দেশ, দেশ চালানো সরকার বা এই সমাজ কি ততটুকু আশা করতেও এখন ‘না’ বলতে চায়? বর্তমান পরিস্থিতির ভাবগতিক বলছে—হয়তো তাই!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা