
চড়ের মহিমা ও বিপদ
চড় জিনিসটা বড় অদ্ভুত। এক টুকরো হাতের তালু, কয়েক আউন্স রাগ, সামান্য সাহস আর এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—ব্যস, ইতিহাস তৈরি! কেউ চড় মেরে বীর, কেউ চড় খেয়ে শহীদ, কেউ আবার চড়ের ভিডিও ভাইরাল করে রাতারাতি তারকা।

আমরা ভেবেছিলাম, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আঁতাতের রাজনীতি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আঁতাত মানে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। আঁতাত মানে প্রকাশ্যে এক কথা বলে তার বিপরীতে কাজ করার রাজনীতি। উদ্বেগের কথা হলো নির্বাচিত সরকারের আট মাসের মাথায়, রাজনৈতিক আঁতাতের কথাটি জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।
কে কার সঙ্গে আঁতাত করছে? সরকারি ও বিরোধীদল- দুই পক্ষই একে অপরকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। সরকারি দল ব্যস্ত নানা অভিযোগ তুলে বিরোধীদলকে ঘায়েল করতে। আর বিরোধীদল সরকারের ব্যর্থতার সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে চাইছে। সেটা নেবে। কিন্তু সেখানে নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সামনে টেনে আনা কেন?
যখন প্রকাশ্যে কারও নীতির বিরোধিতা করে তলে তলে তাদের সঙ্গে সখ্য তৈরি করা হয়, সেটাকেই আঁতাতের রাজনীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঁতাত শব্দটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সব সময়ই ব্যবহৃত হতো। এখনো হচ্ছে। সরকারি ও বিরোধীদল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে কথায় কথায় তুলোধুনো করে, আবার একে অপরের বিরুদ্ধে সেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপসরফা ও আঁতাতের অভিযোগ আনে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ব্যর্থতা যেমন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, তেমনি নিষিদ্ধ দলটির অপরিহার্যতাও প্রমাণ করছে।
বিএনপির নেতাদের দাবি, সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিরোধীদল আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহীর মাদরাসা মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় বলেছেন, “পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, আওয়ামী লীগ এবং জামায়াত দুই পক্ষ এক হয়েছে।” সরকারের কাছে যদি সত্যি সত্যি পরিষ্কার তথ্য থাকে, সেটা জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। সেটা না করে অনির্দিষ্ট অভিযোগ আনলে মানুষ সরকারকেই সন্দেহের চোখে দেখবে।
প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ ও জামায়াত মিলে ‘এক’ হওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু কীভাবে? এই মুহূর্তে জামায়াতে ইসলামী সংসদে প্রধান বিরোধীদল হলেও নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকার এসে উল্টে দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়টি তারা ঠিকই রেখে দিয়েছে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মূলত জামায়াত ও আন্দোলনকারী ছাত্রনেতৃত্বের একাংশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তখন বিএনপির নেতারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, আইন করে কোনো দল নিষিদ্ধ করা হোক সেটা তারা চান না। প্রকাশ্যে তারা যাই বলুন না কেন আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় মনে মনে খুশি হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করা যায়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। নেতা-কর্মীদের একাংশ জেলখানায়। একাংশ বিদেশে। অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের কেউ কেউ নির্যাতন, হয়রানি এড়াতে বিএনপির নেতাদের নানা রকম নজরানাও দিচ্ছেন। আবার সেই আওয়ামী লীগই সরকারি ও বিরোধীদলের আলোচনার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
দলের চেয়ারম্যান কোনো কথা বললে, তার উপদেষ্টা ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর নৈতিক দায়িত্ব এসে পড়ে, সেটাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা। সেই কাজটি তারা করেছেনও। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ঢাকায় এক সমাবেশে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেছেন, “ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আঁতাত রয়েছে।” গত ২১ অক্টোবর জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার ‘দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত করছে’ ক্ষমতাসীন বিএনপি বলে যে অভিযোগ করেছিলেন, তারই জবাব দিলেন রুহুল কবীর রিজভী।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পাটির নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ আরেক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, “বিএনপির মুখে জুলাই, কিন্তু অন্তরে আওয়ামী লীগ- এমন একটি সম্পর্ক দেশের রাজনীতিতে অস্বস্তি তৈরি করেছে।” মুখে জুলাই অন্তরে আওয়ামী লীগ আরও কার কার মধ্যে আছে, তা এনসিপির তৃণমূল পর্যায়ের কমিটির তালিকা দেখলেই স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গুপ্ত-সুপ্ত’ বিতর্কও চলছে। গত ১ অক্টোবর ফেনীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, “তাদেরকে কখনো রাজপথে দেখেছেন? তারা রাজপথে ছিল না। এই তারা এবং ওরা, ওই যে যারা পালিয়ে গেছে, স্বৈরাচার এবং গুপ্ত- তারা আবার একসঙ্গে হয়েছে। বরাবরই তো তারা একসঙ্গে ছিল। ১৯৯১ সালেও তারা একসঙ্গে ছিল, ১৯৮৬ সালেও একসঙ্গে ছিল। গত নির্বাচনের সময়ও তারা একসঙ্গেই ছিল, তলে তলে কাজ করেছিল। এ জন্য তাদেরকে গুপ্ত বলা হয়।”
জামায়াতও একইভাবে তলে তলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির সখ্য গড়ে তোলার অভিযোগ করেছে। এদিকে সরকারের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ বলেছেন, “সরকার বা বিএনপি যদি ক্ষমতায় থাকতে না চায়, তবে জোর করে তাদের ক্ষমতায় রাখা সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে তিনি ঠাকুরগাঁও উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য কারচুপি সম্পর্কে সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।”
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালের মাগুরা উপনির্বাচনের পর এক দফার রাজনীতি শুরু হয়।
মাগুরা উপনির্বাচন হয়েছিল বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার তিন বছরের মাথায়। আর এবার ঠাকুরগাঁওয়ে হচ্ছে ৯ মাসের মাথায়। অর্থাৎ এই ৯ মাসেই বিএনপির প্রতি কঠোর বার্তা দিচ্ছে বিরোধীদল। সেই সময়ে প্রকাশ্যে বিরোধীদল ছিল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত। তখন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জামায়াত ছিল ছোট শরিক। এবারে তারা বড় শরিক হতে চায়।
রাজনীতিতে ‘আঁতাত’, ‘ষড়যন্ত্র’ তখনই ডালপালা মেলে যখন সুস্থ ধারা অসম্ভব হয়ে পড়ে। নির্বাচনের আট মাসের মাথায় দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি দেখে মনে হচ্ছে, আর যাই-ই হোক তারা জনগণের মনে ভাষা বুঝতে অক্ষম। এই মুহূর্তে জনগণের মৌলিক সমস্যা হলো নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি। কিন্তু সরকারি বা বিরোধীদল এসব নিয়ে কিছু বলছে না। এমনকি সৌদি আরব যে অন্যায়ভাবে সরকারকে না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদ ঘটাল, তা নিয়েও একটি কথা উচ্চারণ করেনি। হয়তো করার মতো সাহসও তাদের নেই। এ কারণেই ‘আঁতাত ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ হাজির করছে একে অপরের বিরুদ্ধে।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সরকারি ও বিরোধীদল আলোচনার মাধ্যমে জনগণের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করে থাকে। সেখানে জাতীয় সংসদ হয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু তারা কেউ সেই পথে যাচ্ছেন বলে মনে হয় না। দুই পক্ষই একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভ করতে চাইছে।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা।

