বাংলাদেশকে যে বাইরের দুনিয়া মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নারী–পুরুষের শিরচ্ছেদের ঘটনা তার একটি উদাহরণ মাত্র। নিকট অতীতে এ রকম উদাহরণ আরও অনেক আছে। বিদেশে গিয়ে কোনো নাগরিক আইন ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত বা বিচারের মুখোমুখি হলে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী স্বাগতিক দেশের জানানোর বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু যখন সেই দেশটি হয় সৌদি আরব এবং ভুক্তভোগী হন বাংলাদেশের নাগরিক, তখন তারা এসব আমলেই নেয় না। যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের নাগরিক হলে ভুক্তভোগী দেশকে না জানিয়ে সৌদি সরকার কাউকে এ রকম শাস্তি দিতে পারত না।
বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের নাগরিকদের হরহামেশা লাঞ্চিত ও অপমানিত হতে দেখা যায়। শুরুটা হয় সবুজ পাসপোর্ট দিয়ে। অনেক দেশের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশি পাসপোর্ট হলে বাঁকা চোখে তাকায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে। যেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে তিনি মহা অন্যায় করেছেন।
যেসব তরুণ বিদেশে যান ভাগ্যান্বেষণে, তারা দেশের দূতাবাস বা মিশন থেকে কদাচিৎ কনসুলেট সুবিধা পান। বেশির ভাগ হয়রানির শিকার হন। এই হলো বাংলাদেশি নাগরিকদের নিয়তি।
২১ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়ে ৩ বছরে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেউ বা আহত হয়ে ফিরে এসেছেন। যারা জীবিকার জন্য বিদেশে গিয়েছেন, তাদের তো যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার কথা নয়। তারপরও তাদের কেউ কেউ যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন। ভালো বেতনে চাকরির আশায় গত ৭ মে ঢাকা থেকে ৩০ জন বাংলাদেশি যান রাশিয়ায়। কিন্তু সেখানে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ১৬, ৮ ও ৬ জনের গ্রুপে ভাগ করে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয়। তাদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান। দুজন হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে পালিয়ে দেশে ফেরেন।
রাশিয়া যুদ্ধ করছে, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে। সেই যুদ্ধ ন্যায্য না অন্যায্য সেই প্রশ্ন আমরা তুলছি না। আমাদের প্রশ্ন হলো বাংলাদেশি তরুণরা কেন যুদ্ধের শিকার বা বলি হবেন? এক সময় যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে বিভিন্ন দেশ থেকে ভাড়াটে লোকদের নিয়ে যেত রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। এখন কি রাশিয়াও পাশের দেশটিকে মোকাবিলা করতে বাংলাদেশি তরুণদের ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ব্যবহার করছে?
একশ্রেণির আদমবেপারি উচ্চ বেতনে চাকরির কথা বলে বাংলাদেশি তরুণদের রাশিয়ায় নিয়ে যায়। বিনিময়ে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। ফলে এই তরুণদের আর দেশে ফিরে আসার উপায় থাকে না। ভাবেন, যুদ্ধ শেষ হলে তারা রাশিয়ায় ভালো চাকরি পাবেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয় না, তাদের কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে লাশ হয়ে যান। কেউ বা ফেরেন আহত হয়ে।
ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বব্যাপী শোরগোল হলেও হতভাগ্য তরুণদের কথা কেউ ভাবে না। বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ৩৭ জন। পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন চার হাজার ৭২৫ জন। এক বছরেই রাশিয়া যাওয়া তিন গুনের বেশি বেড়েছে। এ বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন তিন হাজার ১০৫ জন। তাদের একাংশ যে ইউক্রেনে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তাতে সন্দেহ নেই।
এ তো গেল রাশিয়ায় যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের চালচিত্র। কিন্তু যে রাষ্ট্রটি ২০২৪- এর পর আমাদের ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে, সেই যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের অবস্থা আরও মর্মান্তিক। বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ২ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের সি-১৭ সামরিক উড়োজাহাজে একজন নারীসহ ৩৯ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। সেই বিমানে ফেরত আসা এক তরুণ করুণ অভিজ্ঞতা বর্ণনা শুনুন: “পুরা পেটে শিকল আছিলো, হাতে হাতকড়া ছিল, তারপর দুই পায়ে কড়া লাগানো ছিল। দেশে ফেরত পাঠানোর আগে প্রায় ১০ মাস বন্দীশিবিরে রাখা হয়। কিন্তু সেখানে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না। এমনকি আড়াই দিনের বিমানযাত্রায় তাদের কেবল চিজ দেওয়া চারটি পাউরুটি, আর আধা লিটারেরও অর্ধেক পানি দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ দিনের যাত্রার পুরোটা সময় তাদের শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছিল। বিমান যখন বাংলাদেশে ল্যান্ড করছে, তখনই হাত থেকে শিকলটা খোলা হয়েছে।”
