সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতা দিয়ে আলোচনার শুরুটা করা যাক।
অভিজ্ঞতাটি একেবারেই আটপৌরে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানবগোষ্ঠীর একজন হিসেবে এই বান্দাকে নিয়মিতই অর্থকরী কাজে অংশ নিতে হয়। বাসা থেকে অফিসপাড়ার দূরত্ব বেশ। পকেটের পয়সা বাঁচানোর চিন্তা মাথায় প্রবলভাবে থাকলে তাই মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাদ দিয়ে তিন চাকার রিকশার দিকে হাত বাড়াতে হয়। আর সেক্ষেত্রে সময় বাঁচানো এবং সেই অনুযায়ী আর্থিক সংগতি হিসাব করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা মনে চেপে হলেও তাকাতে হয় সেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দিকেই।
তেমনই এক ব্যাটারিচালিত রিকশায় (প্রচলিত ডাকে ব্যাটারি রিকশা) ক’দিন আগে অফিসের দিকে রওনা দিতে হয়েছিল। যাত্রা শুরুর আগেই অবশ্য চালক পুলিশের ঝামেলার কথা শুনিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘ধরে’। যাক, তারপরও রওনা দেওয়া। কারণ ওনারও আয় প্রয়োজন, আমারও যাওয়া প্রয়োজন।
খিলগাঁও রেলগেইট পর্যন্ত আসা গেল টুকটুকিয়ে। রেলগেট পার হয়ে শাহজাহানপুরের সোজা রাস্তা ধরে রাজারবাগে ঢোকার মোড়ও পার হওয়া গেল বাধা ছাড়াই। কিন্তু রাজারবাগে পুলিশ হাসপাতালের সামনের রাস্তায় ঢুকতেই বিপত্তি। দূর থেকে দুজন পুলিশ সদস্যকে দেখেই অবশ্য রিকশাচালকের কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছিল। তার প্রভাব পড়েছিল রিকশার স্পিডে, বেড়ে গিয়েছিল বেশ কিছুটা। তাতে অবশ্য বাঁচা যায়নি। উল্টো পুলিশের হাতের ইশারায় থামতেই হলো রাস্তার বাঁ পাশে।
কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, আমাদের ব্যাটারিচালিত রিকশার সামনে, পেছনে আরও অনেক বিদ্যুচ্চালিত রিকশা ছিল ঠিকই। সেগুলো বেশ আয়েশেই পার হয়ে গিয়েছিল পুলিশি বাধা। রিকশা থামানোর পর পুলিশ সদস্য অত্যন্ত বিনীতভাবেই যাত্রী হিসেবে নেমে যাওয়ার অনুরোধ করলেন। নামাও হলো। যদিও ততক্ষণে মাথায় ঢুকে গেছে আবার রিকশা ভাড়া করে গন্তব্যে সময়মতো যাওয়ার চিন্তা। ওখানে আরও কয়েকজন যাত্রীকে আরও কয়েকটি রিকশা থেকে নামানো হয়েছিল। ৫/৭টা ব্যাটারিচালিত রিকশা জব্দ অবস্থায় দেখা গেল। যদিও একই প্রযুক্তির আরও রিকশা ওই এলাকাতেই চলছে সমানে। কোন বৈশিষ্ট্যের বলে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ পদ্ধতিতে এই জব্দের কাজ চলছে, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। আবার যেসব যাত্রীদের মাঝ রাস্তায় নামানো হচ্ছে, তাদের গজগজ চলছেই।
ওদিকে রিকশাচালক ভাইটি ততক্ষণে ভেঙে পড়েছেন। এলাকার বলে তিনি বেশ খানিকটা পরিচিতই। এর আগেও এই বান্দাকে একই গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। কখনো কোনো পুলিশি বাধায় পড়তে হয়নি। বারবার সাহায্য চাইছিলেন রিকশা উদ্ধার করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু সেটি করার উপায় বা ক্ষমতা কোনোটাই যেহেতু নাই, তাই সাহায্যটা শেষতক আর্থিক রূপ নিল। যদিও অর্ধেক রাস্তা পার হওয়া হয়েছিল, তবু পুরো ভাড়ার সাথে আরও কিছু যোগ করে দেওয়া হলো। কারণ প্রাপ্তবয়স্ক কোনো মানুষের অসহায় হয়ে কেঁদে ফেলার ঠিক আগমুহূর্তের ছলছলে চোখ দেখাটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক বিষয় নয়। ওই দৃশ্যটা ভোলার জন্য হলেও কিছু সাহায্য করাটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে যে!