চড়ের মহিমা ও বিপদ
চড় জিনিসটা বড় অদ্ভুত। এক টুকরো হাতের তালু, কয়েক আউন্স রাগ, সামান্য সাহস আর এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—ব্যস, ইতিহাস তৈরি! কেউ চড় মেরে বীর, কেউ চড় খেয়ে শহীদ, কেউ আবার চড়ের ভিডিও ভাইরাল করে রাতারাতি তারকা।

ব্যাটারি রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকার আসলে কী করতে চায়?
অভিজ্ঞতাটি একেবারেই আটপৌরে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানবগোষ্ঠীর একজন হিসেবে এই বান্দাকে নিয়মিতই অর্থকরী কাজে অংশ নিতে হয়। বাসা থেকে অফিসপাড়ার দূরত্ব বেশ। পকেটের পয়সা বাঁচানোর চিন্তা মাথায় প্রবলভাবে থাকলে তাই মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাদ দিয়ে তিন চাকার রিকশার দিকে হাত বাড়াতে হয়।

সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ ও সরকারি-বিরোধীদলের আশ্চর্য ঐকমত্য
বাংলাদেশকে যে বাইরের দুনিয়া মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নারী–পুরুষের শিরচ্ছেদের ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র। নিকট অতীতে এ রকম উদাহরণ আরও অনেক আছে। বিদেশে গিয়ে কোনো নাগরিক আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত বা বিচারের মুখোমুখি হলে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী স্বাগতিক দেশের জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে

এই দেশে যেভাবে সাংবাদিকদের ‘হত্যাযোগ্য’ করে তোলা হয়
কিছুদিন পরপরই আমরা কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিয়ে নানা বক্তব্য শুনতে পাই। এই যেমন, ‘সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে’, ‘সাংবাদিকদের স্বাধীনতা জাতির জন্য অতীব প্রয়োজন’, ‘সংবাদমাধ্যমের প্রতি হুমকি সহ্য করা হবে না’ ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বক্তব্য যেমন সরকারি