চলতি বছরের ৮ জুন একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে ৪২ জন বাংলাদেশিকে ফিরিয়ে আনা হয়। এর আগে, ৬ মার্চ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত একাধিক ফ্লাইটে আরো অন্তত ৩৪ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের শুরু থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো বাংলাদেশির সংখ্যা অন্তত ১৮০ ছাড়িয়েছে।
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে যারা ইউরোপে প্রবেশ করেন সেই তালিকায়ও বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। কেউ সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যান, কেউ বা কারাগারে বন্দী জীবন কাটান। লিবিয়ার বেনগাজীতে গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ১৬৮ বাংলাদেশি নাগরিককে স্বেচ্ছায় দেশে প্রত্যাবাসন করা হয়েছে। লিবিয়া সরকার, বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় ১৫ সেপ্টেম্বর তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
গত বুধবার সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বিদেশে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতদিন কি তারা ঘুমিয়ে ছিলেন?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘নোট ভার্বাল’- এর মাধ্যমে ১৫৮ জন কারাবন্দি বাংলাদেশির বিষয়ে জেদ্দায় বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেলকে জানিয়েছিল। আগামীর সময়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওই বন্দিদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশের বিরুদ্ধে মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ রয়েছে। চুরির অভিযোগ রয়েছে ৮ শতাংশের বিরুদ্ধে। এছাড়া, ঘুষ, হয়রানি, অনৈতিক কাজ, জালিয়াতি, আইসিটি আইন লঙ্ঘন ও মানি লন্ডারিংসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক রয়েছেন অনেকে।
বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই ভিয়েনা কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী। কনভেনশন অনুযায়ী, বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়া কোনো নাগরিকের অনুরোধে তার দেশের কনস্যুলার কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানোর বিধান রয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলেই ধারণা করি।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরচ্ছেদের ঘটনায় সরকারের দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেই মন্তব্য করেছেন, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। একজন বলেছেন, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রবাসীদের বড় শিক্ষা হলো। কিন্তু সৌদি আরব যে অন্যায়ভাবে দুই বাংলাদেশিকে কঠিন শাস্তি দিল, সেই কথাটি বলার সাহস তার হয়নি।
অপরজন বলেছেন, তথ্যের আদান প্রদানের ঘাটতি ছিল। ঘাটতিটা কার পক্ষ থেকে? বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তথ্যের ঘাটতি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর সৌদি আরবের পক্ষ থেকে যদি ঘাটতি হয়ে থাকে, প্রতিবাদ করতে হবে। এর আগে শ্রীলংকার একজন নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড হলে তারা দেন দরবার করে সেটি রহিত করিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার এক নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর দেশটি নারী শ্রমিককে সৌদি আরব পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকেরা মুখে সবার আগে বাংলাদেশ বললেও এ রকম সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে বলে মনে হয় না। সম্প্রতি তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিরা উল্লসিত হয়ে উঠেছিলেন। তারা এই চুক্তিতে যোগ দিতে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানিয়ে মুসলিম বিশ্বকে একটি পরিবার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু একটি পরিবারের এক সদস্য দুই বাংলাদেশি নাগরিকের প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করল, সরকার তার ন্যূনতম প্রতিবাদ জানাতে পারেনি।
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের ঘটনায় কেবল সরকারি নয় বিরোধীদলও মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। তারা সৌদি আরবের মৃদু সমালোচনাও করেনি। বরং বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতা ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তুলেছে।
আমাদের বিজ্ঞ সরকার ও অতিবিজ্ঞ বিরোধীদল বাংলাদেশের মর্যাদা ও সুনাম নিয়ে ভীষণ বিচলিত। কিন্তু যেখানে প্রতিবাদটি জোরালোভাবে করা দরকার তারা নিরব থাকেন। সবক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ লক্ষ্য করলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা আশ্চর্যজনকভাবে ঐকমত্য প্রকাশ করেন। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, যেমন সৌদি আরবে দু্ই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের ঘটনা।
সোহরাব হাসান: সম্পাদক, চরচা