জর্ডানে শুক্রবার একটি গির্জায় শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে বন্দুকধারীদের গুলিতে সাতজন নিহত হয়েছে। দেশটির জননিরাপত্তা অধিদপ্তরের প্রধান এ তথ্য জানিয়েছেন। জর্ডানের খ্রিষ্টান সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে চালানো এ ধরনের হামলা বিরল। কর্তৃপক্ষ একে উগ্রপন্থীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে বর্ণনা করেছে।
এক সংবাদ সম্মেলনে মেজর জেনারেল আবদুল্লাহ আল-মায়েতাহ বলেন, কারাক গভর্নরেটের হামুদ গির্জায় গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহতদের বেশির ভাগই এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছে। হামলাকারীদের ধরতে অভিযান চলছে। দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ৪০ জন আহত হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিন আল-ফারায়েহ বলেন, হামলাটি ‘উগ্রপন্থীরা’ চালিয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে জর্ডানের ভেতরে বা বাইরে পরিচিত কোনো গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা বলার সময় এখনো আসেনি।
তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল দেশ জর্ডানে এ ধরনের হামলা অত্যন্ত বিরল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা ইসলামপন্থী জঙ্গিদের একাধিক হামলার চেষ্টা নস্যাৎ করেছে।
এখন পর্যন্ত কেউ এ হামলার দায় স্বীকার করেনি।
জর্ডানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল আল-মামলাকা একটি ভিডিও সম্প্রচার করেছে। ভিডিওটি গির্জার নিরাপত্তা ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এতে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে তিনজনকে গির্জা লক্ষ্য করে গুলি চালাতে এবং পরে গাছ ও নিচু দেয়ালের আড়ালে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। এরপর হামলাকারীদের গির্জার প্রবেশপথের দিকে দৌড়ে যেতে দেখা যায়। গির্জার প্রবেশপথ, চারপাশের দেয়াল এবং অন্য বিবরণের সঙ্গে মিলিয়ে রয়টার্স ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করেছে।
জর্ডানের প্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, “এটি সন্ত্রাসী মতাদর্শ ও অন্ধ উগ্রবাদের ফল। আমরা সমাজকে এই পথে যেতে দেব না।”
শেষকৃত্যের অনুষ্ঠানে উপস্থিত খালেদ বুরকান আল-মামলাকাকে বলেন, সেখানে কয়েক ডজন মানুষ উপস্থিত ছিল। বন্দুকধারীরা কয়েক মিনিট ধরে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ইহাব আম্মারিন টেলিভিশন চ্যানেলটিকে বলেন, হামলার পর তিনি রক্তাক্ত মানুষদের মেঝেতে লুটিয়ে পড়তে দেখেছেন। তিনি বলেন, “মানুষ কাঁদছিল, বিলাপ করছিল, চিৎকার করছিল—ঘটনাটি বর্ণনা করা কঠিন।”
মেঝেতে লেগে ছিল রক্ত
জঙ্গি ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদার জর্ডানের রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ হামলার কয়েক ঘণ্টা পর কারাকে যান। তিনি বলেন, অপরাধীদের “কঠোর হাতে” শাস্তি দেওয়া হবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “কারাকে সন্ত্রাসী হামলার জবাব দেওয়া হবে সবচেয়ে কঠোরভাবে। যারা মনে করে, গুলির মাধ্যমে জর্ডানিদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারবে, আমাদের ঐক্যের সামনে তাদের সেই চেষ্টার কোনো সুযোগ নেই।”
হামলার পর গির্জার ভেতরের ভিডিওচিত্রে প্রবেশপথের কাছে মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায়। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছিল।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক্সে দেওয়া এক পোস্টে এ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, বেসামরিক মানুষ ও উপাসনালয়ে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আহতদের সহায়তা দিতে কারাকের একটি সরকারি হাসপাতালের সামনে জড়ো হওয়া মানুষ এ ঘটনায় গভীর শোক ও বিস্ময় প্রকাশ করে।
তাদের একজন হানি আল-মুবায়দিন বলেন, “আজ যা ঘটেছে, তাতে মানুষ কথা বলার বা আওয়াজ তোলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তবে রাষ্ট্রের কাছে আমাদের একটাই অভিযোগ—তাদের অবশ্যই এই অন্ধকার চিন্তাগুলো নিয়ে তদন্ত করতে হবে। এসব ধারণার উৎস কোথায় এবং কীভাবে সেগুলো আমাদের সন্তানদের মনে প্রবেশ করছে, তা খুঁজে বের করতে হবে।”
জর্ডানের মোট জনসংখ্যার একটি অংশ সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান। দেশটিতে বাইবেলে উল্লেখিত বেশ কয়েকটি স্থান রয়েছে, যেগুলো দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীরা আসেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ এক্সে এ ঘটনাকে “উপাসনালয়ে চালানো জঘন্য ও নৃশংস হামলা” বলে বর্ণনা করেছেন।