এরপর নিজের পকেটের প্রতি সুবিচার করতেই শুরু হলো পা দুটো কাজে লাগানো। সীমাবদ্ধ পকেটের অধিকারী নাগরিকের এছাড়া আর উপায়ই বা কি? হাঁটতে হাঁটতে পুলিশ হাসপাতালের গেটের সামনে আসতে দেখা গেল, ঠিক গেটের সামনেই জড়ো আছে অনেকগুলো ব্যাটারিচালিত রিকশা। হরেক মডেলের তো অবশ্যই। রাস্তার ঠিক উল্টো পারে পুলিশের ‘জব্দ’ অভিযান চললেও, পুলিশ হাসপাতালের সামনে আবার ব্যাপক সহাবস্থানই দেখা গেল। একেবারেই নদীর এপার, ওপার সংক্রান্ত চিরন্তন সমস্যা যেন!
তো, সেদিনের মতো হেঁটেই অফিস যেতে হলো। এই অভিজ্ঞতা পূর্ণতা পেল ৩/৪দিন পর। রাতের বেলা এলাকার মোড়ে দেখা হয়েছিল সেই পরিচিত রিকশাচালক ভাইটির সাথে। তিনি জানালেন, ২ হাজার টাকা দিয়ে সেদিন নাকি রিকশা ছাড়িয়ে এনেছিলেন পুলিশের কাছ থেকে। নানা অনুরোধের পর ওই জায়গায় দায়িত্বরত পুলিশের এক কনস্টেবলের সঙ্গে একটা ‘ডিল’ হয়। তিনি ২ হাজার টাকা নেন, তবে কোনো রশিদও দেননি। মালিকের কাছ থেকে বিকাশে টাকা নিয়ে ওই টাকা পরিশোধ করার দাবি রিকশাচালক ভাইটির। যদিও টাকা যে নেওয়া হয়েছে, তেমনটা না বলার শর্তে কর্তব্যরত সার্জেন্টের কাছে আকুতি জানানোর সুযোগের সদ্ব্যবহারের পরই রিকশা ছাড়ানো গেছে। অর্থাৎ, মাঝে দিয়ে যে রিকশাচালকের ২ হাজার টাকা গেল, তার আসলে কোনো হিসাবই নেই!
ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের এ ধরনের অভিযোগ আসলে নতুন নয়। কিছুদিন আগেই রিকশাচালকেরা এ নিয়ে ধর্মঘট, বিক্ষোভ, মিছিল ইত্যাদি করেছিলেন। সেখানেও পুলিশি হয়রানির নানা অভিযোগ শোনা গিয়েছিল। ছিল ডাম্পিংয়ে পাঠানো নিয়ে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবসা বেশ লাভজনক। তাই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এতে বিনিয়োগ করেছে। ব্যাটারিচালিত রিকশার মালিকদের অভিযোগ, রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ ‘সাধারণ’ রিকশা মালিকের গাড়ি আটকে ডাম্পিংয়ে পাঠালেও, প্রভাবশালী বা পুলিশ সদস্যদের মালিকানাধীন বিশেষ চিহ্নযুক্ত গাড়িগুলো ছেড়ে দিচ্ছে। এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিচিত বা প্রভাবশালীদের গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারলেও সাধারণ মালিকদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বনটি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ আছে।
রাজধানী শহরে যে ব্যাটারিচালিত রিকশার পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে, তা আর আলাদা করে বলার দরকার নেই। জানিয়ে রাখা ভালো, স্থানীয় সরকার বিভাগের সাম্প্রতিক ‘ই-মোবিলিটি ও ব্যাটারি সোয়াপিং সিস্টেম রোল-আউট পরিকল্পনা (ঢাকা শহর)’ নথিতে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ধরা হয়েছে। তবে এটি চূড়ান্ত সরকারি গণনা নয়; পরিকল্পনা তৈরির জন্য ব্যবহৃত একটি আনুমানিক হিসাব। একই নথিতে প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ফিডার সড়কে ৪ লাখ করে মোট ৮ লাখ রিকশার অনুমোদনের প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ পরিকল্পনার হিসাব ধরলে, বর্তমান আনুমানিক সংখ্যা ও প্রাথমিক অনুমোদনের মধ্যে প্রায় ৭ লাখের ব্যবধান রয়েছে। অবশ্য সাদা চোখে দেখলে অনেকেই হয়তো ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা হিসেবে ‘১৫ লাখ’কেও কম বলে মনে করবেন। বাস্তবতা আসলে সেই অবিশ্বাসে সমর্থনও জোগায়।
ব্যাটারিচালিত রিকশা-সংশ্লিষ্ট সমস্যা আসলে একদিনের নয়। সমস্যাটিকে জিইয়ে রাখাও হয়েছে বহুদিন ধরে। কেমন করে? অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও ব্যাটারিচালিত রিকশা রাজধানী ঢাকায় নেমেছে ব্যাপকহারে, অলিগলিতে চলেছে অনেক। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও সরকার তাতে সঠিকভাবে নজরদারি না করায় এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা না নেওয়ায়, এর চলাচল বেড়েছেই। কখনো পায়ে চালানো রিকশায় অবৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাটারি লাগিয়ে ফেলা হয়েছে, আবার কখনও চীন দেশ থেকে ইচ্ছামাফিক মডেল আমদানি করে তা রাস্তায় চলতে দেওয়া হয়েছে। কোনোটার চাকা প্রচলিত রিকশার মতোই, আবার কোনোটার সিএনজিচালিত অটোরিকশার মতো। অর্থাৎ, একেকটার গতি ও চলার ধরনও একেকরকম। কোনোটা পায়ে টানা রিকশার তুলনায় একটু দ্রুত চলে, তো কোনোটা পেট্রোল‑ডিজেলে চলা গাড়ির গতির সঙ্গে রেসে নামে। আবার ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের অনেকেই ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়া গতিতে চলে। এটা আর কোনো অভিযোগের বিষয় নয়, বরং একটি স্বীকৃত ব্যাপার। সাথে আছে উলটো পথে যাওয়া, যত্রতত্র দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা, এমনকি ব্যস্ত ফ্লাইওভার বা মহাসড়কের লেনে অবলীলায় উঠে যাওয়ার বিষয়। ফলে সড়ক দিন দিন অনিরাপদ হয়ে উঠছে। আর এভাবেই নানামাত্রিক দুর্ঘটনায় জড়িয়ে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশার নাম।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরই অটোরিকশা ও তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৭৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২০ সাল থেকে গত জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ৭ হাজার ৬০৪। এ সময়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে তিন চাকার ১২ হাজারের বেশি যানবাহন। এ পরিসংখ্যানে অবশ্য সিএনজিচালিত অটোরিকশার তথ্যও রয়েছে। কিন্তু তাতেও ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনাপ্রবণতা ফিকে হয় না। বরং আশপাশের পরিচিতজনদের কাছে জানতে চাইলেই পাওয়া যায় ব্যাটারিচালিত রিকশার দুর্ঘটনায় জড়ানোর বহু ঘটনা।
ফলে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অনেকটা এমন হয়ে উঠছে যে—একে গেলাও যাচ্ছে না, ফেলাও যাচ্ছে না। সরকার অবশ্য এ সংক্রান্ত কঠোর নীতিমালা করার কথা বলছে বার বার। প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারি রিকশা সরিয়ে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু এসব হওয়ার আগ পর্যন্ত আসলে কীভাবে বিষয়টিকে সামাল দেওয়া হবে? এ নিয়ে কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কিছু জানা যাচ্ছে না। বরং সেই নীতিমালা হওয়ার আগে ঢাকার সড়কে মাঝেমধ্যেই পুলিশের অভিযান চালাতে দেখা যাচ্ছে। সেই অভিযানে নিয়মিতই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ট্রাকে তুলে নিয়ে যেতে দেখার দৃশ্যটা বেশ নিয়মিতই। এর পরে কী হচ্ছে, সেই সংক্রান্ত ঘটনা এবং সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ তো এই লেখার ওপরের দিকেই আছে।
অর্থাৎ, যে পুলিশি প্রক্রিয়ায় রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের কাজ দেখা যাচ্ছে, সেটি ন্যায়সঙ্গতভাবে নিয়ন্ত্রণের বদলে উল্টো একটি আর্থিক শোষণ এবং বৈষম্যের উদাহরণ সৃষ্টি করছে প্রবলভাবে। এতে অপ্রাতিষ্ঠানিক এই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় জড়িতরা এমন এক ফাঁদে আটকাচ্ছে, যা কেবলই তাদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার করছে। কারণ এতে অন্তত ন্যায়বিচারের বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না কোনোভাবেই। আর কোনো সমস্যার মূলে না গিয়ে ডালপালা ছেঁটে আসলে কাজের কাজ কিছু হয়ও না। দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরি হবে দেদারসে, বিক্রিও হবে প্রকাশ্যে, নানা প্রভাবের নানা মানুষ তাতে বিনিয়োগও করবেন ঠিকই, কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে ‘অপু, দশ, বিশ, ত্রিশ…’ বলে রিকশা বেছে নিয়ে তা ডাম্পিং করে শুধু রিকশাচালকদের ফাঁদে ফেলার অর্থটা আসলে কী? একটা নিয়ম বা নীতিমালা হলে, সেটি সর্বজনীন হওয়াটাই শ্রেয়। নইলে এটি একটি প্রবল বৈষম্যের অনুভূতি সৃষ্টি করবেই।
এখন কথা হলো, এভাবে আর কতদিন চলবে? নতুন সরকারেরও তো বেশ কয়েকমাস হয়ে গেল। বিষয়টার একটি দ্রুত সমাধান হওয়াটা প্রয়োজন। এবার সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেটা কত দ্রুত অনুধাবন করে, তাই দেখার!
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা