চড় জিনিসটা বড় অদ্ভুত। এক টুকরো হাতের তালু, কয়েক আউন্স রাগ, সামান্য সাহস আর এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—ব্যস, ইতিহাস তৈরি! কেউ চড় মেরে বীর, কেউ চড় খেয়ে শহীদ, কেউ আবার চড়ের ভিডিও ভাইরাল করে রাতারাতি তারকা। তবে চড়ের মাহাত্ম্য বুঝতে হলে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার দিকে তাকানো দরকার। এখানে চড় শুধু শারীরিক আঘাত নয়, এটি ক্ষমতার ভাষা, শাসনের সংস্কৃতি, দাপটের প্রকাশ এবং কখনো কখনো অসহায় মানুষের শেষ প্রতিবাদ।
গাজীপুরের টঙ্গীতে প্রথম শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মোসলেহ উদ্দিন নামের এক মাদ্রাসাশিক্ষককে চড় মেরে আলোচনায় এসেছেন এক অভিভাবক। ঘটনাটি ঘটেছে আউচপাড়া এলাকার একটি মাদ্রাসায়। অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ অপরাধ। একটি শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শৈশবের ওপর এমন আঘাত কোনোভাবেই তুচ্ছ করে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের বিচার হওয়া চাই, শিশুটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা চাই এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও হওয়া চাই। কিন্তু এরই মধ্যে চড়টি হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যেন শিক্ষক কী করেছেন, শিশুটি কী যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছে, প্রতিষ্ঠান কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে—এসবের চেয়ে বড় প্রশ্ন, অভিভাবকটি চড় মারলেন কীভাবে!
আমাদের সমাজে চড়ের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। ছোটবেলায় ভাত-মাছ, মুড়ি-মুড়কি যেমন খেয়েছি, তেমনি নিয়মিত চড়ও খেয়েছি। বাড়িতে মা-বাবার শাসন, স্কুলে শিক্ষকের অনুশাসন, পাড়ায় বড় ভাইদের কর্তৃত্ব—সবখানেই চড় ছিল সহজলভ্য। তখনকার অনেক পরিবারে চলতো একধরনের পারিবারিক সামরিক শাসন। সংবিধান ছিল না, বিচার বিভাগ ছিল না, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগও ছিল সীমিত। পান থেকে চুন খসলেই গালে পড়ত তালুর ছাপ। প্রশ্ন করলে আরেকটি, প্রতিবাদ করলে তো কথাই নেই! অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারিত হতো না; শাসকের মেজাজই ছিল দণ্ডবিধি।
আমরাও কম নির্লজ্জ ছিলাম না। প্রতিদিন চড় খেয়েও শিক্ষা হতো না। একই অপরাধ বারবার করতাম, একই গালে বারবার আঘাত আসত। এখন বুঝি, সে সময় আমাদের চরিত্রের চেয়ে বড় সমস্যা ছিল শাসনব্যবস্থার। শিশুকে বোঝানোর চেয়ে চড় মারা সহজ, যুক্তি দেওয়ার চেয়ে ধমক দেওয়া সস্তা, আর নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে অন্যের গাল নিয়ন্ত্রণ করা অনেকের কাছে বেশি আরামদায়ক।
চড়ের পক্ষে আমাদের সমাজে তত্ত্বেরও অভাব নেই। ‘শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে’—এই বাক্যটি বহুদিন ধরে অত্যাচারী মানুষের আত্মপক্ষ সমর্থনের লাইসেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। যেন সোহাগ করার অধিকার যার আছে, চড় মারার অধিকারও তার আছে! মনের মানুষ বাম গালে চড় মারলে ডান গাল পেতে দেওয়ার উপদেশও কম জনপ্রিয় নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ভালোবাসা কি আঘাতের অনুমতিপত্র? শাসন কি অপমানের বৈধ দলিল? আর যে ব্যক্তি নিজের রাগ সামলাতে পারেন না, তিনি অন্যের চরিত্র গড়ার দায়িত্ব পেলেন কীভাবে?
এখন অবশ্য সময় বদলেছে। শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে কথা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের প্রতিবাদ হচ্ছে, পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন ও সচেতনতা বাড়ছে। তবু আমাদের সমাজে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়ে গেছে। নিজের সন্তানকে কেউ চড় মারলে আমরা অনেক সময় বলি, ‘বাবা-মা তো শাসন করবেই!’ অথচ অন্যের সন্তানকে কেউ আঘাত করলে ক্ষোভে ফেটে পড়ি। আবার ঘরের নারীর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় অনেকেই নীরব থাকেন, কিন্তু প্রকাশ্যে কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে কেউ চড় মারলে নীতিবোধ হঠাৎ জেগে ওঠে। অর্থাৎ চড়ের নৈতিকতা নির্ধারিত হয় আঘাতের ধরন দিয়ে যতটা, তার চেয়ে বেশি নির্ধারিত হয় কে মারছে, কাকে মারছে এবং দর্শকের রাজনৈতিক পছন্দ কী।
চড়ের আরেকটি বড় গুণ হলো, এটি ক্ষমতার পরিচয়পত্র। সাধারণ মানুষ ক্ষমতাবানকে চড় মারলে সেটি খবর; ক্ষমতাবান সাধারণ মানুষকে চড় মারলে সেটি অনেক সময় ‘শাসন’। দলীয় নেতা সহকর্মীকে চড় মারলে বলা হয়, পারিবারিক বিষয়। শিক্ষক ছাত্রকে মারলে বলা হয়, শৃঙ্খলা রক্ষা। স্বামী স্ত্রীকে মারলে কেউ কেউ বলেন, সংসারের ব্যাপার। কিন্তু দুর্বল কেউ প্রতিবাদ করলে সঙ্গে সঙ্গে শৃঙ্খলা, সংস্কৃতি, সম্মান ও আইনের কথা মনে পড়ে যায়। আইন যেন ক্ষমতাবানের হাতে নরম বালিশ, আর ক্ষমতাহীন মানুষের হাতে কাঁটার মুকুট!
বিদেশেও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের চড় খাওয়ার নজির আছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ কিংবা ভারতের রাজনীতিক অরবিন্দ কেজরিওয়াল প্রকাশ্যে চড় খেয়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। এসব ঘটনা নিয়ে তুমুল আলোচনা হয়েছে। কিন্তু গণতন্ত্রে ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করা নাগরিকের অধিকার; চড় মেরে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া নয়। একইভাবে, ক্ষোভ থাকলেই শারীরিক আক্রমণ বৈধ হয়ে যায় না। তবে ক্ষমতাবানদের নিরাপত্তাবেষ্টনী যত উঁচু হয়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের ভাষা তত দূরে সরে যায়। সেই ক্ষোভের কারণ বুঝতে না চাইলে একদিন তা অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্ফোরিত হতে পারে। চড় সমস্যার সমাধান নয়, কিন্তু চড়ের পেছনের ক্ষোভকে উপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
টঙ্গীর ঘটনাটিও তাই শুধু একটি চড়ের গল্প নয়। এটি শিশুদের নিরাপত্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার প্রশ্ন। অভিভাবকের মনে যদি এমন ধারণা জন্মায় যে শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ধরেও প্রতিকার পাওয়া যাবে না, তাহলে ক্ষোভ ব্যক্তিগত প্রতিশোধের পথে যেতে পারে। কিন্তু সভ্য সমাজের দায়িত্ব হলো সেই পরিস্থিতি তৈরি হতে না দেওয়া। অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করতে হবে, শিশুকে নিরাপদ রাখতে হবে, অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় বিচার করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বও খতিয়ে দেখতে হবে। চড়ের ভিডিও ভাইরাল হলেই ন্যায়বিচার সম্পন্ন হয় না।
আরেকটি বিপদ আছে। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই জনতার আদালত বসে যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা, অপমান করা কিংবা শারীরিক আক্রমণকে বীরত্ব হিসেবে উদ্যাপন করা খুব সহজ। কিন্তু অভিযোগের গুরুত্ব যত বেশি, তদন্ত ও বিচারের প্রয়োজনও তত বেশি। শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ভয়াবহ বলেই সেটিকে আবেগের ঢেউয়ে ভাসিয়ে না দিয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা জরুরি।
আমাদের দেশে দুর্বল মানুষ কতভাবে চড় খায়, তার হিসাব কে রাখে? শ্রমিক মজুরি চাইতে গিয়ে অপমানিত হন, কৃষক ন্যায্য দাম না পেয়ে অসহায় হন, শিক্ষার্থী অধিকার চাইতে গিয়ে মার খান, নারী প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন। এসব চড়ের সবই হাতের তালু দিয়ে মারা হয় না। কোনোটি আসে ক্ষমতার দাপটে, কোনোটি প্রশাসনিক অবহেলায়, কোনোটি সামাজিক অপমানে। গালে দাগ থাকে না, কিন্তু আত্মসম্মানে ক্ষত তৈরি হয়। আর এসব আঘাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গেলেই অনেক সময় শুনতে হয়—‘এত বাড়াবাড়ি কেন?’
টঙ্গীর ঘটনাটি কেবল একজন অভিভাবক একজন শিক্ষককে চড় মারার ব্যাপার নয়। এর পেছনে রয়েছে নিপীড়ন ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। এই ঘটনার বড় শিক্ষা হলো, শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠার আগেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকা দরকার; অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার; আর কোনো প্রতিষ্ঠানই যেন নিজের মর্যাদার আড়ালে অপরাধের অভিযোগকে চাপা দিতে না পারে। আদর করার নামে বিকৃতি মোটেও সহ্য করার মতো ঘটনা নয়।
চড়ের মহিমা নিয়ে আমাদের সমাজে বহু কৌতুক, বহু স্মৃতি, বহু বীরত্বগাথা আছে। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে হাস্যরসের চেয়ে জরুরি জবাবদিহি। কারণ গালে চড় পড়লে শব্দ হয় একবার, অথচ ন্যায়বিচার না পেলে ক্ষতটি বয়ে বেড়াতে হয় অনেক দিন। সভ্যতার পরীক্ষা কে কাকে চড় মারল, সেখানে নয়; পরীক্ষা হলো, দুর্বল মানুষের গালে আর যেন ক্ষমতার চড় না পড়ে, শিশুর শৈশব যেন কারও বিকৃতির শিকার না হয়, আর ন্যায়বিচারের জন্য কোনো অভিভাবককে নিজের হাতকেই শেষ ভরসা ভাবতে না হয়।
চিররঞ্জন সরকার: লেখক ও গবেষক